হিমু! এখানে কি?

রাতকে ঘুম আসতেছিলনা। কীভাবে ঘুম যাওয়া যায়, আমার মাথায় ঘুম যাওয়ার যত কৌশল আছে, সব প্রয়োগ করলাম। ভেড়া গোনা শুরু করলাম, কিন্তু ঘুম আসেনা। এক পর্যায়ে দেখি হাজার পাচেক ভেড়া গোনা শেষ, কিন্তু ঘুম এর দেখা নাই। রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের বাসার গেট অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে, তাই বাসা থেকে বের হতে সমস্যা হলোনা। এক বাসার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঐ বাসার দারোয়ান হুইসেল বাজাল, প্রথমে ভয় পেলাম, পরে নিজেকে সামলে নিয়ে তাঁকে বললাম, কী চাচা হুইসেল বাজাচ্ছেন কেন? উনি বলল রাত কটা বাজে। মোবাইল বের করে বললাম, ১ টা। এই রাইতের বেলা কেও বের অয়। লোকটার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে, সে এখানকার স্থানীয় না।

বললাম, বাড়ী কোথায়? বলল, কুমিল্লা। কুমিল্লা কোথায়? সালমানপুর। সালমানপুর তো ছিনিনা। ঐ যে বৌদ্ধ বিহার আছে, ঐহানে। রাস্তায় হাটতেছি তো হাটতেছি। আজ আমি স্বাধীন। কোন বাধা নেই, এই টাইপের কথাবার্তা মনে হতে লাগল। রাস্তায় কেউ নেই, অনেক দূরে একজনকে দেখা যাচ্ছে, সেও হাটতেছে। এখান থেকে তাঁকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছেনা। কাছে যাওয়া উচিত হবে কিনা বুঝতেছিনা। অনেক ক্ষন চিন্তার পর দেখলাম, ঐ ব্যক্তি এদিকেই আসতেছে।

আগ্রাবাদে রাতকে রাস্তায় ভাল মানুষ হাটার কথা না। এটি বানিজ্যিক এলাকা। কিছুক্ষন পর তো আমি তাজ্জব। আরে এ যে হিমু! কি করব বুঝতে পারতেছিনা, দৌড়ে গিয়ে দাড়ালাম হিমুর কাছে। বললাম, ভাই, আমাকে চিনেছেন। বলল, হ্যা চিনেছি। কিভাবে ছিনলেন, আপনিতো ঢাকার বাসিন্দা, এখানে কী করে এসেছেন? এতো প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দেবো কিভাবে? একটা একটা করে প্রশ্ন কর।

বললাম, আমাকে চিনলেন কীভাবে? না চেনার কি আছে, তোমার দুটি হাত আছে, পাও দেখি আছে দু’টো। তাই আমি ধরেই নিয়েছি, তুমি মানব সম্প্রদায়ভুক্ত প্রাণী, এতে কোন সন্দেহ নাই। এটাই আপনার চেনা! হিমু ভাইয়ের সাথে তর্কে গেলাম না। উনি চিটাগাং এসেছেন, উনার সাথে তর্কে যাওয়াই অভদ্রতা। হিমু ভাই হাটতে শুরু করেছে, আমিও উনার পিছু নিলাম।

হিমু ভাই একবার আমার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন, এরপর আবারো হাটা শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? উত্তর দিলাম, আপনার সাথে। আমিতো কমার্স কলেজ হয়ে কদমতলা যাবো। এরপর? এরপর কদমতলা হয়ে টাইগার পাস। টাইগারপাসই কি আপনার গন্তব্য স্থল? না। টাইগার পাসে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খাবো, এরপর যাবো জিইসি মোড়। আপনি কী হেটেই যাবেন? এতো রাতে গাড়ী পাবো কই?

ও, আচ্ছা। মুখে ও, আচ্ছা বললেও মনে মনে ভয় পেলাম, জিইসি মোড় যেতে যেতে তো সকাল হয়ে যাবে, আর পা ফুলে যে দু ইঞ্চি মোটা হবে তা নিশ্চিত! হিমু ভাই হাটতেছেন। আমিও তার পাশে পাশে। হিমু ভাই, আপনি কার বাসায় উঠেছেন? মাজেদা খালার বাসায়। মাজেদা খালার চট্টগ্রামও বাড়ী আছে নাকি? বাড়ী না বাড়ী গুলো বলো। কেন, কয়টা বাড়ী আছে। গোটা পাচেক। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এই প্রথম কার কাছে শুনলাম, চট্টগ্রামে কারো পাচটা বাড়ী আছে।

হিমু ভাই হঠাত দাঁড়িয়ে গেলেন। আমিও। তিনি আকাশের দিকে মিনিট তিনেক তাকিয়ে রইলেন। আর কি যেন গুনতেছিলেন। সৃষ্টি কর্তাই ভালো জানে তিনি কী গুনতেছিলেন। তারা গোনার মতো বোকা তিনি না। তিনি হয়তোবা দুটি তারার মাঝের পার্থক্য নির্ণয় করতেছিলেন। যাই হোক, হিমু ভাইকে কি গুনতেছিলেন, সে ব্যপারে কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না। হিমুদের সব প্রশ্ন করা যায়না।

কিছুক্ষন পরে হিমু ভাই মোবাইল চাইলেন। মোবাইল দিলাম, হিমু ভাই কার নাম্বার তুলে ডায়াল করলেন। এরপর কি যেন বলতেছিলেন। কথার মধ্যেই বুঝে গেলাম রুপার সাথে কথপোকথন হচ্ছে। হিমু ভাই আমাকে মোবাইল দিলেন, বললেন রুপা তোমার সাথে কথা বলতে চাইছে। রুপার সাথে কথা বললাম। যখন বললাম, আমিও হিমু হতে চাই, তখনি রেখে দিল! বোধ হয় রুপা চায়না, পৃথিবীতে একাধিক হিমু থাকুক।

অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই টাইগারপাস এসে পড়লাম। টাইগার পাসের ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আমি আর হিমু ভাই। হিমু ভাই তাকিয়ে আছে সোজা পশ্চিমে, আমি তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। মনে হচ্ছে, তারা গুলো আমাদের দেখছে। হাটতে হাটতে আমি ক্লান্ত, হিমু ভাইয়ের ক্লান্তি দেখা গেলোনা। উনি সিগারেট বের করলেন, আমার দিকেও একটা বাড়িয়ে দিলেন। বললাম, ভাই আমিতো সিগারেট খাইনা। বলল কি খাও? বললাম চা খাই।

হিমু ভাই সিগারেট ফেলে দিলেন, বুঝলাম উনিও চা খাবেন। কিন্তু চা তো নাই, অনেক খোজাখুজি করার পরও কোন চা বিক্রেতার খোজ পেলামনা। হাটা ধরলাম জিইসি মোড়ের উদ্দেশ্যে, দুপাশে পাহাড়, মাঝখানে রাস্তা, টাইগার পাস থেকে জামালখান পর্যন্ত এই রোডটা আমার অনেক পছন্দের। হিমু ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, হিমু ভাই, চিটাগাং দেখছেন কেমন। চিটাগাং দেখতে তো আসিনি।

তাহলে কি জন্যে এসেছেন। মাজেদা খালা আমার বিয়ে ঠিক করছে, মেয়ে এখানেই থাকে। আপনি বিয়ে করছেন! রুপার কি হবে? হিমু ভাই আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল। সেই মায়াবী হাসি মোনালিসার হাসির চেয়েও রহস্যময়। এক সময় হাটতে হাটতে জিইসি মোড় পৌছে গেলাম। ঐখানে গিয়ে একজন চা বিক্রেতাকে পেলাম। হিমু ভাই দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিয়েছেন। আমি চা খেলাম না। রাত চারটার চা বিক্রেতার ওপর আমার আস্থা নেই।

হিমু ভাই চা’য়ে চুমুক দিচ্ছেন, জিজ্ঞেস করলাম, হিমু ভাই, কখনো বিয়ে করবেন না? উনি তার সেই উদ্ভট হাসিটি দিল, বলল, ‘হিমুরা কখনো কারো হাত ধরেনা’। জিইসি মোড় থেকে পুনরায় হাটা দিলাম আগ্রাবাদের উদ্দেশ্যে। হিমু ভাই আমার সামনে সামনে হাটতেছিলেন, আমি তার পিছু পিছু। এক সময় হিমু ভাই আমার অনেক দূর সামনে চলে যান।

আমার হাটার গতি স্লথ হয়ে এল। দূর থেকে শুধু দেখলাম, একজন হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা লোক হেঁটে চলে যাচ্ছে পিচ ঢালা পাকা রাস্তায়। তার পা’দুটো খালি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আমার, রাস্তায় বসে পড়লাম, চোখের পাতা বন্ধ। হিমু ভাইয়ের একটা কথা মনে পড়ল, “জগতের রুপ দেখতে হয় চোখ বুঝে”।

ভয়ানক ভূতের গল্প

বাংলা ক্যালেন্ডারের জানা অজানা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *