হেলুসিনেশন

তলপেটে হাত দিয়ে আরও একবার বমি করলেন আবুল কাওসার সাহেব। ২য়বার বমি করার পর নিজেকে ক্লান্ত লাগছে খুব, আবার প্রচণ্ড পানি পিপাসার মত হচ্ছে, কিন্তু এত রাতে তাকে পানি এনে দেবার মত কেও নেই। সাকোঝির পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ির চারতলায় নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন তিনি। সংসার বলতে সারাঘর ভর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জ্ঞানের বই-পত্র, একটা কম্পিউটার, আর গুদামঘরে আটকে থাকা অনেককিছুর ভিড়ে তিনি নিজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করে যা পান তাতে ভালভাবেই চলে যাবার কথা, কিন্তু ইদানীং সেটাও চলছে না। প্রায় ৩০০০০ টাকার মত পান তিনি। এতগুলো টাকা কিভাবে কিছুদিনের মধ্যে যেন খরচ হয়ে যায়। ৩৫বছর বয়স হয়েছে তার, চাকরির বয়স ও দেখতে দেখতে সাত বছর হয়ে গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক মেধাবী মুখ তার হাত দিয়ে পাশ করে বের হয়ে গেল, অনেকে অনেক ভাল চাকরি ও করছে, কেও কেও সংসার ধর্ম পালন করে নাকি সুখেই আছে, সহকর্মীদের সন্তানগুলো একপা দুপা করে চোখের সামনে কেমন বড় হয়ে যাচ্ছে অথচ এতদিন পরেও বিয়ে করলেননা তিনি।

বিয়ের জন্য এখনও বাড়িথেকে চাপ আসে মাঝে মাঝেই। কিন্তু তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নিঃসঙ্গ জীবন যাপন ই তার পছন্দ, আর কখনও বিয়ে করবেন না তিনি। বিয়ে না করবার পেছনে আরও একটা কারণ অবশ্য আছে। সে ঘটনাও পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। আর সবার মত চাকরি বাকরি করার পর তিনিও বিয়ের পিড়িতে বসতে চেয়েছিলেন। মেয়ে দেখার হিড়িক পড়ল, ভাল সম্বন্ধ এলো, অবশেষে তিনি নিজে ই এক মেয়েকে পছন্দ করে ফেললেন। মেয়েটির নাম জেমি। বিয়ের দিনক্ষণ হল, কেনাকাটা হল, যে কাওসার সাহেব কখনও বাজারে যান না তিনি নিজে সারা মার্কেট ঘুরে বাজার করলেন, শাড়ি, আলতা, স্নো, পাউডার সব কিনলেন, একটা হিরের আংটিও কিনেছিলেন বাসর রাতে জেমিকে দেবেন বলে।

কিন্তু বিয়ের এক সপ্তাহ আগে জেমি তার সাথে দেখা করতে এসে জানাল- অন্য ছেলেকে বহুদিন ধরে ভালবাসছে সে, এখন আর তাকে ছেড়ে অন্য কাওকে বিয়ে করতে পারবেনা মেয়েটি। এমন কথা শোনার পর কাওসার সাহেবের আর জেমি কে বিয়ে করা হয়নি, বরং নিজে দাড়িয়ে থেকে তাদের বিয়ে দিয়েছেন, যা কিছু কিনেছিলেন সব তাদের বিয়েতে উপহার দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বাড়িতে ফিরেছেন। সে রাতে বাড়িতে ফিরে আজকের মত ই বমি করেছিলেন তিনি, এবং তারপর থেকেই অসুস্থ শরীরে নিয়মিত দেখা হয় জেমির সাথে। এ আর কিছুই নয়, হেলুসিনেশন। ড্রয়ারটা হাতড়ে থার্মোমিটারটা খুঁজতে থাকেন কাওসার সাহেব। খুঁজতে খুঁজতেই হঠাৎ ই হাসির শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। : এই, কি খুঁজছেন? কাওসার সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন।

লালচে চোখ নিয়ে তিনি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন : জেমি! : হ্যাঁ। : কেমন আছো? : ভাল আছি, আপনি কেমন আছেন? : জানিনা। : কি খুঁজছেন ওভাবে? থার্মোমিটার? : হ্যাঁ। : ওটা খুঁজে লাভ হবে না। : কেন? : আপনি গতকালই ওটা ভেঙে ফেলেছেন। : ও আচ্ছা। কাওসার সাহেব বিছানার উপর শুয়ে পড়লেন। তিনি চোখটা বন্ধ করে জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলেন। তার হেলুসিনেশন হচ্ছে, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব পড়েছে নিশ্চয়। : আপনার কি খারাপ লাগছে? : হ্যাঁ। : আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই? : না। : কেন? : কারণ তুমি কেও নও, তুমি আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র। কাওসার সাহেব আর কোন কথা বললেন না, চুপ করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলেন। কিন্তু শুয়ে থাকতে ভাল লাগছে না, বরং জেমির সাথে কথা বলতেই ভাল লাগছে। তিনি চোখ খুলে তাকালেন, জেমি চেয়ারের উপর বসে ছোট্ট মেয়েদের মত পা নাচাচ্ছে, তার গায়ে লাল বেনারসির শাড়ি। আরে, এই শাড়িটা ই তো তিনি জেমিকে বিয়েতে দিয়েছিলেন। : ওগো আমায় কেমন লাগছে? : সুন্দর। : শুধুই সুন্দর? : না খুব সুন্দর। : তাহলে শুধু সুন্দর বললে কেন? : সরি। জেমি হেসে ফেলল। জেমির হাসি দেখতে ভাল লাগছে, মেয়েটা তাকে তুমি তুমি করে ডাকছে সেটাও শুনতে ভাল লাগছে কাওসার সাহেবের। : এই শোন? : বল। : তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছো না কেন? কাওসার সাহেব সে প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, চুপ করে রইলেন।

অনেকক্ষণ পর তিনি জেমির দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন : জেমি! : বল। : বল তো সূর্য হতে পৃথিবীতে আলো আসতে কত সময় লাগে? : আট মিনিট বিশ সেকেন্ড। : বল তো বারমুডা ট্রাই-এঙ্গেলের রহস্য উৎঘাটনে সে গ্যাসকে দায়ী মনে করা হচ্ছে সে গ্যাসটির নাম কি? : মিথেন। : তোমাকে করা আমার শেষ প্রশ্ন এটা, বলতো জেমি আইনস্টাইনের জন্মতারিখ কবে? জেমি হাসে কিন্তু কোন কথা বলে না। : বল জেমি, আইনস্টাইনের জন্মতারিখ কবে? : জানিনা। : আমি জানতাম তুমি এটা পারবে না, কারণ এর উত্তরটা আমার নিজের ও জানা নেই, আমি এটাও জানি তুমি আর কেও নও আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা, কিন্তু একটা ব্যাপার কি জান জেমি, তোমার সঙ্গে আমার কথা বলতে ভাল লাগছে। : ও আচ্ছা। কাওসার সাহেব জেমিকে আর কিছু বললেন না, চুপ করে থাকলেন।

রাত তিনটার মত বাজে, কাল সকালে সজিব আলি নামে এক ভদ্রলোকের আসবার কথা আছে। তাদের বাড়িতে কি সব নাকি ঐতিহাসিক জিনিসপত্র আছে, সেই সব তিনি কাওসার সাহেবকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখাতে চান। সজিব আলি চরম বাতিকগ্রস্থ মানুষ। তিনি সহজে কাওসার সাহেবকে ছাড়বেন বলে মনে হয়না, একথা ওকথা দিয়ে তিনি কাওসার সাহেবের সঙ্গে সারাদিন কাটাবেন। কাওসার সাহেবের উচিত এখন কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়া, কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না তার। আচ্ছা জেমিকে বললে সে কি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে? কাওসার সাহেব এ কথা ভেবে নিজেই লজ্জার মত পেলেন। কল্পনা হোক, তবু জেমি অন্যের বউ তো, তাকে নিয়ে এসব ভাবাটাও অন্যায়।

কাওসার সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। জেমি তার ঠিক পাশে ই শুয়ে আছে। মেয়েটি কখন এসে তার পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তা তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি। কাওসার সাহেব অপলক জেমির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগছে কাওসার সাহেবের। ইচ্ছা হচ্ছে সারারাত তাকিয়ে থাকতে। কিন্তু তিনি তা করলেন না, বরং কাথাটা জেমির গায়ে টেনে দিয়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। আজ রাতে ঘুমের চেষ্টা করা বৃথা। তাই তিনি বই নিয়ে বসবার কথা ভাবলেন। বমি করবার আগে তিনি চীরঞ্জীব সেনের বারমুডা ট্রাঙ্গল নামের একখানা বই পড়ছিলেন, বারমুডা নামক দেশটির সমুদ্র উপকূলে কিভাবে জাহাজ, বিমান হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় লেখক এ বইটিতে সেটাই বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। বারমুডা ট্রাঙ্গল বইটি এখনো মেঝেতে পড়ে আছে, বই এর উপর বমির চিন্হ লেগে আছে। বমি লেগে থাকা বইটি খুলবেননা খুলবেননা করেও শেষ পর্যন্ত তিনি বইটি খুললেন। আর ঠিক তখনই জেমি বিছানার উপর থেকে বলে উঠল : ছি: ছি: ছি:, তুমি এতো নোংরা কেন? ফেলে দাও বইটা। নইলে কিন্তু আমি তোমাকে বিছানায় উঠতে দেব না।

জেমির এমন কথায় কাওসার সাহেব ভীষণ লজ্জা পেলেন, তিনি বাম হাত দিয়ে জানালার দিকে বইটি ছুড়ে দিলেন, তারপর বুকের মধ্য থেকে জমে থাকা ছোট্ট একটা নিশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বললেন : জেমি, তুমি সত্যিকারের জেমি নও, কল্পনা, আমার মনের কল্পনা। ঠিক এমন সময় কাওসার সাহেবের মনে নতুন প্রশ্ন এলো, আচ্ছা তিনি নিজে যে জগৎকে বাস্তব বলে ভাবছেন সেটা আসলে কতখানি বাস্তব? এমন ও তো হতে পারে তিনি আসলে বিশাল একটা শুঁয়োপোকা, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি এসব স্বপ্নে দেখছেন। বিজ্ঞান অবশ্য এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিচ্ছেনা। বরং কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলছে পাশাপাশি অনেক জগৎ থাকতেও পারে। আচ্ছা এমন কি কোন জগৎ সত্যি সত্যি থাকতে পারেনা যেখানে জেমি সত্যি ই কাওসার সাহেবের স্ত্রী? সেখানে কাওসার সাহেব অসুস্থ থাকলে জেমি কি করে, অথবা তিনি নিজেই কি করেন? একটা স্বপ্ন অবশ্য তিনি প্রায় দেখেন, জেমি ভীষণ অসুস্থ, তিনি বারবার এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছেন, একবার চারতলা থেকে দৌড়ে নিচে নামছেন আবার উপরে উঠছেন।

কাওসার সাহেবের ভাবতে ভাল লাগে, অসুস্থ জেমির পাশে তিনি বসে আছেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি জেমিকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন। তার আরও ভাবতে ভাল লাগে …… কাওসার সাহেব নতুন করে কিছু ভাববার আগেই কলিং বেলটা চিৎকার করে বেজে উঠে। জেমিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে গভীর রাতের ছায়া অবরোধ কেটে গেছে তিনি বুঝতেই পারেননি। কাওসার সাহেব দরজাটা খুলে দিলেন। সজিব আলী নামের ভদ্রলোক এসেছেন তার সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তাকে ভেতরে নিয়ে আসলেন। বিছানার দিকে তাকালেন কাওসার সাহেব, না জেমি শুয়ে নেই, তিনি পাশের ঘরে একবার উকি দিলেন, জেমি সেখানেও নেই, থাকবার কথাও নয়।

কাঁটা-চামচের কথা

ইস্কুলে ভূত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *