
গজেনবাবু দারুণ ব্যবসাবাগীশ। বলা যায় ব্যবসান্তঃপ্রাণ। জীবনের ঊষালগ্ন থেকে সায়াহ্ণ অবধি তিনি নানা ব্যবসা করেছেন। মানে হরেক রকম জিনিসের অনেক রকম ব্যবসা করেছেন। করেছেন কেন না ব্যবসা না করে তিনি শান্তি পান না। রাতে ঘুম তাঁর ব্যবসা করেও হয় না, না করেও হয় না; তবুও ব্যবসা করলে তিনি ভালো থাকেন, মানে তাঁর মন খুবই ভালো থাকে ব্যবসায়িক ব্যস্ততায়। এছাড়াও হরেক রকম জিনিসের অনেক রকম ব্যবসা করার আরও কারণ হলো কোন ব্যবসাটাই তাঁকে লাভের মুখ দেখায়নি। মানে যেমন লাভে তিনি একটা ব্যবসা থেকে আরেকটা ব্যবসা শুরু করতে পারেন তেমন লাভ হয় নি। উলটে কোন রকমে মূলধনটুকু ফিরিয়ে এনে তিনি জিরিয়েছেন।
কিন্তু আবার কয়েকদিন পর কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন নতুন ব্যবসা করতে। এরকম করে ধূপ, ধুনো, ইউক্যালিপটাস –এর ফুল থেকে বানানো ফিনাইল, সুতি শাড়ি, আতর, রুমাল, ঝোলা ব্যাগ অনেক কিছুর ব্যবসা করে ফেলেছেন। এখন সে সবের অবশেষ পড়ে থাকে তাঁর কারখানা ঘরে। কারখানাটা ছিল প্লাস্টিকের কৌটো আর তার ঢাকনা বানানোর। সেও বহু বছর আগেকার কথা। তবে এইসব ধূলোজমা জিনিসপত্রে হাত বোলালে আজও গজেনবাবু বিস্তর আনন্দ পান। এবং নতুন ব্যবসা করার উদ্দীপণা পান। কিন্তু গজেনবাবুর স্ত্রী একসময় খুবই দুঃখে কারখানা ঘরে তালা দিয়ে চাবিটা হারিয়ে ফেললেন। এদিকে মনে ব্যবসার ইচ্ছে ঘুরপাক খায় গজেনবাবুর।
ওদিকে ধূলোজমা ব্যবসার জিনিসপত্রে হাত না বুলোতে পেরে নতুন কোনো ব্যবসার ধারণাও পান না তিনি। ফলে তিনি মনখারাপে ভুগতে লাগলেন।এমন সময় তাঁর ভাগনি টেঁপি এলো তাঁর সাথে দেখা করতে। টেপি কৃষিবিদ। সে মাঠ-ঘাটের অনেক গল্প বলছিল মামাকে। যদি মামার মন ভালো হয়। টেঁপির মুখে কেন্নোর কাটা মাটির নকশার কথা শুনে, গোবর গোল গোল গড়িয়ে গুবরেপোকা কেমন নাড়ু বানায় শুনে গজেনবাবু চলে এলেন টেঁপির কাজের জায়গায়, ঘটনাগুলো নিজে দেখতে। টেঁপি মামাকে মাঠ-ঘাটের মজা বোঝাতে বোঝাতে বলে ফেলল একদিন যদি গুবড়ে পোকার নাড়ুর গায়ে কেঁচোর কাটা মাটির নকশা থাকত তাহলে কি মজাই না হতো। গজেনবাবু শুনে ভাবলেন আহা গুবরের নাড়ু যদি গোবরের না হয়ে সুজি কিংবা নারকোলের হতো কি যে ভালো হতো। এসব ভাবতে ভাবতে গজেনবাবু গেলেন হাটে; টেঁপির মামির জন্য গয়নাবড়ির ছাঁচ কিনতে। এদেশে এরকম বড়ি বড় ভালো পাওয়া যায়। তবে এসব বড়ি শুধু সুস্বাদু তো নয়, দেখতেও সুন্দর। বড়ি দেখে, ছাঁচ কিনে তাঁর আবার মনে হলো নাড়ুও যদি বরাবরের নিটোল নাড়ু না হয়ে গয়নাড়ু হতো তাহলে কি ভালোই হোতো। টেঁপির কাছ থেকে বাড়ি ফিরে দেখলেন ভাগনে বুমপুচি এসেছে। বুমপুচি টেঁপির মাসতুতো ভাই। সে খাদ্যপ্রযুক্তি পড়ে। সেমিস্টার ব্রেকে এসেছে মামার বাড়ি।
তাকে দেখেই গজেনবাবুর গয়নাড়ুর দুঃখ ধেয়ে এলো। সব শুনে বুমপুচি চলে গেলো টেঁপির কাছে। টেঁপির আপিসের খামারে গোবরখাল বানানো ছিল, খেতে সার দেওয়ার জন্য। গোবর খালে সারাদিন গুবরেপোকারা জোড়ায় জোড়ায় নিজেদের চেহারার থেকে দ্বিগূণ চেহারার নিটোল নাড়ু বানায়। তারপর সেটাকে গড়িয়ে গড়িয়ে বাসায় নিয়ে গিয়ে গুবড়ে দম্পতি ছানাপোনাদের সাথে ভাগ করে খায়। অন্যদিকে সার ডোবে ছাড়া থাকে অসংখ্য কেঁচো। খেতে চারা লাগাবার আগে মাটি বানানোর জন্য ওদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নাহলে ওরা সার ডোবেই মাটিতে আর সারের গায়ে দিনরাত ফুটিয়ে তোলে নকশা, নিজেদের শরীরের ছাঁচে। এসব দেখে বুমপুচি টেঁপিকে ধরে পড়লো যে টেঁপি যেন সার, গোবর আর মাটি মিশিয়ে একটা মণ্ড বানায়; সেই মণ্ডে কেঁচোর কারসাজি চলার পর গুবড়েতে গড়িয়ে নাড়ু বানায় কিনা সেটা যেন বুমপুচিকে জানায়। বুমপুচির ছুটি শেষ হয়ে গেছে। এসব পরীক্ষা না হলে ও নিজেই করে যেত। টেঁপি সেসব আবদার রাখতে পারেনি। তবে কাজের প্রয়োজনে সারডোবে গোবর মেশানো্র তদারকি করার সময় ও দেখল একদিন যে গোবরে কেঁচোর অরুচি নেই। গুবরেরও সার-মাটি অপছন্দ নয়। সেদিনই ও খবরটা বুমপুচিকে জানাল। তারপর বুমপুচির বায়নার ঝড় শুরু হলো।
সার-মাটি-গোবরের মণ্ড সারের মতো পাতলা ছিল না গোবরের মতো ঘন ছিল না মাটির মতো কঠিন ছিল সেটা ওকে জানাতে হবে। মণ্ড আর নাড়ুর ছবি চাই ওর। এরকম নানান বায়নাক্কায় ও প্রায় অস্থির করে তুললো টেঁপিকে। তারপর একদিন গজেনবাবু টেঁপিকে তলব করলেন। নতুন ব্যবসার উদ্বোধনে আসার জন্য। মামার মন ভালো থাকবে ভেবে টেঁপি হাজির হলো সেই অনুষ্ঠানে। সেখানে গিয়ে টেঁপি তো তাজ্জব। দেখে কারখানা ঘর থেকে সব পুরোন জিনিস বের করে দেওয়া হয়েছে। একটা উনুনে কড়াই চাপিয়ে বুমপুচি তদারক করছে নারকোল কোড়া আর চিনি দিয়ে বানানো মণ্ড কতটা ঘন হবে।
একপাশে একটা লম্বা টেবিলে গোটা দুয়েক ইলেক্ট্রিকে চলা যন্ত্রপাতি রয়েছে। টেবিলের একপ্রান্ত ঢালু হয়ে গিয়ে পড়েছে একটা গামলায়। সব ব্যবস্থা দেখে চোখ ছানাবড়া করে টেঁপি যেই বুমপুচিকে জিজ্ঞেস করতে গেল যে ব্যাপার কী, তখনই বুমপুচি কড়াই-এর মণ্ড ঢেলে দিল টেবিলে। তারপর টেবিলের চওড়ার সমান লম্বা একটা যন্ত্র চালিয়ে দিল মণ্ডের গায়ে। যন্ত্রটা বিলকুল কেঁচোর মাটি কাটার মতো মণ্ডটা একমুখে গিলে অন্য মুখ দিয়ে বের করে দিতে লাগল। অনেকরকম নকশা তৈরি হয়ে গেল মণ্ডের গায়ে। তারপর আরেকটা যন্ত্র চালিয়ে দিল বুমপুচি। সেটাও টেবিলের চওড়ার সমান লম্বা; কিন্তু তাতে গুবরে পোকার হাত-পায়ের মতো অসংখ্য হাত পা। সেগুল কেঁচোকলের নকশাকাটা মণ্ড দিয়ে পাকিয়ে তুলল নাড়ু। আর জমা করে রাখল গড়িয়ে গড়িয়ে গামলায়; ফের গামলা থেকে হামাগু্ড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলো আবার মণ্ডের কাছে; আবার বানালো নতুন নতুন নাড়ু, আবার জমা করল।
টিভির আর কাগজের লোকেরা ছবি-টবি তুলে নিয়ে চলে যেতে, গজেনবাবু টেঁপিকে বললেন যে যন্ত্র দুটো বুমপুচির বানানো; এদুটোতে পেটেন্টও নিয়েছে ও; চিনির মণ্ডকে পিঁপড়ে আর পচনের হাত থেকে বাঁচানোর আরকও বানিয়েছে ওর এক বন্ধু। গজেনবাবুই এসবের খরচা জুগিয়েছেন। তাই বুমপুচির আরেক বন্ধু গজেনবাবুর গয়নাড়ুর প্যাকেট বানিয়ে দিয়েছে। একটা খাবার রপ্তানীর কোম্পানি বিদেশে গয়নাড়ু বিক্রি করবে বলেও অগ্রিম করেছে। এই ব্যবসাটায় গজেনবাবু সাংঘাতিক লাভ করলেন। লাভের পাঁচ আনা অবশ্য তিনি টেঁপিকে দেন বুমপুচির আবিষ্কার বা তাঁর নিজের ব্যবসাবুদ্ধিকে জাগাবার জন্য।
বুমপুচিদের তিন বন্ধুর সব্বাইকে দেন লাভের দশ আনা করে। আর পাঁচআনা যায় তাঁর ঝুঁকি নেওয়ার পারিশ্রমিক হিসেবে। দশ আনা যায় মূলধন ফেরাতে, সুদ গুণতে। বাকি আটানার চারানা যায় নতুন খাবার বানানোর যন্ত্র আর খাবার পচনরোধের উপায় তৈরির গবেষণায়; শেষ চারানায় ব্যবসায়ে আগ্রহী তরুন-তরুনীদের উতসাহ দেওয়া হয়। নতুন যন্ত্র, নতুন উপায় একটা তৈরি হলে গজেনবাবু আবার নতুন ব্যবসা করবেন; তবে আরেকরকম খাবারেরই। গয়নাড়ুর জন্যই সেটা সম্ভব হবে। তাই গয়নাড়ুর ব্যবসা বন্ধ হবে