হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) -এর ১৭ পর্ব

হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) -এর ১৬ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

তায়াম্মুমের আয়াত নাজিলের ঘটনা

আল্লাহ পাক হযরত আয়েশাকে (রাঃ) উপলক্ষ করে মানবজাতিকে বহুবিধ কল্যাণ প্রদর্শন করেছেন। ‘ইফক’কে কেন্দ্র করে মানব সমাজকে যৌনাচার ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র রাখার জন্য অনেকগুলি বিধি-বিধান ও দণ্ডবিধি ঘোষণার পাশাপাশি, পবিত্র হওয়ার জন্য পানির বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুমের সুযোগও হযরত আয়েশাকে (রাঃ) কেন্দ্র করে দান করেছেন। এখানে এ সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

একবার আর এক সফরে হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গে ছিলেন। ইবন সা‘দ-এর মতে, এটিও ‘আল-মুরাইসী’ যুদ্ধ-সফরের ঘটনা। সেই একই হার এবারও তাঁর গলায় ছিল। কাফেলা যখন ‘জাতুল জাইশ’ অথবা ‘আল-বায়দা’ নামক স্থানে পৌঁছল, তখন হারটি গলা থেকে ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেল। পূর্বের ঘটনার কারণে তিনি যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, তাই সাথে সাথেই বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) অবহিত করলেন। সময়টি প্রভাত হওয়ার কাছাকাছি।

রাসূল (সাঃ) যাত্রাবিরতির নির্দেশিত স্থানে যখন সৈন্যরা তাঁবু গেঁড়েছিল, সেখানে এক বিন্দুমাত্র পানি ছিল না। এদিকে ফজরের নামাযের সময় হয়ে গেল। লোকেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হযরত আবু বকের (রাঃ) নিকট ছুটে গিয়ে বলল,
“আয়েশা (রাঃ) সৈন্যবাহিনীকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।”

হযরত আবু বকর (রাঃ) তখন সোজা হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে দৌড়ে গেলেন। দেখলেন, রাসূল (সাঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) হাঁটুর উপর মাথা রেখে কিছুটা আরাম করছেন। আবু বকর (রাঃ) উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
“তুমি সব সময় মানুষের জন্য নতুন নতুন মুসিবত ডেকে আন।”

এ কথা বলে তিনি রাগে-ক্ষোভে মেয়ের পাঁজব কয়েকটি খোঁচা মারলেন। কিন্তু হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আরামের ব্যাঘাত হবে ভেবে একটুও নড়লেন না।

এদিকে সকাল হলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘুম থেকে জেগে সবকিছু অবগত হলেন। ইসলামী বিধি-বিধানের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—সর্বদা তা উপযুক্ত সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে। ইসলামের পূর্বে নামাজের জন্য ওযু ফরজ ছিল। কিন্তু এই ঘটনার সময় পানি না পাওয়া গেলে কি করতে হবে, সে বিষয়ে করণীয় নির্দেশনা হিসেবে নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল হলো।

আরবি আয়াত:
وَإِن كُنتُمْ مَرْضَىٰ أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنكُم مِّنَ ٱلْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ ٱلنِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا۟ مَآءً فَٱتَّمِسُوا۟ وَجْهَكُمْ وَأَيْدِيكُمْ بِطِينٍۢ طَيِّبٍۢۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا (আন-নিসা: ৪৩)

মূলত, তায়াম্মুমের হুকুম একটি বিশেষ পুরষ্কার, যা এ উম্মাতেরই বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তা‘আলার কতই না অনুগ্রহ, যে তিনি ওযু, গোসল প্রভৃতি পবিত্রতার জন্য এমন এক বস্তুকে পানির বিকল্প হিসেবে প্রদান করেছেন, যার প্রাপ্তি পানি থেকে সহজ। আর এই সহজ ব্যবস্থাটি পূর্ণবর্তী কোনো উম্মাতকে দেওয়া হয়নি; একমাত্র উম্মাতে মুহাম্মদী-কেই এটি প্রদান করা হয়েছে।

যা হোক, মুসলিম মুজাহিদদের আবেগ-উত্তেজনায়, যারা তখন পানি না পাওয়ার কারণে নিজেদের বিপদগ্রস্ত মনে করছিল, তারা আল্লাহর এ রহমত লাভে ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। হযরত উসাইদ ইবন হুদাইর—যিনি একজন বড় মাপের সাহাবী ছিলেন—আবেগভরে বললেন:
“ওহে আবু বকর সিদ্দীকের পরিবারবর্গ! ইসলামের এটাই আপনাদের প্রথম কন্যাণ নয়।”

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত উসাইদ ইবন হুদাইর হযরত আয়েশাকে (রাঃ) লক্ষ্য করে বলেন:
“আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন! আপনার উপর যখনই কোনো বিপদ এসেছে—যা আপনি পছন্দ করেননি—তখনই আল্লাহ তার মাধ্যমে আপনার এবং মুসলমানদের জন্য কোনো না কোনো কল্যাণ প্রদান করেছেন।”

হযরত সিদ্দীকে আকবর (রাঃ), যিনি কিছুক্ষণ আগেই প্রিয়তমা কন্যাকে শিক্ষাদানের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলেন, গর্বের সঙ্গে এখন সেই কন্যাকে সম্বোধন করে বললেন:
“আমার কলিজার টুকরা! আমি জানতাম না যে তুমি এতখানি কল্যাণময়ী। তোমার অসীলায় আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম উম্মাহকে এতখানি বরকত ও সহজতা দান করেছেন।”

উল্লেখ্য, হযরত আয়েশা (রাঃ) এই হারটি তাঁর বোন আসমার (রাঃ)-এর নিকট থেকে পরার জন্য ধার নিয়েছিলেন। এরপর কাফেলা চলার জন্য যখন হযরত আয়েশার (রাঃ) উটটি উঠানো হয়, তখন সেই উটের নিচে হারটি পাওয়া যায়।

হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রাঃ) -এর ১৮ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!