হাশরের ময়দানে শাফায়াত ও আমল অনুযায়ী নূরের বন্টন-২

অভিশাপকারীরা শাফাআতের মর্যাদা লাভ থেকে মাহরূম হবে
হযরত আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, লানত (অভিশাপ) দেওয়ায় অভ্যস্ত লোকেরা কেয়ামতের দিন সাক্ষীও হবেনা এবং শাফাআতকারীও হবে না। এ বদ অভ্যাসের কারণে তাদের সাক্ষ্য দান এবং শাফাআত করার অধিকার দেয়া হবেনা, অথচ তা বড় সৌভাগ্য এবং ইজ্জতের বিষয়। [মুসলিম]
মুজাহিদের শাফাআত
তিরমিযী শরীফের এক দীর্ঘ বর্ণনায় আছে, হযরত মেকদাদ বিন মা’দিকারাব রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. মুজাহিদদের ফযীলত ও মর্যাদা বর্ণনায় এরশাদ করেন, সত্তর জন আত্মীয়ের ব্যাপারে তার শাফাআত কবুল করা হবে। [মেশকাত]
পিতা-মাতার জন্য নাবালেগ বাচ্চাদের সুপারিশ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তিন বাচ্চা (নিজের পূর্বে আখেরাতে) পাঠিয়ে দেয়, যারা তখনও বালেগ হয়নি, সেই বাচ্চা তাকে (পুরুষ হোক বা মহিলা) জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য কঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে। একথা শুনে হযরত আবু যার রা. বলেন, আমি তো মাত্র দুই বাচ্চাকে আগে পাঠিয়েছি (তা আমার ব্যাপারে কি বলেন), হুজুর সা. এরশাদ করেন, দুজনের ব্যাপারেও একই কথা। হযরত উবাই ইবনে কাব রা. আরজ করলেন, আমি তো এক বাচ্চা আগে পাঠিয়েছি? হুজুর সা. এরশাদ করেন, একজনের ব্যাপারেও একই কথা। [মেশকা শরীফ]
বাচ্চা আগে পাঠানোর মর্ম হল, পিতা-মাতা উভয়ের জীবদ্দশায় অথবা একজনের জীবদ্দশায় তাদের (নাবালেগ) বাচ্চা মারা গেলে বাবা-মা খুবই শোকাতুর হয়ে পড়েন। মহান আল্লাহ পাক তাদের আনন্দের জন্য এ ব্যবস্থা করেছেন। এমন কি কোন বাচ্চা যদি পূর্ণাঙ্গ না হয়েই গর্ভপাত হয়, তাহলে সেও তার মাতা-পিতাকে বাঁচানোর জন্য জোর চেষ্টা করবে। যেমন আলী রা. বর্ণনা করেন, হুজুর সা. এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই অর্ধাঙ্গ বাচ্চাও সে সময় স্বীয় রবের নিকট জোরালোভাবে তার পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে, যখন তার মাতা-পিতাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে। সেই অর্ধাঙ্গ বাচ্চার জোরালো সুপারিশের কারণে তাকে বলা হবে, হে অর্ধাঙ্গ বাচ্চা, যে তার পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করেছ, সে তার পিতা-মাতাকে জান্নাতে প্রবেশ  করাও। এরপর সে তার আঁতুরি দ্বারা পেঁচিয়ে তার পিতা-মাতা উভয়কে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিবে। [ইবনে মাজাহ]
হাফেযে কুরআনের শাফাআত
হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যে কুরআন পড়েছে, ভালোভাবে মুখস্থ করেছে, কুরআন শরীফ যে সমস্ত জিনিস এবং কাজ হালাল বলেছে, সে সমস্ত বিষয় (কাজে এবং বিশ্বাসে) হালাল রেখেছে। আর যে সমস্ত জিনিস এবং কাজ হারাম করেছে, সে সমস্ত বিষয় (কাজে এবং বিশ্বাসে) হারাম রেখেছে, তাকে আল্লাহ পাক জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর তার পরিবারের এমন দশ জনের জন্য তার সুপারিশ কবুল করা হবে, যাদের জাহান্নামে যাওয়া অবধারিত হয়ে গেছে। [তিরমিযী শরীফ]
কুরআন করীমের হাফেয দশ ব্যক্তির জন্য নিজের সুপারিশ কবুল করতে পারবেন, যেমন এ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
এ হাদীসে বলা হয়েছে, পরিবারের দশ ব্যক্তির জন্য হাফেযে কুরআনের সুপারিশ কবুল করা হবে। তবে হাদীসে একথাও বলা হয়েছে, সে হাফেয কুরআন কারীমের আহকামের উপর আমল করতে হবে, কুরআন কারীমের দাবী অনুযায়ী চলতে হবে। কুরআন কারীম যেসব বিষয় হালাল এবং হারাম করেছে সেসব মেনে চলতে হবে, যে ব্যক্তি কুরআন করীমের দাবী অনুযায়ী চলবে না, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে, তাহলে কুরআন কারীম তার বিরুদ্ধে বাদী হয়ে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে। লোকেরা গুনাহের পর গুনাহ করতে থাকে, নেক কাজ থেকে বিমুখ থাকে, তাকে যদি কেউ নেক কাজের নসীহত করে তখন সে নসীহতকারীকে বলে, আরে আমার ছেলে হাফেয বা আমার ভাতিজা হাফেয, আমার অমুক নিকটাত্মীয় হাফেয, সে আমাকে বাঁচিয়ে নিবে। অথচ সে এটা দেখে না, সে হাফেয কুরআন অনুযায়ী আমল করছে কি না। আজকাল নেক আমলকারী কয়জন আছে। অন্যের আশায় নিজে গুনাহে লিপ্ত হওয়া বড়ই মূর্খতার কাজ। হ্যাঁ, যদি নেক আমল করে তার সাথে সাথে কুরআন অনুযায়ী আমল করতে থাকে তাহলে সে আত্মীয়ের শাফাআত আশা করা যেতে পারে।
রোযা এবং কুরআন শরীফের শাফাআত
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, রোযা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা আরজ করবে, হে রব, আমি তাকে দিনে পানাহার এবং খাহেশাত (কামনা-বাসনা) থেকে ফিরিয়ে রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার শাফাআত কবুল করুন। কুরআন শরীফ আরজ করবে, হে রব! আমি তাকে রাতের বেলায় শোয়া থেকে বিরত রেখেছি (সে রাতে আমায় তেলাওয়াত করত), অতএব তার ব্যাপারে আমার শাফাআত কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, অবশেষে উভয়ের শাফাআত কবুল করা হবে। [মেশকাত শরীফ]
হযরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কুরআন কারীম তেলাওয়াত কর। কেননা কেয়ামতের দিন কুরআন তার তেলাওয়াত কারী লোকদের জন্য শাফাআতকারী হিসাবে আগমন করবে।
(অতঃপর এরশাদ করেন,) দু’টি সূরা- সূরা বাকারা, সূরা আলে ইমরান পড়, যা খুবই উজ্জ্বল। কেয়ামতের দিন এ দু’টি সূরা মেঘখণ্ড হয়ে ছায়া দিবে অথবা দুটি পাখির ঝাঁক হয়ে তার পাঠকদের জন্য জোরালো সুপারিশ করবে।
তাজাল্লী, পুলসিরাত, নূরের বণ্টন, কাফের মুশরিক এবং মোনাফেকদের সীমাহীন মসিবত
কেয়ামতের দিন ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দিন, সে দিন সকলে নিজ চক্ষু দ্বারা নিজের আমল দেখতে পাবে এবং নিজের আমলের ওজন দেখেই জান্নাত বা জাহান্নামে যাবে। কেউ একথা বলতে পারবে না, আমার উপর জুলুম করা হয়েছে, আমি বিনা কারণে জাহান্নামে যাচ্ছি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈমান এবং আমলে সালেহ সম্পাদনকারীদের পুরষ্কৃত করার জন্য জান্নাত এবং বেঈমান বদ আমলকারীদের শাস্তি দেয়ার জন্য জাহান্নাম তৈরি করেছেন। নিজ নিজ আমল এবং কর্মের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে জান্নাত বা জাহান্নাম যেখানে যাওয়ার সেখানে যাবে।
জান্নাতে যাওয়ার জন্য জাহান্নামের উপর দিয়ে রাস্তা হবে। হাদীসে সিরাত বলা হয়েছে, যা আমাদের পরিভাষায় ব্যাপকভাবে পুলসেরাত হিসাবে পরিচিত। যারা আল্লাহকে ভয় পান এমন মোমিনগণ নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী সহী সালামতে পুলসেরাত পার হয়ে যাবেন। আর বদ আমলকারী তা অতিক্রম করতে পারবে না। জাহান্নামের ভিতর থেকে বের হওয়া বড় বড় আঁকড়া গুনাহগারদের জাহান্নামে ফেলে দিবে। এই টানা হেঁচড়ার মধ্যে অনেক মুসলমান (গুনাহগার) পার হয়ে যাবে। আর মুসলমানদের যারা জাহান্নামে যাওয়ার ফয়সালা হয়েছে ওই আঁকড়া তাদের টেনে জাহান্নামে ফেলে দিবে এবং নিজ  নিজ বদ আমল অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করার পর আম্বিয়ায়ে কেরাম আ., ফেরেশতা এবং সালেহীনের সুপারিশে মহান আল্লাহ পাকের রহমতে তাদের জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। যারা একান্ত বিশ্বাসের সাথে কালেমা পড়েছিল, তারা ব্যতীত সকল কাফের, মুশরিক, মোনাফেক জাহান্নামেই থেকে যাবে।
নূরের বণ্টন
পুলসিরাত অতিক্রম করার পূর্বে নূর বণ্টন হবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, আমল অনুযায়ী নূরের বণ্টন হবে, (যার আলোতে) পুলসিরাত অতিক্রম হবে (এ নূর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে জান্নাতের রাস্তা দেখানোর জন্য হবে)। কারো কারো নূর হবে পাহাড় পরিমাণ। আবার কারো কারো নূর হবে খেজুর গাছের পরিমাণ, কারো কারো নূর শুধুমাত্র তার হাতের আংটিরমত (নিভু নিভু চেরাগেরমত) কিছু রাস্তা আলোকিত করবে এবং কিছু রাস্তায় নিভে যাবে, আবার আলোকিত হবে। [তাফসীরে দুররে মানসূর]
সূরা হাদীদে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-যে দিন আপনি মোমিন পুরুষ এবং মহিলাদের দেখবেন, তাদের নূর তাদের আগে আগে চলছে এবং তাদের ডান দিকে ছুটছে (ফেরেশতারা তাদের বলবে), আজ তোমাদের জন্য শুভ সংবাদ এমন বাগানের, যার নিচে প্রবাহিত থাকবে নহর, তারা তাথায় চিরকাল থাকবে, এ হল মহাসাফল্য।’ [সূরা হাদীদ : ১২]
নূর পাওয়ার পর মোমিন মোমিনাত পুলসিরাত পার হতে শুরু করবে। তাদের নূরের আলোতে মোনাফেক পুরুষ-মহিলারাও পিছনে পিছনে ছুটতে থাকবে, কিন্তু যখন মোমিন পুরুষ-মহিলারা সামনে অগ্রসর হয়ে যাবে আর মুনাফিক পুরুষ-মহিলারা পিছনে থেকে যাব, তখন তারা ঈমানদারদের চিৎকার করে বলবে, একটু দাঁড়াও, একটু অপেক্ষা কর, তোমাদের আলোতে আমরাও আসছি, আমরাও উপকৃত হচ্ছি। আমরা তোমাদের সাথে সামনে অগ্রসর হব। ঈমানদারগণ জওয়াব দিবে, এখানে নিজের নূর নিজেরই কাজে আসবে, অন্যের নূর কাজে আসবে না। এখানকার আইন এটাই। তোমরা ফিরে যাও। যেখানে নূর বন্টন হচ্ছে সেখানে গিয়ে নূরের ভাগ নাও। সুতরাং মুনাফিক নর-নারীরা সেখানে দৌড়ে যাবে, কিন্তু সেখানে গিয়ে কিছুই পাবে না। তারা আবার মোমিনদের পিছু নেয়ার জন্য দৌড়াবে, কিন্তু তাদের পাবে না। তাদের মাঝে বিশাল দূরত্ব সৃষ্টি হবে। মাঝে একটি দেয়াল সৃষ্টি হবে যার ভিতরে থাকবে মুসলমানগণ। সেখানে রহমত প্রবাহিত হবে আর বাইরে আযাব হতে থাকবে।
কুরআনুল কারীমে এরশাদ হয়েছে- ‘যেদিন মোনাফিক নর-নারীরা মোমিনদের বলবে, আমাদের জন্য অপেক্ষা কর যাতে আমরাও তোমাদের নূর থেকে আলো পেতে পারি, তারা বলবে, তোমরা পিছনে ফিরে যাও এবং সেখানে নূর সন্ধান কর। তারপর দুই দলের মাঝে একটি দেয়াল হবে যাতে একটি দরজাও থাকবে। তার ভেতরের দিকে রহমত এবং বাইরের দিকে থাকবে আযাব।
এ মহা মসীবতের সময় মোনাফেকরা বাঁচার কোন পথ পাবে না। তাই তারা মোমিনদের সহযোগিতার জন্য এই যুক্তি দিবে, আমরা দুনিয়াতে তোমাদের সাথে ছিলাম। তোমাদের সাথে নামায পড়েছি, রোযা রেখেছি, এখন তোমরা সেই হক আদায় কর। কুরআন কারীমে এরশাদ হয়েছে- মোনাফেকরা মোমিনদের ডেকে বলবে। আমরা কি তোমাদের সাথী ছিলাম না!
মুসলমানরা জওয়াব দিবে- হ্যাঁ, একথা ঠিক (তোমরা দুনিয়াতে আমাদের সাথে ছিলে), কিন্তু তোমরা (কেবল হীন রাজনৈতিক উদ্দেশে কৌশলগত কারণে) আমাদের সাথে ছিলে, আন্তরিকভাবে ছিলে না। তোমরা নিজেদের জীবন (মোনাফেকীর) ফেতনায় ফেলে ধ্বংস করে ফেলেছ এবং অপেক্ষায় ছিলে (দেখা যাক মুহাম্মাদ ও তার সাথীরা কবে খতম হবে) এবং তোমরা ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলে, আর নিরর্থক আকাক্সক্ষা তোমাদের ধোঁকায় ফেলে রেখেছিল। এমনি করে শেষে তোমাদের নিকট আল্লাহর হুকুম (মুত্যু) উপস্থিত হয়েছে। এবং তোমাদের প্রতারক (শয়তান) আল্লাহর ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে রেখেছিল।
আল্লাহ এরশাদ করেন- আজ তোমাদের থেকে কোন বিনিময় গ্রহণ করা হবে না। তোমরা ব্যতীত অন্যদের থেকেও নয়, যারা প্রকাশ্য কুফরী করেছিল। সকলের ঠিকানাই হবে জাহান্নাম। তা বড়ই নিকৃষ্ট ঠিকানা।

আরো পড়ুন  শহীদের শেষ চিঠি

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

দুঃখিত!