সে — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর– সপ্তম অংশ

গল্পের ৬ষ্ঠ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পুপুদিদি বললে, দাদামশায়, ওদের দুজনের বিয়ে হল কি না বললে না তো কিছু।

বুঝলুম, বিয়ে হওয়াটা জরুর দরকার। বললুম, বিয়ে না হয়ে কি রক্ষা আছে।

তার পরে তোমার সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছে কি।

হয়েছে বৈকি। তখন ভোর সাড়ে চারটে, রাস্তার গ্যাস নেবে নি। দেখলুম, নতুন বউ তার বরকে ধরে নিয়ে চলেছে।

কোথায়।

নতুন বাজারে মানকচু কিনতে।

মানকচু !

হ্যাঁ, বর আপত্তি করেছিল।

কেন।

বলেছিল, অত্যন্ত দরকার হলে বরঞ্চ কাঁঠাল কিনে আনতে পারি, মানকচু পারব না।

তার পরে কী হল।

আনতে হল মানকচু কাঁধে করে।

খুশি হল পুপু ; বল্‌লে, খুব জব্দ !

সকালে বসে চা খাচ্ছি এমন সময় সে এসে উপস্থিত।

জিগেস করলুম, কিছু বলবার আছে?

ও বললে, আছে।

চট্‌ করে বলে ফেলো, আমাকে এখনি বেরতে হবে।

কোথায়।

লাটসাহেবের বাড়ি।

লাটসাহেব তোমাকে ডাকেন নাকি।

না, ডাকেন না, ডাকলে ভালো করতেন।

ভালো কিসের।

জানতে পারতেন, ওঁরা যাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে থাকেন আমি তাদের চেয়েও খবর বানাতে ওস্তাদ। কোনো রায়বাহাদুর আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না, সে কথা তুমি জান।

জানি, কিন্তু আমাকে নিয়ে আজকাল তুমি যা – তা বলছ।

অসম্ভব গল্পেরই যে ফরমাশ।

হোক – না অসম্ভব, তারও তো একটা বাঁধুনি থাকা চাই। এলোমেলো অসম্ভব তো যে – সে বানাতে পারে।

তোমার অসম্ভবের একটা নমুনা দাও।

আচ্ছা বলি শোনো —

স্মৃতিরত্নমশায় মোহনবাগানের গোল – কীপারি করে ক্যাল্‌কাটার কাছ থেকে একে একে পাঁচ গোল খেলেন। খেয়ে খিদে গেল না, উলটো হল, পেট চোঁ – চোঁ করতে লাগল। সামনে পেলেন অক্‌‍টর্লনি মনুমেণ্ট। নীচে থেকে চাটতে চাটতে চুড়ো পর্যন্ত দিলেন চেটে। বদরুদ্দিন মিঞা সেনেট হলে বসে জুতো সেলাই করছিল, সে হাঁ – হাঁ করে ছুটে এল। বললে, আপনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হয়ে এত বড়ো জিনিসটাকে এঁটো করে দিলেন !

আরো পড়ুন  সে -- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-- নবম অংশ

‘ তোবা তোবা’ বলে তিনবার মন্যুমেণ্টের গায়ে থুথু ফেলে মিঞাসাহেব দৌড়ে গেল স্টেট্‌স‍্ম্যান – আপিসে খবর দিতে।

স্মৃতিরত্নমশায়ের হঠাৎ চৈতন্য হল, মুখটা তাঁর অশুদ্ধ হয়েছে। গেলেন ম্যুজিয়মের দরোয়ানের কাছে। বললেন, পাঁড়েজি, তুমিও ব্রাহ্মণ, আমিও ব্রাহ্মণ — একটা অনুরোধ রাখতে হবে।

পাঁড়েজি দাড়ি চুম্‌‍রিয়ে নিয়ে সেলাম করে বললে, কোমা ভূ পোর্তে ভূ সি ভূ প্লে।

পণ্ডিতমশায় একটু চিন্তা করে বললেন, বড়ো শক্ত প্রশ্ন, সাংখ্যকারিকা মিলিয়ে দেখে কাল জবাব দিয়ে যাব। বিশেষ আজ আমার মুখ অশুদ্ধ, আমি মনুমেণ্ট চেটেছি।

পাঁড়েজি দেশালাই দিয়ে বর্মা চুরুট ধরালো। দু টান টেনে বললে, তা হলে এক্ষুনি খুলুন ওয়েব্‌স্টার ডিক্‌সনারি, দেখুন বিধান কী।

স্মৃতিরত্ন বললেন, তা হলে তো ভাটপাড়ায় যেতে হয়। সে পরে হবে, আপাতত তোমার ঐ পিতলে – বাঁধানো ডাণ্ডাখানা চাই।

পাঁড়ে বললে, কেন, কী করবেন, চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়েছে বুঝি?

স্মৃতিরত্ন বললেন, তুমি খবর পেলে কেমন করে। সে তো পড়েছিল পরশু দিন।

ছুটতে হল উল্টোডিঙিতে যকৃত – বিকৃতির বড়ো ডাক্তার ম্যাকার্টনি সাহেবের কাছে। তিনি নারকেলডাঙা থেকে শাবল আনিয়ে সাফ করে দিলেন।

পাঁড়েজি বললে, তবে ডাণ্ডায় তোমার কী প্রয়োজন।

পণ্ডিতমশায় বললেন, দাঁতন করতে হবে।

পাঁড়েজি বললে, ওঃ, তাই বলো, আমি বলি নাকে কাঠি দিয়ে হাঁচবে বুঝি, তা হলে আবার গঙ্গাজল দিয়ে শোধন করতে হত।

এই পর্যন্ত বলে গুড়্‌গুড়িটা কাছে নিয়ে দু টান টেনে সে বললে, দেখো দাদা, এইরকম তোমার বানিয়ে বলবার ধরন। এ যেন আঙুল দিয়ে না লিখে গণেশের শুঁড় দিয়ে লম্বা চালে বাড়িয়ে লেখা। যেটাকে যেরকম জানি সেটাকে অন্যরকম করে দেওয়া। অত্যন্ত সহজ কাজ। যদি বল লাটসাহেব কলুর ব্যাবসা ধরে বাগবাজারে শুটকি মাছের দোকান খুলেছেন, তবে এমন সস্তা ঠাট্টায় যারা হাসে তাদের হাসির দাম কিসের।

আরো পড়ুন  রাজটিকা--দ্বিতীয় অংশ-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চটেছ বলে বোধ হচ্ছে।

কারণ আছে। আমাকে নিয়ে পুপুদিদিকে সেদিন যাচ্ছে – তাই কতকগুলো বাজে কথা বলেছিলে। নিতান্ত ছেলেমানুষ বলেই দিদি হাঁ করে সব শুনেছিল। কিন্তু, অদ্ভুত কথা যদি বলতেই হয় তবে তার মধ্যে কারিগরি চাই তো।

সেটা ছিল না বুঝি?

না, ছিল না। চুপ করে থাকতুম যদি আমাকে সুদ্ধ না জড়াতে। যদি বলতে, তোমার অতিথিকে তুমি জিরাফের মুড়িঘণ্ট খাইয়েছ, সর্ষেবাঁটা দিয়ে তিমিমাছ – ভাজা আর পোলাওয়ের সঙ্গে পাঁকের থেকে টাটকা ধরে আনা জলহস্তী, আর তার সঙ্গে তালের গুঁড়ির ডাঁটা – চচ্চড়ি, তা হলে আমি বলতুম, ওটা হল স্থূল। ওরকম লেখা সহজ।

আচ্ছা, তুমি হলে কী রকম লিখতে।

বলি, রাগ করবে না? দাদা, তোমার চেয়ে আমার কেরামতি যে বেশি তা নয়, কম বলেই সুবিধে। আমি হলে বলতুম —

তাসমানিয়াতে তাস খেলার নেমন্তন্ন ছিল, যাকে বলে দেখা-বিন্‌‍তি। সেখানে কোজুমাচুকু ছিলেন বাড়ির কর্তা, আর গিন্নির নাম ছিল শ্রীমতী হাঁচিয়েন্দানি কোরঙ্কুনা। তাঁদের বড়ো মেয়ের নাম পাম্‌কুনি দেবী, স্বহস্তে রেঁধেছিলেন কিণ্টিনাবুর মেরিউনাথু, তার গন্ধ যায় সাত পাড়া পেরিয়ে।

গল্পের অষ্টম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!