সাদা লোমের লাল ছাগল

পোস্টারে ‘গরু কিনলে কসাই ফ্রি’ বিজ্ঞাপন দেখে নিচে দেয়া নম্বরে কল দিলো গেদু চাচা। ‘হ্যালো ভাই, এটা কি কসাই হাট বাজার নাকি?’ ‘জি না ভাই, এটি কসাই বাজার না, তবে মশাইবাড়ি মাঠ। তা আপনার কী চাই?’ অপরপ্রান্ত থেকে উল্টো প্রশ্ন আসল।

‘ইয়ে মানে, আমি তো একটা ছাগল কিনেছি, এখন উৎকৃষ্ট মানের চারজন কসাই লাগবে। আপনাদের বিজ্ঞাপনের পোস্টারে সুদক্ষ কসাই সরবরাহের ব্যাপারটা দেখলাম কিনা!’ কর্কশ কণ্ঠে লোকটা বলল, ‘ধুর মিয়া! রাখেন আপনার ছাগল! লাখ টাকার গরুর সাথে আধাজন কসাই দিতেই কুলিয়ে উঠতে পারছি না। আর তিন টাকার ছাগলের জন্য চারজন কসাই! ফোন রাখেন মিয়া।’ এমন সোয়া সের ওজনের একটা ঝাড়ি খাওয়ার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না গেদু চাচা। কোরবানিতে গরু ছাগল, কম টাকা বেশি টাকার প্রশ্ন আসবে কেন? সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি করবে, এটাই তো নিয়ম।

সারা জীবন হালাল পথে অর্থ উপার্জন করেছে গেদু চাচা। চাকরিতে অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কখনো বাড়তি টু পাইসের চিন্তা মাথায় আনেনি। অথচ তার থেকে অনেক নিম্নপদে চাকরি করে অনেকে ৭০-৮০ হাজার টাকা দিয়ে কোরবানির গরু কিনছে। হারামের আরাম নেই এই উপলব্ধিটাই গেদু চাচাকে তার নীতিতে অটল রেখেছে। হয়তো সংসারে সবার মন সবসময় রক্ষা করতে পারেন না, তবুও সৃষ্টিকর্তার কাছে সব সময় শুকরিয়া জানান। সুখে আছেন তিনি, বেশ আছেন। পাড়ায় অন্যদের বড় বড় গরু দেখে ছেলেমেয়েদের থেকেও আবদার এসেছিল গরু কেনার।

গেদু চাচা তাদের বেশ সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন কোরবানির উদ্দেশ্য ও মাহাত্ম্য। লোকদেখানোর জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই এ ত্যাগ। গেদু চাচার প্রাইমারি পড়া ছেলেটার খেলার সঙ্গী হয়ে গেল ছাগলটা। সে ওটাকে কাঁঠাল পাতা, এক আধটু দূর্বাঘাস, ভুসি খাওয়ায়। ছাগলের গায়ের লোমগুলো খুব সুন্দর। দেখতে ঠিক লাল হরিণের মতো। এ জন্য দামটাও একটু বেশি গুনতে হয়েছে গেদু চাচাকে। দুটো লম্বা খাড়া শিংয়ে সরিষা তেল লাগিয়ে দেয়। চকচক করে। শখের বশে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। গেদু চাচা ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখে মিটিমিটি হাসে। অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তার ধারে জটলা বেঁধে গেল। কী হয়েছে জানতে চাইলে কেউ একজন বলল, ‘হাটে গরু কিনে জালটাকা দিয়ে এসেছিল, এখন ধরা পড়েছে।

উৎসাহী জনতা ঠিকমতো উত্তমমধ্যম দিচ্ছে।’ ঈদ এলে হাটে ঘাটে মার্কেটে জাল টাকার ছড়াছড়ি বেড়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। কিছু অসাধু ব্যক্তির ধোঁকার রোষানলে পড়ে সহজ সরল জনতা। জাল দিয়ে শুধুই মাছই ধরে না। জাল টাকা, জাল দলিল, জাল ভোটে এমনকি জাল সার্টিফিকেটও জাল শব্দটা জড়িত। পুলিশ এসে জাল টাকাসহ লোকটাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। বাসায় এসে ছাগল দেখে চাচীকে জিজ্ঞাসা করল গেদু চাচা, ‘কী ব্যাপার! এটি কার ছাগল?’ চাচী বলল, ‘এটি তোমার কেনা ছাগলই।’ কিন্তু আমি তো লাল হরিণের মতো ছাগল কিনেছিলাম। চাচী ভেংচি কেটে বলে, ‘হুম! কেনার সময় লালই ছিল, গোসল করানোর পর লাল সাদা হয়ে গেছে। সে জন্য তোমার ছেলে ঘরে বসে কাঁদছে। যাও এবার তুমি গিয়ে সামলাও।’ গেদু চাচার বুঝতে বাকি নেই এখানেও প্রতারণা। বেশি টাকায় বিক্রি করতে সাদা ছাগলে লাল রঙ করা হয়েছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গেদু চাচা বলে, ‘আহা! দুনিয়াতে এমনটাও দেখার বাকি ছিল।’

ছাগলের অনশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *