চিংড়ি দিদি — শামসুন নাহার

এক নদীতে এক চিংড়ি মাছ বাস করত। চিংড়ি মাছটার অভ্যাস ছিল রোজ সকালে গোসল করা। নদীর ধারে বালির উপর একটা বড় পাথর ছিল। গোসল করে সেই পাথরের উপর বসে রোজ চুল শুকাত চিংড়ি মাছ। লম্বা চুল তার। রোজ নদী থেকে উঠেই সেই পাথরের উপর বসে চুলগুলি রোদে মেলে দিত। চুল শুকালে বাড়ি ফিরত।

দিনগুলি তার ভালোই কাটছিল। হঠাৎ তার জীবনে বিপদ ঘনিয়ে এল। একদিন এক কাক তার চুল শুকানো দেখতে পেল। চিংড়ি মাছকে দেখে কাকের খুব ইচ্ছে হলো তাকে খাওয়ার। কাক সরাসরি তার সামনে এসে বলল,

—চিংড়ি, তোকে আমি খাব।

কাকের কথা শুনে চিংড়ি খুব ভয় পেয়ে গেল। কাক তো চিংড়ির চেয়ে অনেক শক্তিশালী! কাকের সঙ্গে শক্তিতে সে পারবে না। কিছু চিন্তা করে চিংড়ি বলল,

—আমার শরীর খুব খারাপ, প্রভু। আমার শরীর একটু ভালো হয়ে নিক, তারপর খাবেন।

কাক বলল,

—কোন দিন খাব বল?

চিংড়ি একটু ভেবে বলল,

—আর দিন সাতেক সময় দিন, পক্ষীরাজ।

কাক নিজেকে পক্ষীকুলের রাজা ভেবে মনে মনে খুশি হলো। বলল,

—মনে রাখবি! কথা ঠিক থাকে যেন।

চিংড়ি বলল,

—হ্যাঁ, হুজুর।

একদিন যায়, দু’দিন যায়, চিংড়ি প্রায় কাকের কথা ভুলতে বসেছে। কিন্তু কাকের মনে আছে! সাত দিন পর কাক এসে হাজির।

—চিংড়ি, আজ তোকে খাব!

চিংড়ি ভয়ে আঁতকে উঠল। কীভাবে যে এত বড় একটা কথা ভুলে গিয়েছিল! মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বলল,

—হুজুর, আমাকে আর কটা দিন সময় দিন। মাত্র তিনটি দিন! আমার আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে শেষ দেখাটা করে আসতে চাই। মিনতি করছি আপনাকে!

কাক কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল,

—আচ্ছা, তুই যখন এত অনুরোধ করছিস, আজকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু মনে রাখিস, তিন দিন পর তোকে আর ছাড়ব না!

কাক মনে মনে ভাবল—জলের জীব জল ছেড়ে যাবে কোথায়?

চিংড়ি ভয় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরল। এখন তাকে এই দুঃসময়ে কে বাঁচাবে? তার আত্মীয়-স্বজন যত চিংড়ি আছে, কেউই কাকের কথা শুনলে তাকে রক্ষা করতে পারবে না।

হঠাৎ তার চ্যাং মাছের কথা মনে পড়ল। চ্যাং তো চিংড়ির চেয়ে বেশ বড়! গায়ের জোরও তার ভালোই আছে। কথাটা ভেবে সে চ্যাং মাছের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

চ্যাং তখন দুপুরের খাওয়া সেরে ফুঁড়ুৎ ফুঁড়ুৎ করে তামাক টানছিল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে চ্যাং চেঁচিয়ে বলল,

—কে রে? এমন অসময়ে ডাকাডাকি করিস?

চিংড়ি করুণ স্বরে বলল,

—দাদা, আমি চিংড়ি। আমার বড় বিপদ!

চ্যাং দরজা খুলে বাইরে এল। বলল,

—কী বিপদ, দিদি?

চিংড়ি তার বিপদের কথা চ্যাং দাদাকে জানাল।

—দাদা, আমি এক দুর্বল চিংড়ি। বলতে গেলে তোমাদের আশ্রয়েই আছি। কাক আমাকে খেয়ে ফেলতে চায়!

চ্যাং সব শুনে ভাবনায় পড়ে গেল। বলল,

—সব ঠিক দিদি, কিন্তু জাতে আমরা মাছ। কাকের কাছে আমরা দুর্বল জাত। কাক ডাঙার জীব, তার শক্তিও বেশি। কীভাবে পারব কাকের সঙ্গে?

চিংড়ি বুঝতে পারল, চ্যাং তাকে সাহায্য করতে পারবে না। তাই চ্যাং-এর বাড়ি থেকে দুঃখিত মনে রওনা দিল।

এখন কার কাছে যাওয়া যায়? হাতে মাত্র তিনটি দিন! এর মধ্যে একটা উপায় বের করতে না পারলে জীবন শেষ!

হঠাৎ তার কোলা ব্যাঙের কথা মনে পড়ল। ব্যাঙ তো ডাঙা আর পানিতে সমানভাবে চলাফেরা করতে পারে! কোলা ব্যাঙের শক্তিও বেশি হতে পারে। তাই সে কোলা ব্যাঙের বাড়ির দিকে রওনা দিল।

কোলা ব্যাঙ তখন ‘হুম-হাম’ করে কাকে যেন হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে এল।

—কি খবর, দিদি? এমন অসময়ে?

চিংড়ি কেঁদে ফেলল।

—দাদা, আমার খুব বিপদ! কাক আমাকে খেতে চায়!

ব্যাঙ বলল,

—দিদি, তোমার বিপদের কথা বলো। যদি কিছু করতে পারি!

চিংড়ি সব কথা বলল। ব্যাঙ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

—আমারও উপায় নাই। তবে তোমাকে একটা পরামর্শ দিতে পারি। জলপাড়ার মাথায় একটা কাঁকড়া থাকে। তার শরীরে যেমন শক্তি, মনেও তেমনি সাহস! সে-ই তোমাকে বাঁচাতে পারবে!

চিংড়ি ব্যাঙকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে কাঁকড়ার বাড়ির দিকে চলল।

কাঁকড়া তখন খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে চেঁচিয়ে উঠল,

—কে রে, এই অসময়?

—দাদা, আমি চিংড়ি! আমার সাত জন্মে আপন বলতে কেউ নাই। বলতে গেলে তোমরাই আমার সব!

চিংড়ির কাতর স্বর শুনে কাঁকড়া দ্রুত বাইরে এল!

—কি খবর? বল দিদি!

চিংড়ি আবার সব কথা বলল। কাঁকড়া শুনে বলল,

—কে তোমার শত্রু, বলো দিদি! যদি পারি, অবশ্যই সাহায্য করব!

চিংড়ি কাঁকড়াকে তার বিপদের কথা জানাল।

—কাল সকাল দশটায় কাক আমাকে খেতে আসবে, দাদা!

কাঁকড়া জানতে চাইল, চিংড়ি কোথায় গোসল করে আর কোন পাথরে চুল শুকায়।

চিংড়ি নদীর ধারে পাথরের কাছে কাঁকড়াকে নিয়ে গিয়ে দেখাল।

কাঁকড়া বলল,

—দিদি, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো! কেমন করে কাক তোমাকে খায় দেখি! কাল ঠিক সকাল দশটায় পাথরে উঠে চুল শুকাবে। বাকিটা আমি দেখব!

পরদিন সকাল দশটায় চিংড়ি গোসল সেরে পাথরের উপর বসল।

কাক নিকটেই একটা গাছে বসে ছিল। চিংড়িকে দেখেই উড়ে এসে পাথরের উপর বসল।

—এখন তোকে খাব! মনে আছে?

চিংড়ি কাতর স্বরে বলল,

—তোমার হাতে যদি মরণ থাকে, তবে খাও!

কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাথরের নিচ থেকে কাঁকড়া বেরিয়ে এল! তারপর তার ধারালো পাঞ্জা দিয়ে কাকের গলা চেপে ধরল!

কাক তখন “গেলাম, মোলাম!” বলে কা-কা করে চিৎকার করতে লাগল!

চিংড়ির আনন্দ তখন দেখে কে!

—চ্যাং দাদা, ব্যাঙ দাদা কেউ কারো নয়! কাঁকড়া দাদা সদর দাদা, টিপ দাদা!

আজ থেকে চিংড়ি দিদির আর ভয় নাই! কাঁকড়া দাদার হাতেই কাকের মৃত্যু হলো!

গুগলু’র পাল্লায় পাঁচু

গজেনবাবুর গয়নাড়ু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *