শ্যামা’র ইতিকথা

তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে মশারীর একটি কোণা হাত লেগে ছিঁড়ে গেলো । মা দেখলে নির্ঘাত চেঁচাবে ! ‘এতো বড় হয়েছো অথচ কাজ করো বাচ্চাদের মত । মশারীর সঙ্গে কি যুদ্ধ করেছিলে ? মশারীর সাথে যে যুদ্ধ করা যায় সেটির প্রমাণ আজ তুমি রাখলে’ ! নাহ্ অসহ্য । মা দেখার আগেই যে করে হোক পালাতে হবে । সামনে পড়লে আজ রক্ষে নেই ! দেরী হয়ে যাবে । ওদিকে শ্যামা বেচারী একা একা ক্যাম্পাসে অপেক্ষা করবে । আজ বলতেই হবে কথাটি । যে করেই হোক । আর ভাবতে পারে না নিনাদ । বাইরে বেড়িয়েই মনসুর আলীর দোকানের ছেলেটাকে ইশারায় ডাকে নিনাদ । ‘একটা সিগ্রেট নিয়ে আয় । খোলা ম্যাচটা আনিস’ । সিগারেট ধরিয়ে রিকশায় চাপে নিনাদ । ‘মামু একটু টাইনা যাও, তোমার মামী কলেজে একলা দাড়ায়ে আছে’ । সেলফোনটি আলগোছে বের করে সে । ‘হ্যালো- শ্যামা, তুমি বোর হচ্ছনা তো ? এইতো আরেকটু । ম্যাক্সিমাম দশ মিনিট, আমি চলে আসছি ।

প্লিজ রাগ করো না’ । শ্যামা’কে আজ বলতেই হবে । যে করেই হোক । এভাবে দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হবে । শেষে পরিণতি ভয়ঙ্কর হতে পারে । আনমনে ভাবে নিনাদ । কলেজের গেটে পৌঁছে রিকশা বিদায় করে দেয় নিনাদ । গেট টপকে ভিতরে ঢুকে এদিক সেদিক তাঁকায় । হটাৎ করেই ওর মুখ উজ্জল হয়ে যায় । কলেজ লাগোয়া দিঘীর ধারের মস্ত কদম গাছের নিচে একা দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা । ওর দৃষ্টি দিঘীর দিকে । একহারা গড়নের উজ্জল শ্যামবর্ণা শ্যামা ! গায়ের রঙ্গের সাথে ওর নামের মিল আছে । একবার জিজ্ঞেস করেছিল নিনাদ, ‘তোমার এমন নাম কে রেখেছিল বলো তো’ ? মিষ্টি হেসে শ্যামা উত্তর দিয়েছিল, ‘আমার ঠাকুমা’ । শ্যামা জাতিগত ভাবে হিন্দু । ব্রাম্মণ । ‘তুমি কি কোনো কারণে রাগ করেছো শ্যামা’ ? নিনাদ প্রশ্ন করে । – নাহ্ । রাগ করার মত কিছু তো ঘটেনি ! এই প্রশ্ন কেনো করছো ? – না, আসলে তোমার মুখটি কেমন যেন ভার ভার লাগছে ! তবে কি মন খারাপ ? – না, আমার মন খারাপ নয় । মন ভাল আছে ।

কিন্তু একটি ব্যাপার বুঝতে পারছি না ঠিক । খটকা লাগছে । কি অমন জরুরী কথা বলবে যে আজ বন্ধের দিন আমাকে তুমি অনেকটা ফোর্স করেছো আসতে ? নিনাদ এর মুখটি মূহুর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে যায় । ও ইতস্তত বোধ করতে থাকে । কিভাবে শুরু করবে সেটি ভাবতে থাকে । ‘আছে, জরুরী একটি কথা বলার আছে তোমাকে’ । – ও আচ্ছা । ঠিক আছে বলো । আমাকে একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে । ঠাকুমার শরীরটা ভাল নয় । – হুম । তুমি কি কিছু খাবে ? নিয়ে আসব বাইরে থেকে ? – না না ! এখন আমি কিছুই খাবোনা । তুমি বলো কেন আসতে বলেছো । এই কদম গাছটির তলাতেই ওদের দু’জনার প্রথম পরিচয় । ক্লাস বিরতির এক ফাঁকে ফাহাদ এখানে নিয়ে এসেছিলো নিনাদ কে ।

উর্মি, শ্যামা, রঞ্জু, রোজেন বসে গল্প করছিলো । রোজেন শ্যামাকে পরিচয় করিয়ে দেয় নিনাদের সঙ্গে । সেই শুরু । এরপর কিভাবে যে কি হয়ে গেছে তা ওদের দু’জনের কেউই বলতে পারবে না । কতদিন সদর হাসপাতালের রোড ধরে বেখেয়ালে গল্প করতে করতে একসাথে হেঁটে গেছে দু’জন ! কখনও চিতাখোলা রোডে আবার কখনও ছায়াবিথী আবাসিক এলাকার শেষমাথায় কৃষ্ণচুঁড়া আর রাধাচুঁড়া’র যে প্রকান্ড দু’টি গাছ আছে, তাদের মাঝখানের গুঁড়িতে বসে কত দুপুর পাড়ি দিয়েছে ওরা তার হিসেব কেউ রাখেনি । ওরা তো নয়ই ! শুধু হঠাৎ করে ধেয়ে আসা বাসন্তি বাতাস সে সময়ের ঘ্রাণটুকু হয়তো উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে জমা করে রেখে দিয়েছে ! পলকে ভাবে এসব নিনাদ । ওর মনটি বিষন্ন হয়ে যায় । – শ্যামা ? – হুম । – আমাকে ভুল বুঝনা প্লিজ । – এ কথা কেনো বলছ ? চুপ করে থাকে নিনাদ । ভিতরে বয়ে যাওয়া ঝড়টিকে আপ্রাণ চেষ্টা করে থামাতে । ‘বলছি’ । –

তোমাকে এমন লাগছে কেনো দেখতে ? মনে হচ্ছে ভিষন ক্লান্ত ! – না, আমি ঠিক আছি । শোন, আমার মনে হয় আমাদের সম্পর্কটার এখানেই ইতি টানা উচিৎ । আমি অনেক ভেবে দেখেছি । – মানে ? শ্যামা সোজা হয়ে বসে । কি বলছো তুমি ? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ! – আমাদের রিলেশনটি ক্যারী করা আর ঠিক হবে না । অনেক বাঁধা আসবে চতুর্দিক থেকে । আমার মা একটু অন্য ধরণের । উনি কিছুতেই আমাদের রিলেশন মেনে নেবেন না । আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি । অবাক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকে শ্যামা । এমন কথা শোনার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল না শ্যামা । মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে । পুরো পৃথিবীটা যেন দুলছে ওর চোখের সামনে । পাথড়ের মূর্তির মত নিথর বসে থাকে শ্যামা । কিছু বলে না । শুধু চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝড়তে থাকে ওর ।

নিনাদ আবারও বলে, ‘তুমি কিছু বলছ না যে’ ? ব্যাগটি হাতে নিয়ে আস্তে করে দাঁড়ায় শ্যামা । ‘আচ্ছা চলি । তুমি ভালো থেকো নিনাদ । খুব ভাল’ । অবাক হয়ে শ্যামার চলে যাওয়া দেখে নিনাদ । ওর সাহস হয় না শ্যামাকে পিছু ডাকতে । হঠাৎ করে খুব কষ্ট হতে থাকে ওর বুকে । ভুল করলো কিনা বুঝতে পারে না নিনাদ । বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল এক পশলা । মেঘ কেটে গেছে । ঝকঝক করছে তাঁরায় তাঁরায় খঁচিত আকাশ । তারই মাঝে ঝুলে আছে একফালি চাঁদ । যেন, আকাশের কপালে টিপ ! মৃদু হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে । ছাদে পাঁটি বিছিয়ে চুপ করে বসে আছে শ্যামা । ওর কষ্ট হচ্ছে না, শুধু অদ্ভুৎ এক এক অবসাদ পুরো শরীর জুড়ে রিফুজ্যির মত জেঁকে বসে আছে । শ্যামার ছোট বোন নিলীমা এসে পাশে বসে । ‘কি হয়েছে রে দিদি ? বাসায় ফেরার পর থেকে দেখছি তুই যেন কেমন গম্ভীর হয়ে আছিস’ । – ন্ননা ! কিছু হয় নি । – তুই মিথ্যে বলছিস । – আরে কি শুরু করেছিস ! মিথ্যে বলব কেন শুধু শুধু । – হ্যাঁ, মিথ্যে বলছিস । তোকে চিনি আমি । নিনাদ দা’র সাথে কি কিছু হয়েছে ? – নিলী তুই নিচে যা ।

আমি কিছুক্ষন একা থাকবো । ‘একটাই তো মাত্র জীবন আমাদের । শুধুমাত্র একটা । অথচ এই আমাদের নিয়তি ও বটে । তবু আমরা বাঁচতে জানিনা নিনাদ । এই সমাজে এই সময়ে আমরা বাঁচতে জানিনা । বাঁচতে ভুলে গেছি আমরা নিনাদ । দোষ আসলে তোমার নয় । আমরা দাসত্ব করি অভ্যাসের, ভয় আর সংস্কার এর । প্রেমকে খুন করি অবহেলায় অতঃপর তার রক্ত ছানি রাতের আঁধারে । অপত্যস্নেহের পুতুলদের নিয়ে পুতুলের ঘর করি । শুধুই প্রশ্বাস নিই আর নিঃশ্বাস ছাড়ি । ছিঃ । ছিঃ । আমি আশা করেছিলাম তুমি বলবে । খুব আশা করেছিলাম, ‘চলো পালাই শ্যামা । সবকিছু ছেঁড়ে-ছুড়ে । দিন দ্রত ফুরিয়ে যাচ্ছে । আঁধার ঘনিয়ে আসছে দেখো । পালাই, বহিরঙ্গ থেকে অন্তরঙ্গে । আপাত থেকে সত্যের দিকে । সব বাঁধন ছিঁড়ে চলো দু’জন পালাই । পারবে ? সাহস হবে পালাবার’ ? ভালো থেকো নিনাদ । খুব ভাল থেকো । শ্যামা’রা তো পাখি ! তোমাদের পৃথিবীতে শ্যামা’দের জন্য সবুজ কোনো ডাল নির্ধারিত থাকে না বাসা বাঁধতে । শ্যামা পাখিদের জন্মই হয় উড়ে বেড়াবার জন্য । শ্যামা’রা উড়েই বেড়ায় । আজন্ম

অসহায়

কোথায় গেল ডোডো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *