একলা বৈশাখ

‘মাছও ধরবেন জিমও করবেন’ —  এমন অঞ্চলের একটি দোকানের নাম ‘জয়নিতাই ভাণ্ডার’ রেল লাইনের ধারে জলাভূমি, ঝোপ, এখনও মাছরাঙা, পলিথিন ছাওয়া ঝুপড়ি, যেখানে চুল্লুর ঠেক, লাইনের ধার দিয়ে কাঁধে গামছা ফেলে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে মাঠ সারতে যায় ঝোপসন্ধানী মানুষ। প্রভাত আলোয় বিক্ষিপ্ত গজিয়ে ওঠা উঁচু উঁচু বাড়ির ব্যালকনি থেকে নেচার দেখতে দেখতে চা খাওয়া মানুষরা দেখে কর্তাল বাজাতে বাজাতে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে। লোকটার নাম হরিদাস সাহা, গলায় কন্ঠি। সকাল সাতটা সাড়ে সাতটাতেই দোকানটা খুলবে, যে দোকানটার নাম ‘জয়নিতাই ভাণ্ডার’।

নিজেদের বাসস্থানের সামনের ঘরেই এই দোকানটা করেছিলেন হরিদাস। টালির ঘর। তখন বাগজোলা খালের জল এত কালো ছিল না। খালধারে লম্বা লম্বা ঘাস গজাত, কাশফুল ফুটত, সেই ঘাসের ঝাঁটা তৈরি করত স্বামী — স্ত্রীতে। তারপর শুধু ঝাঁটা নয়, উনুনও। নানা রকমের বালতি উনুন, কড়াই উনুন, জোড়া উনুন, কেরোসিন স্টোভ, মাটির হাঁড়ি —  কলসিও। যখন মানুষ আর মাটির হাঁড়ি কেনে না, তখনও দোকানে মেটে হাঁড়ি। এখানেই সুদামের আপত্তি।

সুদাম ছোট ছেলে। বড় ছেলে সুবল কম বয়সেই মারা গেছে। সুদাম দেখে, ওর বাবা দোকানটা গুদাম করে রেখেছে। সুদাম ওর বাবাকে বহুবার বহুভাবে বলেছে, দোকানের আইটেম পাল্টাও। এখন এসব আদিম সভ্যতার জিনিসপত্র চলে না। বলে কোনও লাভ হয় না। সুদামের বাবা হরিদাসও পাল্টায় না। এখনও মুড়ি — বাতাসা, ধুতি — ফতুয়া, দেখা হলে জয়নিতাই।

সুদাম বলে, দোকানটা আমায় ছেড়ে দেন, আমি ভোল পাল্টে দেব। এই চুম্বক জায়গায় দোকান, ঠিকঠাক আইটেম রাখলে সংসারের হাল ফিরে যাবে, তোমাকে মার্বেল বসানো মন্দির বানিয়ে দেব। হরিদাস বলে এই দোকান আমার লক্ষ্মী। এই দোকান করেই দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি, তোকেও বিয়ে দিয়েছি বাপ, ডাল — ভাতের ব্যবস্থা তো হয়ে যায়। বোষ্টমরা এমন গোঁয়ার হয়? পাড়ার তোলাবাজদের শিখিয়ে দিয়েছিল, বাবার থেকে দশ হাজার টাকা ডিমান্ড কর। সেটাও হয়েছিল। হরিদাস মাতৃভাষায় বলেছিল, দিমু না যাও। কী করবা? দোকানে আগুন দিবা?

সুদাম একটা কারখানায় চাকরি করত। কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। দেওয়ালের বাণী সত্যি হল ওর জীবনে। কারখানাটা বন্ধ হওয়ার পরই ওর রোজগারপাতি বাড়ল। মেট্রো রেল বারাসত পর্যম্ত যাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই জমির দাম বাড়তে লাগল ঝটাক ঝটাক। ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হতে লাগল চারদিকে। বেদিয়া পাড়া জেলিয়া পাড়া আমড়াবাগানের ভিতরে সূর্যতোরণ, মেঘমল্লার, আগমনী, আকাশ প্রদীপ। ছায়ানীড় নামে একটা বড় প্রজেক্ট’ও হয়েছে জিটূ১০ — এর ছটা টাওয়ার। সুদাম ইট বালি সিমেন্ট সাপ্লাই করে, ফ্ল্যাট ভাড়া এবং বিক্রির দালালিও। গাছের গায়ে টিনের পাতে, খালপোলের গায়ে, বাজারের দর্মার বেড়ায় সুদাম সাহার নাম আর মোবাইল নম্বর লেখা, সেই সঙ্গে ‘বাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাটের সন্ধানের জন্য যোগাযোগ করুন’…। সুদামের নিজস্ব অফিসঘর এখনও হয়নি। কালীপদর চায়ের দোকানটাই ওর অফিস। একটা চুম্বক পজিশনে ফালতু জয়নিতাই ভাণ্ডার পড়ে আছে।

কী পাওয়া যায়? ঝাড়ু।

খুব রাগ হয় বাপের ওপর। ঝাড়ু মেরে ফোটাতে ইচ্ছে করে। মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেঁটিয়ে বিদেয় কর….। এই গানটা সুদামের বাবার খুব প্রিয়। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে এই গানটা বার বার বাজে জয়নিতাই ভাণ্ডারে। হালখাতা হয় যে…।

এই হালখাতা ব্যাপারটা হরিদাসের একটা পার্বণ। সুদাম যখন ছোট, তখন হরিদাস সবাইকে নিয়ে সকালবেলা গঙ্গায় যেত। নিম — হলুদ বাটা মাখতে হত গায়ে। সুদামের দিদি ছিল শ্যামলা ও একটু বেশি করে গায়ে ঘষত। সুদামকে বলত, একটু ফর্সা লাগে নারে ভাই! বাড়ি ফিরে শত্রু বলি দিতে হত। শত্রুবলি মানে, একটা মানুষের দেহ আঁকতে হত কাঠকয়লা দিয়ে। তারপর ওই মানুষটার মুখে একটা কাঁচা আম বসিয়ে দিয়ে একটা কাটারি হাতে নিয়ে মম্তর পড়তে হত —  জলের শত্রু ফলের শত্রু দূর যা। আমার শত্রু দূর যা। কোপ কোপ কোপন, শত্রু হল নিধন। এবার আমটাকে কোপ মেরে দু ভাগ করতে হত।

বাড়িতে বামুন এসে গণেশ পুজো দিত, সেই গণেশ মাথায় করে দোকানে যেত। আগের দিন সারা দুপুর ধরে নারকেল কুরে সন্দেশ বানানো। দোকানের হালখাতায় যারা আসত, তাঁদের একটা করে নারকোলের সন্দেশ। পরে, সেই সঙ্গে নিমকি, লবঙ্গলতিকা, এই সব। কাগজের বাক্সে। ক্যালেন্ডারও হয়েছিল কয়েক বছর। রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কিংবা গৌরনিতাই। কিংবা জগন্নাথদেব। স্থানীয় লোকজন ছাড়াও শেয়ালদার পাইকাররাও আসত। হালখাতা এখনও হয়। গত বছরও হয়েছিল। সুদামের ছেলেটার খুব উৎসাহ। দোকানে বসে থাকে। ওর দাদুর সঙ্গে খুব ভাব। দাদু ওকে কোকের বোতল দেয়, চিপসের প্যাকেটও। এখন দোকানে লোকজন হয় না। স্থানীয় কিছু বুড়ো, আর বাড়ির কাজের মেয়েরা, যারা ঝাঁটা ব্যবহার করে। ওরা একটা করে লাড্ডু নিয়ে যায়।

জন্মাষ্টমীর দু’দিন আগে সুদামের ছেলে জন্মায়। সিজার করতে হয়েছিল। সুদামের বাবার কী রাগ। কেন সিজার করে বাচ্চা পেট থেকে বের করা হল? আর দুটো দিন পরেই তো জন্মাষ্টমীর দিনে জন্মাত। এরপর হরিদাসের গোঁ, নাতির নাম রাখবে শ্রীকৃষ্ণের নামে কানাই।

হার্গিস না। এসব নাম চলে নাকি? হরিদাস কৃষ্ণের নামেই রাখবে। সুদাম একজনকে ফ্ল্যাট কিনিয়ে দিয়েছিল, বাংলা পড়ায়, কলেজে। ওকে বলেছিল কৃষ্ণ বোঝায় এমন একটা ঝিনচ্যাগ নাম বেছে দিতে। সে বলেছিল, পার্থসারথি চলবে? তেমন ঝিনচ্যাগ হল না, কিন্তু কানাই, গোপাল, কুঞ্জবিহারীর চেয়ে ভাল। হরিদাস যদিও গোপাল বলেই ডাকে। স্কুলে পার্থসারথি। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। আর দুটো রাইস দাও বলে মাকে। রাস্তায় যেতে যেতে সুদামও ছেলেকে ইংরেজি শিখিয়েছে। কুকুর দেখে ভৌ ভৌ বললে সুদাম বলেছে, ওটা ডগ। গরুকে হাম্বা বললে সুদাম বলেছে, ওটা কাউ। পাড়ায় নতুন গজানো হনুমান মন্দিরের ঠাকুরকে দেখে ছেলে জিজ্ঞাসা করেছিল, ওটা কি মাংকি বাবা? এসব ফেস করেছে সুদাম। ছেলে এখন ফোর। ভাল ইস্কুল। গাড়ি আসে। টিফিনে স্যান্ডুইচ। সব দালালি করেই হয়েছে। বাবার দোকান থেকে ইলেকট্রিক খরচাটাও হয় না। বলে বলে হাল্লাক হয়ে গেছে বাবা উনুন হটাও, ঝাঁটা হটাও, নিয়ে এসো জ্যাম — জেলি — সস — পেস্ট্রি। নিয়ে এসো কর্নফ্লেক্স’, চিজ — পনির — বাটার। শ্যাম্পু, লিপস্টিক, ন্যাপকিন। দেখছ না সূর্যতোরণ — আকাশ প্রদীপ — ছায়ানীড়…। কোনও কথাই কানে যায় না। স্ত্রী বিয়োগের পর একটু যেন পাগলাটে হয়ে গেছেন হরিদাস।

সাপ্লাই লাইনে কিচাইন লেগেছে। অনেক রকম দাদা। মাল্লু দিতে হয়। দালালি লাইনেও কম্পিটিশন। নতুন নতুন ছেলেরা আসছে। সবার পেছনেই খুঁটি। ঝামেলা চলছে।

একদিন বেশ বড় রকমের গণ্ডগোল। গুলিও চলল। কেউ মারা যায়নি। একজনের পায়ে লেগেছিল। সুদামকে ধরে নিয়ে গেল পুলিস। হাজতে পুরল। পুলিস বাড়িতে এলো সার্চ করতে। এ বাড়িতে পিস্তল খুঁজতে এসেছে। পিস্তল।

এখানে পিস্তল? এ বাড়িতে গৌরনিতাই, তুলসী গাছ। মুড়ি — বাতাসা, কন্ঠিমালা। পুলিস খাটের তলা দেখে, শুধু সুদামের ঘর কেন, হরিদাসের ঘরেও। গৌরনিতাইয়ের সিংহাসনের তলাতেও লাঠি ঘোরায়। বলে আসন সরাও, কিছুই পায় না, কিন্তু সেই দিনই শুয়ে পড়ে হরিদাস, কথা বন্ধ। ছেলে হাজতে। সুবলের বউ খেতে ডাকে, ওঠে না, ধাক্কা দেয়, সাড়া দেয় না, পাশের বাড়ির লোক ডাকে, তারপর হাসপাতাল, জানা যায় সেরেব্রাল স্ট্রোক।

দোকানটা এখন সুদামের। বাবার দেওয়া জয়নিতাই ভাণ্ডারের ‘জয়’টা রেখেছে, নাম দিয়েছে এনজয়। সিমেন্ট বালি সাপ্লাইয়ের খতরনাক কাজটা ছেড়ে দিয়েছে। দালালিটা রেখেছে। একটা ফ্ল্যাট বেচতে পারলেই টু পার্সেন্ট। মানে তিরিশ লাখে ফ্ল্যাট বেচলে ষাট হাজার টাকা। এনজয়টাই অফিসঘর। দোকানে হরেক আইটেম। কেক পেস্ট্রি বার্গার ওধারে, এপাশে টিস্যু পেপার, নানা ধরনের ন্যাপকিন, কসমেটিক’। এ ছাড়া সি ডি — ও। নানা ধরনের সি ডি। কেউ এসে তিনটে আঙুল তুলে দেখালে সুদাম একটা থ্রি এ’ দিয়ে দেয়।

সুদামের বাবা হরিদাস হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিল। বাঁ দিকটা প্যারালিসিস হয়ে যায়। তারপর আয়া, ফিজিওথেরাপি, একগাদা টাকা বেরিয়ে গেছে। এখন হাতে লাঠি নিয়ে একটা পা টেনে একটু একটু হাঁটতে পারে। কিছুদিন আগে একটা গাড়িতে বহুত কষ্ট করে চাপিয়ে দোকানটা দেখাতে এনেছিল সুদাম। গৌরনিতাইয়ের ছবিটা একই জায়গায় আছে দেখে খুশি হয়েছিল। মাথা ঘুরিয়ে দোকানটা দেখছিল। সুদাম জিজ্ঞাসা করেছিল, ভাল হয়েছে তো বাবা? হরিদাস ঘাড় নাড়িয়েছিল। ওটা হ্যাঁ নাকি না, বোঝা যায়নি।

ট্র্যাডিশনটা নষ্ট করেনি সুদাম। ঝাঁটাও রাখে। ‘ডাস্টার’ও বলে কেউ কেউ। পালকের ঝাড়ু আছে গাড়ি ঝাড়ার, কম্পিউটার ডাস্টারও, আর ফুলঝাড়ুগুলো ঘাসের নয়, নরম প্লাস্টিকের।

হালখাতাও করে। নতুন খাতাটা নিয়ে কালীঘাট যায় সকালে। গত বছরই তো প্রথম হালখাতাটা হল। গণেশ পুজোও হয়েছিল। অন্যবারের মতো শত্রুবলিটাও হয়েছিল। শত্রুবলির রিচুয়ালটা করতে পার্থর খুব মজা লাগে। একটা এনিমি এঁকে ওর মুখের ওপর কাঁচা আম খ্যাচাৎ, তোমার এনিমিও ফিনিশ। সত্যি সত্যি কী হয় এসব? এগুলোকে বলে সুপারস্টেশন। দাদু যেমনভাবে নিত্যানন্দ প্রভু দাদুর পায়ে টাচ দিয়েছিল বলে দাদু হাঁটতে পারছে। তবে নিয়মিত ওষুধ খায়। প্রেসারটা বেশি। গতবার ক্যালেন্ডারও করল সুদাম। অন্যরকম। ক্যালেন্ডারের লোক ক্যাটালগ নিয়ে এসেছিল। গোপিনীদের বস্ত্রহরণই সিলে’ করেছিল সুদাম। আট বস্ত্রহীনা গোপিনী লজ্জাস্থান আড়াল করছে।

এই তো আবার বৈশাখ মাস আসছে। এবার ভাল প্যাকেট করবে। দোকানটা খুব চলছে। সুদাম বাড়িটা সাজিয়ে নিয়েছে। নিজের একটা প্রাইভেট ঘর। ওখানে কম্পিউটার, ছোট টিভি, চেয়ার — টেয়ার।

স্কুলে সি বি এস সি — র সিট পড়েছে। পার্থর ছুটি। পার্থর মায়ের ভুরু দুটো নাকি কেমন সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো হয়ে গেছে। ও দুটোকে ফার্স্ট ব্র্যাকেটের মতো বানাতে গেছে। পার্থ ওর বাবার ঘরে ঢুকে কম্পিউটার অন করে। গুগুল খুলে ‘কৃষ্ণ’ সার্চ দিয়ে একটা সাইট খোলে। ওখানে সব ছবি। দু’হাতে একটা পাহাড়কে উঠিয়ে ধরেছে, সাপের ফণার ওপর দাঁড়িয়ে নাচ্ছে, দু’হাতে বকের দুই ঠোঁট ফাঁক করে চিরে দিচ্ছে কৃষ্ণ…। দাদুকে ডাকে পার্থ, টেনে নিয়ে যায়। দ্যাখো দাদু দ্যাখো…। পার্থ ওর দাদুকে দেখাতে থাকে ননীচোরা গোপাল, ঝুলন, রাসের ছবি। দাদু বলে, তুই এত কিছু শিখে গেছিস গোপাল আমার…। পার্থ বলে, আরও কত কী জানি। এই দেখো না, তোমার নাম লিখছি, কতরকম অক্ষর, এই দ্যাখো– বড় করে দিচ্ছি, ছোট করে দিচ্ছি। সিডি চালাব? সিনেমা দেখবে?

—স্বপ্নময় চক্রবর্তী

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!