প্রথম নবী হজরত আদম (আ.) থেকে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসুল রোজা পালন করেছেন। রোজা শুধুমাত্র নবী করিম (সা.)-এর প্রতি ফরজ করা হয়নি, পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের প্রতিও ফরজ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পারো।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত নূহ (আ.) পর্যন্ত চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের ‘আইয়ামে বিজ’-এর রোজা ফরজ ছিল। আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-এর কাছে ঐশীবাণী পাঠালেন, ‘তুমি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখো।’ হজরত আদম (আ.) এ তিনটি রোজা রাখায় তাঁর দেহের রং আবার উজ্জ্বল হলো। এ কারণে এই তিন দিনকে ‘আইয়ামে বিজ’ বলা হয়ে থাকে। (গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০৭)
বেহেশতে হজরত আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং তওবা করেছিলেন, তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তাঁর তওবা কবুল হয়নি। ৩০ দিন পর তওবা কবুল হওয়ার পর তাঁর সন্তানের উপর ৩০টি রোজা ফরজ করা হলো। (ফাতহুল বারী, চতুর্থ খণ্ড, পৃ. ১০২-১০৩) হজরত নূহ (আ.)-কে ‘দ্বিতীয় আদম’ বলা হয়। তাঁর যুগেও সিয়াম পালন করা হয়েছিল। তাফসিরে ইবনে কাসিরে বর্ণিত আছে, হজরত নূহ (আ.)-এর যুগে প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালনের বিধান ছিল। তাফসিরবিদ হজরত কাতাদা (রা.) বলেন, মাসেতিন দিন রোজা রাখার বিধান হজরত নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে শুরু করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর যুগেও সিয়াম পালন করা হয়েছিল। এছাড়া আসমানি কিতাব তাওরাতপ্রাপ্ত নবী হজরত মূসা (আ.)-এর যুগেও রোজার বিধান ছিল। ইহুদিদের ওপর প্রতি শনিবার এবং মহররমের ১০ তারিখে আশুরার দিন রোজা ফরজ ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার সময় ইহুদিদের আশুরার রোজা দেখতে পান। তারা জানান, ‘এটা সেই মহান দিন, যেদিন আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা (আ.) ও তাঁর কাওম (বনি ইসরাঈল)-কে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন।’ এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এদিন সাওম পালন করেন এবং সবাইকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত মূসা (আ.) তুর পাহাড়ে আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাত প্রাপ্তির আগে ৪০ দিন পানাহার ত্যাগ করেছিলেন। ইহুদিরা সাধারণভাবে হজরত মূসা (আ.)-এর অনুসরণে ৪০টি রোজা রাখত। তাওরাতের অন্যান্য রোজার সুস্পষ্ট হুকুমও ছিল।
আসমানি কিতাব জাবুরপ্রাপ্ত নবী হজরত দাউদ (আ.)-এর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হজরত দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং এক দিন বিনা রোজায় থাকতেন।’ অর্থাৎ হজরত দাউদ (আ.) অর্ধেক বছর রোজা রাখতেন এবং অর্ধেক বছর বিনা রোজায় থাকতেন।
আসমানি কিতাব ইঞ্জিলপ্রাপ্ত নবী হজরত ঈসা (আ.)-এর যুগেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত ঈসা (আ.) তাঁর ধর্ম প্রচার শুরুতে ইঞ্জিল পাওয়ার আগে জঙ্গলে ৪০ দিন সিয়াম সাধনা করেছিলেন। একবার তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, ‘অপবিত্র আত্মাকে বের করার জন্য দোয়া ও রোজা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।’ খ্রিস্টানদের জন্য রোজা পালনের বিধান ছিল, যা আত্মশুদ্ধি ও কঠোর সংযম সাধনার মাধ্যম হিসেবে প্রমাণিত।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত লাভের আগে আরবের মুশরিকরাও সিয়ামের প্রচলন করত। যেমন আশুরার দিনে কুরাইশরা রোজা রাখত এবং নবী করিম (সা.) প্রাক-ইসলামি যুগেও রোজা রাখতেন। মদিনায় আগমনের পর তিনি নিজে রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কিরামকেও নির্দেশ দিতেন। পরিশেষে মাহে রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ায় আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হয়ে যায়। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীকরিম (সা.) আমাদের আইয়ামে বিজের রোজা রাখার হুকুম দিতেন। আইয়ামে বিজের দিনগুলো হচ্ছে চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। রাসুলুল্লাহ (সা.) গৃহে অবস্থানকালে বা ভ্রমণরত অবস্থায় কখনো আইয়ামে বিজের রোজা ছাড়তেন না। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তিন দিন রোজা রাখার বিধান ছিল। পরে দ্বিতীয় হিজরি সালে উম্মতে মুহাম্মদির ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ হলে তা রহিত ও ঐচ্ছিক হয়ে যায়।
"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।