Categories রূপকথা

তিন ডাকাবুকো বন্ধু-প্রথম কাণ্ড-ছেলেধরা

অন্তু, রন্তু ও সন্তু তিন প্রাণের বন্ধু – এখন ক্লাস সিক্সে পড়ছে – ছোট বেলা থেকেই তিনজন ভীষণ ডানপিটে – পাড়াতে ডাকাবুকো হিসাবে ওদের নাম কিংবা বদনাম তাই পাড়ার অন্যান্য ছেলেরা ওদের একটু সমঝেই চলে আর সন্তুরাও ওদের একেবারেই পাত্তা দেয় না – নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ওদের মধ্যে সন্তু সব থেকে লম্বা, রন্তু মাঝামাঝি আর অন্তু একটু বেঁটের দিকেই তবে খুব গাট্টা গোট্টা চেহারা আর গায়ে জোরও ভীষণ তাই অন্য বন্ধুরা ওকে বাটুল-দি-গ্রেট বলে।

ছুটি ছাটার দুপুরে ওরা চুপচাপ বেরিয়ে পড়ে ওদের পাড়া ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরের মাঠে যেখানে তাল ও খেজুর গাছের ভিড় আর প্রতি বছর শীত কালে খেজুর গাছ চেঁছে রসের হাঁড়ি বসানোর জন্য গাছগুলো কেমন ত্রিভঙ্গ মুরারির মত হয়ে গিয়েছে। মাঠের শেষে একটা মস্ত বড় আর লম্বা বহু পুরাতন ঝিল আর ঝিলের বাঁ ধার দিয়ে একটা মাটির রাস্তা দূরে গ্রামের দিকে চলে গিয়েছে। ছুটির দিনের স্তব্ধ দুপুরে ঝিলের পাড়ে বসে ওরা দেখে মাছরাঙ্গা পাখির জলে ঝাঁপিয়ে মাছ ধরা, চিল গুলো কেমন অনেক উঁচু থেকে মাছ দেখতে পেলে তিরের মত নেমে এসে ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিয়ে তাল গাছের মাথায় বসে খায় তবে অন্য কোন চিল ওকে দেখতে পেলে রীতিমত উড়ন্ত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

 

ঝিলের শান্ত জলে মাছ ঘাই মারলে জলের উপর গোল গোল ঢেউ গুলো অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে যায়। ঝিলের জলে ব্যাঙ বাজি খেলাটাও খুব মজার – একটা পাতলা পাথরকে নিচু হয়ে জলের উপর ছুঁড়ে দিলে সেটা জলের উপর লাফাতে লাফাতে অনেক দূর চলে যায় তাই ওদের মধ্যে মাঝে মাঝে এই ব্যাঙ বাজির প্রতিযোগিতাও হয় – কার ছোঁড়া পাথর সব থেকে বেশী দূর গিয়েছে। এত সব মজার কথা অবশ্য ওরা বাড়িতে বলতে পারে না কারণ পাড়ার বাইরে যাওয়া ওদের একেবারেই বারণ। শীতকালের খুব ভোরে ওই দূরের গ্রামের কিছু লোক মাঠের খেজুর গাছের মাথা সুন্দর করে চেঁছে তার মাঝখানটা একটু নালার মত করে সেখানে একটা কাঠি গুঁজে দেয় যাতে গাছের রস ওই কাঠি বেয়ে গাছে বাঁধা হাঁড়িতে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয় আবার পরদিন ভোর বেলা পুরাতন হাঁড়িটা খুলে আর একটা নতুন হাঁড়ি বাঁধে আর এটা চলতে থাকে পুরো শীতকালটা। সন্তুরা অবশ্য হাঁড়ি বাঁধা বা খোলা দেখেনি তবে ওই লোকগুলো যখন দুপুরের দিকে এসে দেখে যায় গাছে বাঁধা হাঁড়িগুলো ঠিক আছে কিনা তখন ওদের কাছে শুনেছে আর ওদের সাথে সন্তু রন্তুদের খুব ভাবও হয়ে গিয়েছে। ওদের কাছেই শুনেছে এই রস ওরা প্রত্যেক দিন ভোরে বাড়ি নিয়ে গিয়ে আগুনে জ্বাল দিয়ে পাটালি গুড় আর ঝোলা গুড় বানায় – বাড়ি থেকে পাটালি গুড় এনে ওরা সন্তুদের খাইয়েছে – এর স্বাদ বাজারের পাটালি থেকে অনেক ভালো। ওরাই ওদের পৈ পৈ করে বারণ করে দিয়েছে কখনও যেন ঝিলের জলে না নামে – বহু পুরাতন ঝিল এবং একেবারেই ব্যবহার হয় না বলে জলে ভীষণ শ্যাওলা আর আগাছা আর নামলেই পায়ে জড়িয়ে যাবে তারপর আর নিস্তার নেই – একেবারে তলিয়ে যেতে হবে – কেউ বাঁচাতে পারবে না। ঝিলের ডান দিকের কোনাতে একটা মস্ত বড়ো একতলা বাড়ি আছে তবে বহু বছর থেকে কেউ থাকে না বলে জঙ্গল ও আগাছাতে ভরে গিয়েছে – দেওয়ালের অনেক জায়গাতে পলেস্তারা খসে পড়ে ইট গুলো যেন দাঁত বের করে রয়েছে। যখন লোকজন থাকতো তখন বোধহয় বাড়ির সামনে সুন্দর ফুলের বাগান ছিলো আর পেছনে আম, জাম, কাঁঠালের বিরাট বাগান তাই এখনও নানা রকমের ফুল ফোটে আর আম, জাম আর কাঁঠালে গাছ ভরে যায় তবে সাপের ভয়ে কেউ ওই সব ফল পাড়তে যায় না – সব পেকে মাটিতে পড়ে পচেই নষ্ট হয়। বাড়ির পাঁচিলের অবস্থাও খুবই খারাপ – অনেক জায়গাতেই ধসে গিয়েছে। ওরা ওই পাঁচিলের ধার থেকে দেখেছে সামনের লোহার গেটটা ভেঙ্গে এক দিকে ঝুলে আছে, সামনের দরজাতে মস্ত বড়ো তালা কিন্তু সেটাতেও মরচে পড়ে এমন অবস্থা চাবি থাকলেও মনে হয় আর খোলা যাবে না। সমস্ত জানালা বন্ধ আর তাতে নোংরা শ্যাওলা জমে আছে আর বড় বড় মাকড়সা বিরাট সব জাল বানিয়ে রেখেছে। গেট থেকে বাড়ির গা ঘেঁসে একটা সুঁড়ি পথের মত বাড়ির পেছন দিকে গিয়েছে – আগে বোধহয় ইট দিয়ে বাঁধানো ছিলো এখন তার বিশেষ কিছুই নেই আর পুরোটা কাঁটা গাছ, আগাছা, লতানে গোলাপ আর মাকড়সার জালে ভরে গিয়েছে। আজ সন্তুর জন্মদিন – রবিবার বলে সকাল থেকেই রন্তু ও অন্তুর মা বাবারাও এসে গিয়েছে ওদের সাহায্য করতে আর সেই সাথে জমিয়ে আড্ডা দিতে। সকাল এগারোটা নাগাদ সন্তু মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেরিয়েছে পাড়ার দোকান থেকে বন্ধুদের জন্য ক্যাডবেরি চকোলেট কিনতে। ঘন্টা খানেক পর সন্তুর মার খেয়াল হয়েছে সন্তুর তো এত সময় লাগার কথা নয় –

সন্তুর বাবাকে ডেকে বললেন, ‘একবার দেখো না গো দোকানে গিয়ে সন্তুটা কোথায় গেলো – এখনো স্নান টান করে নি – হয়তো মাঠে তিনটেতে মিলে খেলতে শুরু করেছে – তিন জনের খেলার যা নেশা।’ তিন বাবাই বেরিয়ে পড়লেন সন্তুর খোঁজে – মাঠে কেউ নেই, রন্তুর বাড়ির রোয়াকে অন্তু ও রন্তু লুডো খেলছে – ওরাও জানে না সন্তুর খবর। সবাই মিলে দল বেঁধে দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে মালিক বাসুদা বললো, ‘সন্তু তো প্রায় ঘন্টা খানেক আগে এসেছিলো – তিনটে ক্যাডবেরি চকোলেট কিনে বাড়ির দিকে দৌড়ালো।’ সন্তু এখনও বাড়ি ফেরেনি শুনে দোকানের কর্মচারি গবা বললো, ‘আমি তখন বাইরে ঝাঁট দিচ্ছিলাম – দেখি একটু দূরে ওই মোড়টায় রোগা মতো চোখে সান গ্লাস পড়া দাড়িওয়ালা একটা লোক সন্তুর সাথে কথা বলছে। সামনের রাস্তাটা ওখানে ঘুরে গিয়েছে বলে তারপর ওরা কোন দিকে গেলো দেখতে পাই নি।’ বাসুদা একটু ভেবে বললো, ‘ওই রকমই একটা লোককে দিন দুয়েক হলো এদিকে ঘুরতে দেখেছিলাম আর হ্যাঁ, লোকটার ডান গালে একটা বাজে ধরনের কাটা দাগ যেটা দাড়ি দিয়েও ঢাকতে পারে নি।’ বলতে না বলতে সন্তুর বাবার মোবাইল বেজে উঠলো – সন্তুর মার ফোন – কাঁদতে কাঁদতে কোন রকমে বললেন, ‘এক্ষুনি বাড়ি এসো – ভীষণ বিপদ।’ ওরা দৌড়ে বাড়ি এসে দেখে তিন মা-ই কাঁদছে – সন্তুর মা কোন রকমে জানালেন, ‘একটু আগে একটা ফোন এসেছিলো – একটা লোক ফ্যাস ফ্যাসে গলায় বলেছে ও সন্তুকে চুরি করেছে – এক লাখ টাকা পেলে তবেই ছাড়বে নয়তো – -’ বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন – একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘তারপর লোকটা সন্তুকে ফোন দিয়েছিলো – সন্তু বলছিলো, মা আমাকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে পবাতে – -’ ‘ওর কথা শেষ হবার আগেই লোকটা ফোন কেড়ে নিয়ে বলেছে, পুলিস ফুলিস করলে খুব খারাপ হয়ে যাবে – কালকে সকালের মধ্যেই টাকা চাই – কোথায় দিতে হবে সেটা কালকে সকালে জানাবে বলেই লাইন কেটে দিলো।’ রন্তুর বাবা একটু ভেবে আস্তে করে বললো, ‘এখানকার থানার ইন-চার্য নিবারণ দত্তর সাথে আমার পরিচয় আছে –

 

আমি ওর সাথে কথা বলে দেখছি চুপচাপ কিছু করা যায় কি না। আজ তো রবিবার – ব্যাঙ্ক বন্ধ – টাকার ব্যবস্থা কী করা যায় সেটাও দেখতে হবে।’ ওর ফোন পেয়ে নিবারণ দত্ত মিনিট পনেরোর মধ্যে এসে হাজির হলেন – ওকে দেখে রন্তু ও অন্তু বাইরে বেরিয়ে সিঁড়িতেই বসে পড়লো। দুজনেই গালে হাত দিয়ে ভাবছে সন্তুকে কোথায় নিয়ে লুকিয়ে রাখতে পারে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে ফোন করেছে তার মানে খুব একটা দূরে নিয়ে যায় নি – তাহলে? অন্তু বললো, ‘এ পাড়ার সব বাড়ি তো আমরা চিনি – এখানে রাখবে না – তাহলে কোথায়?’ রন্তু একটু ভেবে বললো, ‘আচ্ছা, মাসির সাথে তো লোকটা টাকার কথাই বলেছিলো তবে সন্তু বলেছিলো, মা আমাকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে পবাতে – তাই না?’ ‘সন্তুকে চেয়ারে বেঁধে রেখেছে – – মানে কোন বাড়িতেই হবে কিন্তু ‘পবা’টা কী রে? কোন হেঁয়ালি নয়তো রন্তু?’ হঠাৎ রন্তু উঠে দৌড়ালো বাড়ির দিকে – অন্তু দৌড়ে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, ‘হঠাৎ বাড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করলি?’ ‘আমি বুঝে গেছি – আর সময় নেই – সন্ধ্যের আগেই সন্তুকে ছাড়াতে হবে আর তার জন্য কিছু জিনিষের দরকার তাই বাড়ি যাচ্ছি – তুইও আয়।’ ‘কিন্তু কোথায় রেখেছে সন্তুকে?’   রন্তু দাঁড়িয়ে একটু দম নিলো – ‘তোর মনে আছে সন্তু ঝিলের পাশের পড়ো বাড়িটার সংক্ষেপে নাম দিয়েছিলো ‘পবা’ যাতে অন্য কেউ বুঝতে না পারে। সন্তুর কিন্তু খুব বুদ্ধি রে, বেশী কিছু বলতে গেলে লোকটা মারতে পারে বলে এক কথায় ‘পবা’ বলেছে যাতে আমরা বুঝতে পারি। তার মানে ও চাইছে আমরা গিয়ে ওকে উদ্ধার করি – বেশী লোক জন নিয়ে গেলে লোকটা বুঝতে পেরে ওকে মেরে ফেলতে পারে। তোদের বাড়ি তো তালা বন্ধ কিন্তু আমাদের বাড়িতে মালতীদি আছে তাই ওখানেই যাচ্ছি – লোকটাকে সামলাতে হলে হাতে তো কিছু থাকা দরকার – দেখি বাড়িতে কী পাওয়া যায়।’ বাড়িতে দুটো হকি স্টিক পাওয়া গেলো তাছাড়া ওরা মোটা দড়ির একটা গোছা, স্টিকিং প্লাস্টারের রোল, দেশলাই আর মোমবাতি নিলো – কী জানি কখন কী দরকার হয়। আর দাঁড়ানো নয় – দৌড়াতে দৌড়াতে ওরা মিনিট দশেকের মধ্যে পড়ো বাড়ির কাছে চলে এলো – চারদিক দেখে নিয়ে এগিয়ে গেলো গেটের দিকে তারপর ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে গেটের পর ওই সুঁড়ি পথের রাস্তা কেউ বোধহয় একটু পরিষ্কার করেছে। অন্তু কনুইএর গোত্তা মেরে ফিস্‌ ফিস্‌ করে রন্তুকে বললো, ‘মনে হয় ওই সুঁড়ি পথ দিয়েই পেছনে যেতে হবে –

লোকটা সুঁড়ি পথটা যাতায়াতের মতো করে রেখেছে তার মানে ওরা বাড়ির পেছন দিকেই আছে। তবে খুব সাবধান – চোখ কান খোলা রেখে এগুতে হবে – রাস্তাটা কাঁটা গাছ আর লতানে গোলাপে ভর্তি আর কিছু জল বিছুটির গাছও আছে – সাপ থাকার চান্স খুব বেশি। কোন রকম আওয়াজ নয় যাতে লোকটা টের না পায়। সন্ধ্যে হয়ে গেলো খুব মুস্কিল হয়ে যাবে অতএব হাতে সময় খুব কম। শোন, লোকটা নাগালের মধ্যে এলেই গায়ের জোরে হকি স্টিক চালাবি যাতে মাটিতে শুয়ে পড়ে না হলে আমাদেরও ধরে সন্তুর সাথে বেঁধে ফেলবে।’ গেটের ভেতর চুপিসাড়ে ঢুকে দেখলো সুঁড়ি পথটা শুকনো ও পচা পাতায় ভরে আছে – আশে পাশে বেশ কিছু লাল পিঁপড়ের ঢিপি আর এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা পায়ে কামড়াতে রীতিমত জ্বালা করতে শুরু করেছে তবে সন্তুকে বাঁচানো ছাড়া আর কোন চিন্তাই ওদের মাথায় নেই তাই সাপ খোপের কথা ভুলে ধীরে ধীরে হকি স্টিক দিয়ে কাঁটা গাছ সরিয়ে ওরা এগিয়ে চললো – সামনে অন্তু আর পেছনে রন্তু। বাড়িটা বেশ বড়ো তাই ওদের অনেকটা পথ এভাবে এগুতে হবে। বিকেলের পড়ন্ত রোদে সুঁড়ি পথে রোদ ও ছায়ার খেলা তবে জঙ্গলের জন্য ছায়াটাই বেশি। রাস্তার দু ধারে লতানে গোলাপ আর কাঁটা গাছের ডালগুলো লম্বা হয়ে মাথার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। বাড়িটার পলেস্তারা ওঠা দেওয়াল থেকে এই সব ঝোপ ঝাড়ের সাথে প্রচুর মাকড়সার জাল আর তাতে মরা পোকা মাকড় ঝুলছে – বেশ বড়ো বড়ো কালো মাকড়সা জালের মধ্যে বসে দোল খাচ্ছে – মাকড়সা গুলোর গায়ে ও পায়ে কালো কালো লোমের মত – দেখলেই ভয়ে গায়ে কাঁটা দেয়। মাকড়সাগুলো দেখতে গিয়ে অন্তুর হকি স্টিক দিয়ে উঁচু করে রাখা একটা কাঁটা গাছের ডাল স্লিপ করে ওর মাথায় পড়তে রন্তু দেখে কাঁটার খোঁচায় অন্তুর গাল ও ঘাড়ের বেশ কয়েক জায়গা ছড়ে গিয়ে রক্তের ফোঁটা জমছে। রন্তু নিজের হকি স্টিক দিয়ে ওই ডালটা সরাবার চেষ্টা করতে কাঁটা গাছের ডালটা অন্তুর জামাতে আটকে বেশ খানিকটা ছিঁড়ে দিলো আর রন্তু খেয়াল না করাতে একটা জল বিছুটির গাছে পা লেগে ভীষণ চুলকাতে শুরু করে জায়গাটা ফুলে উঠলো। সব ভুলে আর একটু এগুতেই দেখে সামনে হাত ছয়েক দূরে রাস্তার উপর বড় বড় দুটো গিরগিটি ঘাড় ফুলিয়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে – লাল লাল চোখ দুটো চারদিকে ঘুরছে আর গলার নিচেটা নিশ্বাসের সাথে সাথে ওঠা নামা করছে। ওরা একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লো –

 

এতো বড় গিরগিটি আগে দেখে নি – বেশ ভয় করছে। হঠাৎ গিরগিটি দুটো মাথা ঘুরিয়ে পাশের ঝোপে কিছু দেখতে পেয়েই ভয়ে কিংবা রাগে পিঠের কাঁটাগুলো খাড়া করে পেছন ফিরে দৌড়ালো ভেতরের বাগানের দিকে। সাথে সাথেই কেমন একটা সর্‌ সর্‌ আওয়াজ শোনা গেলো ওই ঝোপের ভেতরে যেন শুকনো পাতার উপর দিয়ে ভারি কিছু একটা চলতে শুরু করেছে। অন্তু ও রন্তু চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে ওই ঝোপ থেকে কিসের আওয়াজ আসছে সেটা বোঝার জন্য – কয়েক সেকেণ্ড তারপরই ধীরে ধীরে একটা মস্ত বড়ো সাপ বেরিয়ে এলো ওই ঝোপ থেকে সুঁড়ি পথের উপরে – সাত আট ফুটের উপরই লম্বা হবে, বেশ মোটা আর কালো রঙ্গের। দেখেই ভয়ে অন্তু রন্তুর প্রাণ উড়ে গিয়েছে – ওরা নড়বার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে একই ভাবে কেমন স্ট্যাচুর মতো হয়ে গেলো – গলা মুখ শুকিয়ে গিয়েছে – জিভটা টাকরাতে আটকে গিয়েছে – হৃৎপিণ্ড এতো জোরে ধক্‌ ধক্‌ করতে শুরু করেছে যেন ফেটে যাবে – রন্তু পেছন থেকে অন্তুর জামার কলার জোরে চেপে আছে। সাপটা ওদের দেখতে পেয়েই ফণা তুলে দাঁড়িয়েছে – মাটি থেকে প্রায় দু ফুট উঁচু তো হবেই – দুজনে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফণার দু পাশে মটর ডানার মত লাল চোখ দুটোর দিকে যেন ওই চোখ ওদের সম্মোহন করেছে – ফণাটা ধীরে ধীরে ডাইনে বাঁয়ে দোল খাচ্ছে যেন একটু নড়লেই বিদ্যুৎ বেগে ছোবল মারবে সেই সাথে চেরা জিভটা মাঝে মাঝেই লক্‌ লক্‌ করে বেরিয়ে আসছে অনেকটা। বেশ খানিক ক্ষণ পর মানে কতো সময় ওদের খেয়ালই নেই সাপটা ধীরে ধীরে ফণা নামিয়ে ঘুরে ভেতরের বাগানের পথ ধরলো। সাপটা চলে যাবার পরও ওরা কিছু ক্ষণ ওই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো সাপটা যদি আবার ফিরে আসে সেই ভয়ে – ঘামে ওদের জামা টামা ভিজে গিয়েছে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্তু তাকালো রন্তুর দিকে – ভয়ে ওদের মুখ সাদা হয়ে গিয়েছে। আবার খুব সাবধানে এগুনো শুরু – ঝোপটার কাছে এসে খুব ভালো করে ওটার নিচেটা দেখলো আর কিছু আছে কিনা – ওখানে শুধু বিরাট লম্বা একটা সাপের খোলস পড়ে আছে। এবার নিশ্চিন্ত হয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো বাড়ির পেছন দিকে। একটু এগোতে শোনা গেলো কে যেন ফ্যাস ফ্যাসে গলায় একটা চলতি হিন্দী সিনেমার গান গাওয়ার চেষ্টা করছে আর আওয়াজটা আসছে বাড়ির একদম পেছনের খোলা জানালা থেকে। এবার ওরা আরো আস্তে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে ওই জানালার ঠিক নিচে এসে একটু সময় বসে রইলো – পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে লোকটার ফ্যাস ফ্যাসে গলা, ‘এখানে কেউ তোকে খুঁজে পাবে না – এটা হানা বাড়ি – লোকে ভয়ে আসে না – কোন আওয়াজেও কেউ সাড়া দেবে না। কালকে সকালে টাকা না পেলে তোকে গলা টিপে মেরে পেছনের বাগানে পুঁতে দেবো আর টাকা পেলে তোকে এভাবে বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে আমি পগার পার। দুই ভাবেই তুই মরবি – এই বাগানে মস্তো বড়ো কাল কেউটে আছে – আমি নিজের চোখে দেখেছি – কাল কেউটে কাকে বলে জানিস? সাপের রাজা – এক ছোবলে মানুষ কেন হাতি পর্যন্ত উল্টে যায় আর তুই তো একটা বাচ্চা ছেলে।’ অন্তু রেগে উঠতে গেলে রন্তু জামার কলার ধরে ওকে বসিয়ে দিলো তারপর খুব ধীরে ডিঙ্গি মেরে জানলার পাল্লার ফাঁক দিয়ে একটু সময় ভেতরটা দেখলো। জানালাটা বেশ উঁচু – অন্তুর পক্ষে নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়।

তারপর রন্তু একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে দাগ কেটে আর ঠোঁট নেড়ে অন্তুকে বোঝালো জানালার উল্টো দিকে একটা চেয়ারে সন্তুকে বেঁধে রেখেছে আর লোকটা জানালার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে – বাড়ির পেছন দিকে ঘরের দরজা। ওরা আস্তে আস্তে বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখলো দরজাটা বন্ধ। এদিকে সূর্য প্রায় ডুবে গিয়েছে – গাছের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে চার দিক প্রায় ঢেকে ফেলেছে – আরও অন্ধকার হলে ওই সুঁড়ি পথ দিয়ে ফিরে যাওয়া খুবই মুস্কিল হবে আর সাপটা যদি আবার আসে তাহলে তো রক্ষা নেই। এখনি কিছু একটা করতে হবে যাতে লোকটা বেরিয়ে আসে না হলে তো ওকে পেটানোও যাবে না। রন্তু পকেট থেকে দেশলাই বের করে অন্তুকে নিঃশব্দে বোঝালো জানালার নিচে শুকনো পাতাতে আগুন ধরালে ধোঁয়া দেখে লোকটা হয়তো বেরিয়ে আসবে। ওরা বেশ খানিকটা শুকনো পাতা ও ছোট ছোট ডাল জানালার নিচে জড়ো করে ওতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে চটপট পেছনের দরজার দুপাশে হকি স্টিক শক্ত করে দু হাত দিয়ে ধরে গুঁড়ি মেরে বসে পড়লো অনেকটা যেন বাঘ শিকার ধরার আগে যেমন করে বসে সেই ভাবে।

 

শুকনো ও পচা পাতা মিশে আগুনের থেকে ধোঁয়াই বেশি – আস্তে আস্তে ধোঁয়া জানালার দিয়ে দেখা যেতেই সন্তু বলে উঠলো, ‘দ্যাখো দ্যাখো, বাইরে নির্ঘাৎ শুকনো পাতাতে আগুন ধরেছে – একটু আগে তুমি সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো ফেলেছিলে সেটা থেকেই হবে।’ চেয়ারে আওয়াজে মনে হলো লোকটা উঠে জানালা দিয়ে নিচের আগুনটাকে দেখলো, ‘হতে পারে তবে আগুনটা নেভানো উচিত নয়তো চারদিকের শুকনো পাতাতে আগুন ছড়িয়ে গেলে মুস্কিল হবে।’ অন্তু ও রন্তু লোকটার পায়ের আওয়াজ পেয়ে আরো শক্ত করে হকি স্টিক ধরে দরজার পাশের কাঁটা ঝোপের ভেতরে সরে গেলো – হাত পা উত্তেজনাতে কাঁপতে শুরু করেছে – পিঠে পায়ে কাঁটা ফুটে রীতিমত জ্বলছে – কোন কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ওরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। দরজা খোলার ক্যাঁচ কোঁচ আওয়াজের পরই দেখা গেলো লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার বাইরে আসছে – যেই মুহূর্তে সিঁড়ি থেকে মাটিতে পা দিয়েছে রন্তু গায়ের সমস্ত জোর দিয়ে হকি ষ্টিক চালালো দুই হাঁটুতে আর অন্তু উঠে দাঁড়িয়েই মারলো ডান হাতের কনুইতে – সাথে সাথে লোকটা ‘বাবা গো’ বলে মাটিতে পড়ে যেতেই দুজনে লাফিয়ে সামনে এসে দমাদম্‌ পেটাতে শুরু করলো লোকটা পিঠে আর দুই উরুতে – লোকটা প্রচণ্ড যন্ত্রণাতে ‘ওরে বাবারে – ওরে মারে – আর মারিস না’ বলে কঁকিয়ে উঠে কোন রকমে সরে যাবার চেষ্টা করে দুটো ভাঙ্গা পায়ের জন্য পারলো না। ওরা দেখলো এই সেই দাড়িওয়ালা লোক যার ডান দিকের গালে চিবুক অবধি একটা বিচ্ছিরি কাটা দাগ। এবার রন্তু বলে উঠলো, ‘অন্তু, অন্তু, লোকটাকে আর মারিস না – মরে যেতে পারে। ওকে জ্যান্ত নিবারণ কাকুর কাছে নিয়ে যেতে হবে।

সন্ধ্যে প্রায় হয়ে এলো – তুই তাড়াতাড়ি সন্তুর বাঁধন খুলে নিয়ে আয়। এর মধ্যে আমি ওর হাত পা দুটো বেঁধে দিচ্ছি।’ বলেই লোকটার দুটো গোড়ালিকে এক সাথে ষ্টিকিং প্লাস্টার দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে দিলো – দুটো হাতকেও কব্জির কাছে একই ভাবে ষ্টিকিং প্লাস্টার দিয়ে বেঁধে দিলো। ‘এবার বাছাধন কোথায় যাবে? সন্তুকে বলা হয়েছে মেরে এখানে পুতে ফেলবে নয়তো হাত পা বেঁধে কেউটে সাপের জন্য রেখে যাবে। এবার তোকে এখানে এভাবে ফেলে রেখে সন্তুকে নিয়ে আমরা পগার পার – তারপর বড় কেউটেটা এসে যখন তোকে আদর করবে তখনই তোর উচিত শাস্তি হবে।’ লোকটা শুধু কাতরে গেলো – কথা বলার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই। এর মধ্যে অন্তু ও সন্তু লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সন্তু ওদের দুজকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, ‘আমি জানতাম তোরা আসবি – সেই জন্যই বলেছিলাম আমাকে পবাতে আটকে রেখেছে – তোরা ছাড়া আর তো কেউ পবা জানে না।’ ওদের তিন জনের আনন্দ আর ধরে না। এবার রন্তু বললো, ‘এবার এই লোকটাকে কী করে নিয়ে যাওয়া যায় বলতো? এতো বড় লাশকে তো আমরা ঘাড়ে তুলে নিতে পারবো না আর একে এখানে ফেলে রাখাও যায় না – যে ভাবেই হোক নিবারণকাকুর হাতে তুলে দিতে হবে।’ সন্তু বুদ্ধি দিলো, ‘এক কাজ করা যাক – আমাকে যে দড়ি দিয়ে বেঁধেছিলো সেটা বেশ লম্বা আর শক্ত। ওই দড়ি দিয়ে লোকটার বুকের কাছে বেঁধে তিন জনে মিলে মনে হয় হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে পারবো। বাড়ির বাইরে গিয়ে পরের ব্যবস্থা ভাবা যাবে। আর দেরি নয় – সূর্য কিন্তু ডুবে গিয়েছে।’ লোকটার বগলের তলা দিয়ে দড়িটা বুকের কাছে খুব ভালো করে বেঁধে তিন জনে হেঁইও হেঁইও বলে টানতে শুরু করে ধীরে ধীরে ওই সুঁড়ি পথ দিয়ে ওকে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার সময় গরম ছাই আর জ্বলন্ত কয়লাতে পিঠে জ্বালা করতেই লোকটা কোঁ কোঁ করে উঠলো – কোন কিছুকে পাত্তা না দিয়ে ওরা কাঁটা ঝোপ, লতানে গোলাপের ডাল সব কিছুর উপর দিয়ে ওকে টেনে নিয়ে চললো ফলে লোকটার জামা প্যান্ট ছিঁড়ে গিয়ে পুরো পিঠ, পা কাঁটাতে ভীষণ ভাবে ছড়ে যেতে লাগলো। অনেক কষ্টে সন্তুরা ওকে গেটের বাইরে এনে মাটিতে বসে পড়লো – তিনজনই রীতিমত হাঁপাচ্ছে – লোকটারও কোন রকম সাড়া শব্দ নেই – হয়তো বা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। একটু দম নিয়ে রন্তু বললো, ‘আর তো পারা যাচ্ছে না – এবার কি করা যায়? এভাবে মাঠের ভেতর দিয়ে লোকটাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গেলে মাঠের নুড়ি পাথরে লোকটার পেছন দিকে কিছুই থাকবে না – বাড়ি পৌঁছাবার আগেই টেঁসে যাবে।’ চার দিকে গোধূলির শেষ আলো – একটু পরেই ঘুরঘুট্টি অন্ধকার নেমে আসবে আর তার আগেই ওদের রওয়ানা দিতে হবে।

উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখতে শুরু করলো কোন লোক জন দেখা যায় কিনা। হঠাৎ অন্তু বললো, ‘দ্যাখ, দ্যাখ, ঝিলের ধারের রাস্তা দিয়ে একটা খালি ভ্যান রিক্সা গ্রামের দিকে যাচ্ছে – ওটাকে যে ভাবে হোক ধরতে হবে না হলে উপায় নেই।’ ওরা তিনজনে মিলে গলার জোরে চেঁচাতে শুরু করলো আর সেই সাথে গায়ের জামা খুলে ফ্ল্যাগের মত নাড়তে লাগলো। ভ্যান রিক্সাওয়ালা বোধহয় শুনতে পেয়েছিলো সেই সাথে জামা ওড়ানো দেখে রিক্সা ঘুরিয়ে এদিকে এগিয়ে এলো। কাছে আসতেই দেখে লোকটা ওদের চেনা – যারা মাঠের খেজুর গাছের রস নিয়ে খেজুর গুড় বানায় তাদেরই একজন। ওদের দেখে লোকটা অবাক হয়ে গেলো, ‘কি হলো দাদাভাইরা – ভর সন্ধ্যেবেলাতে এই পড়ো বাড়ির সামনে তোমরা?

শুনেছি এখানে বিরাট সব কাল কেউটে আছে। আর দড়ি বাঁধা লোকটাই বা কে?’ সন্তু উত্তর দিলো, ‘সে অনেক কথা, যেতে যেতে তোমাকে বলবো। এখন এই লোকটাকে তোমার ভ্যান রিক্সাতে তুলে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। একটু সাহায্য করো না?’ সবাই মিলে অজ্ঞান লোকটাকে কোন রকমে পাঁজা কোলা করে ভ্যান রিক্সাতে তুলে ওরা তিন জন ভ্যান রিক্সা ঠেলতে ঠেলতে বীর দর্পে রওয়ানা দিলো বাড়ির দিকে।

আরো পড়তে পারেন...

একটা আষাঢ়ে গল্প-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-১ম অংশ

দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ । সেখানে কেবল তাসের সাহেব , তাসের বিবি , টেক্কা…

একটা আষাঢ়ে গল্প-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-২য় অংশ

এমনি তো কিছুকাল যায় । কিন্তু এই তিনটে বিদেশী যুবক কোনো নিয়মের মধ্যেই ধরা দেয়…

দূরবর্তী এক নদীর উপকথা

এই সকালে কুয়ালালামপুর শহরটা নরম রোদের আলোয় ডুবে রয়েছে। সেই সঙ্গে মৃদুমন্দ বাতাসও বইছে। রোদ…