গুগলু’র পাল্লায় পাঁচু

একবার পাঁচু’র মনে খুব শখ জাগল তাকে চাঁদে চড়তে হবে। ছাদ থেকে রোজ দেখে কিন্তু যাবে কি করে বুঝতে পারে না। ট্রেন বাস যায় কিনা তাও জানেনা। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারেনা পাছে কেউ যদি ভাবে ‘সে এটাও জানেনা চাঁদে কি করে যেতে হয়’, তাহলে বন্ধুদের কাছে সম্মান চলে যাবে। ঠিক করল গুগলু-দা কে জিজ্ঞেস করবে, ঐ একমাত্র বলতে পারে কি করে যেতে হয়, কদিন আগে রাতে ছাদে গল্প করতে করতে বলছিল সে নাকি বার কয়েক চাঁদ থেকে ঘুরে এসেছে। গুগলু’র ভালো নাম সোমনাথ। জ্যেঠুর ছেলে। বয়সে তার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। গুগলু এমনিতেই একটু শান্ত প্রকৃতির কিন্তু সবার কাছ থেকে পয়সা বাগিয়ে নিতে ওস্তাদ।

কদিন আগেই পচা’র থেকে তিনটাকা ঝেড়েছে, ভালো পেন কিনে এনে দেব বলে পাঁচ টাকা নিয়ে ২ টাকা দামের পেন কিনে এনে দিয়েছে। বলতে গেলে গুগলু’র সোজাসাপ্টা উত্তর – “হাতের লেখা ভালো হলে ২টাকার পেনে যেমন লেখা হবে পাঁচ টাকার পেনেও তাই হবে, ভালো পেনের কথা না ভেবে ভালো হাতের লেখা কর”। আজ কাল করে তার শখের কথা গুগলু-দাকে বলা হয়নি, আজকে সুযোগ পেয়ে চুপ করে ছাদে ডেকে নিয়ে বলল – ‘গুগলু-দা, একটা প্রশ্ন ছিল’ -‘বলে ফ্যাল’ -‘তুমি সেদিন বলছিলে না চাঁদে বেড়াতে গেছিলে, কিসে চেপে গেছিলে?’ -‘কেন রে? তুই যেতে চাস নাকি?’ -‘না, মানে জানতে ইচ্ছে করছিল তাই’ -‘কিন্তু সেতো বলা যাবে না, খুবই গোপন ব্যাপার’ -‘বলোনা গুগলু-দা, আমি কাউকে বলব না, এই চাঁদের দিব্বি’ -‘চাঁদের আবার দিব্বি হয় নাকি? যত্তসব বাজে কথা। কিছুতেই বলা যাবে না, তবে তুই যদি যেতে চাস নিয়ে যেতে পারি’ -‘সত্যি বলছো?’ -‘নইলে বলছি কি! কিন্তু তুই কি যেতে পারবি?’ -‘কেন পারবো না, আমি তো যেতেই চাই কিন্তু তোমাকে বলতে পারছিলাম না’ -‘তেমন কিছু না, তবে কাউকে বলিস না যেন, চাঁদে যেতে হলে মন্ত্রপাঠ করতে হয়, ব্যাস এক নিমেষে পৌঁছে যাবি কিন্তু তারজন্য একটু খরচা আছে’ -‘তুমি সত্যি বলছো? এক নিমেষে যেতে পারবো? না তুমি টাকাটা নিয়ে ঝেড়ে দেবে?’ -‘তুই যা তো, তোর দ্বারা এসব হবেনা।

বললাম তো মন্ত্রের ব্যাপার স্যাপার আছে তার উপর তুই আবার আমাকে অবিশ্বাস করছিস। হবে না, আমি যাই (একটু রাগ রাগ ভাব)’ -‘গুগলু-দা, রাগ করছো কেন? আমি এমনিই মজা করে বললাম, তাও কত টাকা লাগবে?’ -‘এমনি তো প্রায় বিশ টাকা মত খরচা হয়, তুই তো আমার ভাই তাই দশ টাকার মধ্যে তোর একটা ব্যবস্থা করে দেব’। চোখ বড় বড় করে পাঁচু বলল -‘দশশশ টাকা!!’ হাফপ্যান্টের পকেট হাতড়ে খুচরো পয়সা গুনে বলল – ‘আমার কাছে তো সাড়ে পাঁচটাকা আছে, তাও আবার কালকের স্কুল টিফিনের টাকাটা ধরে’ -‘যাহ!! সাড়ে পাঁচ টাকা নিয়ে চাঁদে চড়ার স্বপ্ন তোকে দেখতে হবে না, তুই যা এখন, ম্যালাক্ষন বিরক্ত করলি আমাকে’ পালাতে যাচ্ছিল গুগলু, পচা কাঁচুমাচু করে বলল – ‘পরে বাকিটা দিয়ে দেব নাহয়, এই চাঁদের দিব্বি’ গুগলু ঘুরে মুচকি হাসি দিয়ে বলল – ‘আবার চাঁদের দিব্বি! পরে দিবি বলছিস? ঠিক আছে তাহলে ঐ সাড়ে পাঁচ টাকা এখন দিয়ে দে’ টাকাটা নিয়ে গুনে বলল – ‘সাড়ে পাঁচটাকা আছে বললি, এখানে তো মাত্র পাঁচ টাকা, আর আট আনা কই?’ মাথা চুলকে পাঁচু বলল – ‘কালকের স্কুলে টিফিনের জন্য রেখেছি’ হাত থেকে আধুলী টা কেড়ে নিয়ে বলল –‘হুহ, চাঁদেও চাপবি আবার টিফিনও খাবি নাকি! এখন যা, সামনের অমাবস্যায় শনিবার রাত ৯-টা’র সময় চাঁদে যাবি’ -‘কালকে হবে না? -‘না না, কালকে হবে না, দেখছিস না এখন জ্যোৎস্না রাত’ -‘জ্যোৎস্না রাত তো ভালো, অমাবস্যায় তো চাঁদ দেখায় যায়না, তখন যাবো কি করে করে’ -‘সে সব ব্যবস্থা আছে, চাঁদ দেখা না গেল তো কি হয়েছে, চুপটি করে পাশে লুকিয়ে থাকে। মন্ত্রের জোরে সব বেরিয়ে আসবে।

তোকে সেসব ভাবত হবে না’ -‘কিন্তু জ্যোৎস্না রাতে অসুবিধা কোথায়?’ একটা মাতব্বরী হাসি দিয়ে বলল – ‘অসুবিধা আমার নয়, অসুবিধা তোর’ -‘আমার কি অসুবিধা হবে গুগলু-দা?’ -‘তোকে নিয়ে না আর পারা যায়না, ওরে গাধা, জ্যোৎস্না রাতে উঠতে গেলে তো তোকে লোকে দেখতে পাবে, আর তোর ছায়া তখন পড়বে পৃথিবীতে, জ্যোৎস্না’র আলোর বদলে তোর ছায়া পড়লে লোকে চেঁচাবে না? তোকে তো তখনই নেমে আসতে হবে, সেটা কি তুই চাস? নাকি অমাবস্যার সময় চুপ করে গিয়ে ম্যালাক্ষন বেড়াতে চাস?’ পচা মনে মনে ভাবল, ঠিকই তো, গুগলু-দা একদম খাঁটি কথা বলেছে, ছায়া পড়লে লোকের যত অসুবিধা হবে তার চেয়ে হিংসা বেশী হবে, তখনই হিংসে করে চেঁচিয়ে নামাবে বরং গুগলু-দার কথামত অমাবস্যার রাতেই যাওয়া ঠিক হবে। তারপর যত না অমাবস্যার রাত গেল তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী শনিবার পার হল, কিন্তু গুগলু-দা বেপাত্তা। বলতে গেলেই পরের অমাবস্যা দেখায়, এরমাঝে বকেয়া সাড়েচার টাকাও আদায় করে নিয়েছে। এদিকে ব্যাপারটা পাঁচু কাউকে বলতেও পারেনা। পাঁচু বুঝে গেছে গুগলু-দা টাকাটা আগের মতই ঝেড়ে দিল। একদিন তো একটু কাঁদোকাঁদো হয়ে বলেই ফেলল – ‘গুগলু-দা তুমি আমার টাকাটা সত্যি সত্যি ঝেড়ে দিলে?’ -‘কি যে বলিস তুই, তোর টাকা আমি ঝাড়তে পারি বল, বলেছি যখন তোকে চাঁদে আমি চাপাবোই।

এখন তো অমাবস্যা আর পোরশু শনিবার তুই এক কাজ করিস একটা গামছা আর একটা টর্চ লাইট নিয়ে উপরে চলে আসিস’ -‘এক দম সত্যি বলছো তো গুগলু-দা?’ -‘এই তোর চাঁদের দিব্বি!’ কথামত গামছা আর টর্চ লাইট নিয়ে হাজির পাঁচু, গুগলু-দাও একটু পরে এসে বলল – ‘এসে গেছিস? যেগুলো আনতে বলেছিলাম এনেছিস?’ -‘হ্যাঁ’ ‘কই গামছাটা দে’ বলে নিয়ে পাঁচু’র চোখটা কষে বেঁধে দিয়ে বলল – ‘যতক্ষন না বলব খুলবি না’ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে পাঁচু, এই ফাঁকে পকেট থেকে একটা চক পেন্সিল বের করে ছাদের উপর একটা গোল্লা এঁকে ভেতরে লিখল ‘অমাবস্যা’র চাঁদ’ তারপর পাঁচুকে ধরে কয়েক পাক ঘুরিয়ে গোল্লার উপর দাঁড়িয়ে দিয়ে কানের কাছে বার কতক ফু-মন্তর, ফু-মন্তর করে বলল – ‘তুই এখন চাঁদের উপর চেপে গেছিস কিন্তু আমি চলে না গেলে দেখতে পাবি না’ যাবার সময় বলে গেল – ‘১ থেকে ১০০ গোনার পর চোখ খুলে টর্চ লাইট মেরে দেখবি তুই অমাবস্যার চাঁদের উপর দাঁড়িয়ে আছিস” গুগলু-দার সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ শুনে পাঁচু শুরু করল – “১,২,৩,………”

গরুর হাট

চিংড়ি দিদি — শামসুন নাহার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *