
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। কত স্মৃতি, কত আবেগ। কত রক্ত, কত ত্যাগ। কত আশা, কত স্বপ্ন। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কাহিনী, অনেক স্মৃতিকথা ও অসংখ্য বই লেখা হয়েছে। প্রত্যেকের লেখার রয়েছে অনেক ভিন্নতা। সবারই রয়েছে নিজস্ব অভিজ্ঞতা। কেউ কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করেননি। ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র, কিন্তু একটি বিষয়ে বিরাট মিল। আর তা হলো পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার অভিন্ন লক্ষ্য।
আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি আমি বয়ে বেড়াই। আমার টুকরো টুকরো স্মৃতি কথায় প্রকাশ করে সব মানুষের সামনে তুলে ধরার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। আজ আমি তেমনি একটি টুকরো স্মৃতির কথা বলবো। একেবারে মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকের কথা। অগ্নিঝরা মার্চ মাস। নির্বাচনে জিতে বাঙালি একটা বড় পরিবর্তনের আশায় প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন দেখছে। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ আর তার রোমাঞ্চিত আহবান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। মন্ত্রমুগ্ধের মত সমস্ত মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে এক হয়ে যায়। ৮ মার্চ হতে মানুষের প্রতীক্ষার পালা, কখন স্বাধীনতার সূর্যোদয় হবে। তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে ইয়াহিয়ার আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনার নামে চলছে শুধু কালক্ষেপণ। এছাড়া এই নিস্ফল আলোচনার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাঙালি জাতি উদ্বেলিত ও বিমূঢ়। প্রতিদিন প্রতিবাদী ছাত্র জনতার মিছিল আর মিছিল।
অবশেষে এল ভয়াল ২৫ মার্চ। সেই রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির উপর কামান, ট্যাংক, মর্টার গ্রেনেড ও রাইফেল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাকিস্তানি হানাদার মিলিটারিরা। সারাদেশ জুড়ে শুরু হয় দানবীয় হামলা, রক্তপাত আর ধ্বংসযজ্ঞ। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র জনতা। এমনি এক সময়ে আমার এলাকায় ঘটে একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা, যা আমার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করছে।
রামশীষ একট ছোট্ট অবুঝ শিশু। রামশীষের বাবা সরজু চৌকিদার। দাদা জগমোহন চৌকিদার। সরজু চৌকিদারের বাবা জগমোহন চৌকিদার বিহারের দাড়ভাংগা জেলা থেকে কাজের সন্ধানে আসে ’৪৭ সালে দেশ ভাগের অনেক আগে। সে সায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছিল রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ১২নং মিঠিপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত আমাদের গ্রাম কাশিমপুরে। আমার বাবা তখন ছিলেন ইউনিয়ন পঞ্চায়েত প্রধান। সরজুর বাবা জগমোহন ও সরজুকে চৌকিদারের চাকরি দিয়েছিলেন তিনি।
আমি তখন ছোট। সরজুর মা ছিলেন এলাকার নামকরা ধাত্রী। আশেপাশের অসংখ্য গ্রামের মেয়েমহলে তার ছিল প্রচুর নাম ডাক আর সম্মান। সরজুর মা আমারও ধাত্রী ছিলেন। সরজুকে রাত নয়টার দিকে একটা লণ্ঠন, একটা বল্লম হাতে গ্রাম পাহারার কাজে বাড়ি থেকে বের হতে দেখতাম। এক ঘণ্টা পরেই হাক শুনতাম, “বস্তি ওয়ালা জাগো ও ও ও।’’ ওদের মাতৃভাষা ছিল হিন্দি। হিন্দিতেই তারা গ্রামের মানুষজনকে জেগে থাকার আহবান জানাতেন। বাংলা হিন্দি মিলেই একটা অদ্ভুত মিশ্র ভাষায় সরজুর পরিবার কথা বলত গ্রামের অন্য লোকদের সাথে।
যুদ্ধের কয়েক বছর আগে সরজু চৌকিদার বিয়ে করে। আমাদের গ্রাম ছেড়ে আশ্রয় নেয় আমার মামার বাড়ি একবারপুরের মাদারগঞ্জ হাটের কাছে। জগমোহন এক গ্রামে আর সরজু চৌকিদার আর এক গ্রামে। গ্রামের মানুষদের জাগিয়ে রাখতো, সাহস জোগাতো, তাদের কঠোর পাহারার ফলে কখনই চুরি হতো না। ডাকাতির তো প্রশ্নই ছিল না। এভাবেই চলছিল তাদের রাতের পর রাত নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্বপালন। এর মধ্যে এসে যায় মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীকার আন্দোলনের শেষ অধ্যায়।
২৫ মার্চ পাকিস্তানের হায়েনা বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ছাত্র, কৃষক, মজুরসহ আপামর জনতা প্রচণ্ড প্রতিরোধ করে হানাদার বাহিনীকে। পাশাপাশি লক্ষ কোটি মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে দিগি¦দিক ছুটাছুটি করে। ৩১ মার্চ বুধবার ছিল সরজু চৌকিদারের থানায় হাজিরা দিন। সে সারা সকাল ভেবেছে হাজিরা দিতে যাবে কিনা। পরামর্শ করেছে স্ত্রীর সাথে। প্রতিবেশীদের সাথে। বন্ধুদের সাথে। সবাই বারণ করেছে। কিন্তু সবার নিষেধ উপেক্ষা করে পঁচিশ টাকা মাসিক বেতনের সরজু চৌকিদার চাকরি হারানোর ভয়ে অবশেষে হাজিরা দিতে পীরগঞ্জ থানায় উপস্থিত হয়।
রীতি ভঙ্গ করে সেদিন পনেরটি ইউনিয়নের খুব কমসংখ্যক চৌকিদার, দফাদারই হাজিরাতে সামিল হয়েছিল। যথারীতি সকল দফাদার ও চৌকিদারের পরনে ছিল খাকি ইউনিফর্ম এবং হাতে ছিল বল্লম। দারোগা সাহেবও তাদের অসহায়ত্বে কথা বিবেচনা করে দিনের মধ্যভাগেই বাড়ি ফেরার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেননা তখন দারোগা, পুলিশ, দফাদার, চৌকিদার সবাই ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে এবং পাকিস্তানিদের আক্রমণের আশঙ্কায় শঙ্কিত।
সরজু চৌকিদারও তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার জন্য রওনা হয়। তাড়া ছিল তার। কারণ স্ত্রী তাকে খাবারের জন্য চাউল কিনে নিতে বলেছিল। সরজু চৌকিদার সে তাগিদেই একটু জোর কদমে চলছিল। যখন সে রংপুর বগুড়া হাইওয়ে পার হবে হঠাৎ করে দেখতে পায় সাক্ষাত যমদূত মিলিটারির কনভয় অতি নিকটে। ভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তখন সে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে মিলিটারিরা তাকে গুলি করে।
দাপাতে দাপাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সরজু চৌকিদার। রাস্তার পাশের জমিতে পড়ে থাকে সরজুর প্রাণহীন রক্তাক্ত দেহ। তার অন্য সাথীরা তখন আত্মরক্ষার্থে দ্র“ত স্থান ত্যাগ করে। এভাবেই রাত কেটে যায়। পরদিন বিকেলে সরজু চৌকিদারের মরদেহটি বাড়ি নেবার জন্য তার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা আসেন।
ঠিক এমনি সময়ে সরজু চৌকিদারের বউও আমাদের বাড়ি আসেন। সন্ধ্যা সমাগত। সরজু চৌকিদারের মরদেহ নিয়ে তখনো স্বজনরা ফেরেনি। আমাদের বাড়িতে তখন পীরগঞ্জের অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। লোকে লোকারণ্য। নানা লোকের নানা কথা। কেউবা প্রশ্ন রাখে মরদেহ এখনো ফেরৎ আনা হয়নি কেন? কারো আক্রোশ, কারো সহানুভূতি।
এদিকে সরজু চৌকিদারের সদ্য বিধবা তরুণী বউ বিলাপ করছে। তার মর্মভেদী কান্না ও আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। সাতে তার দুবছরের ন্যাংটা ছেলে রামশীষ। রামশীষ হঠাৎ বলে উঠলো, ‘মা বাবা কখন চাউল নিয়ে আসপি? কখন ভাত হ্যোবে, মোক যে ভোক নাগছে।’ রামশীষের কথা শুনে নির্বাক হয়ে যায় উপস্থিত সবাই। রামশীষের শোকার্ত মা এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নাই। তার কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। মৃত্যুর চেয়ে ভয়ংকর এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আমিও দিতে পারিনি। কেউ পারেনি। আর কেউ কখনও পারবেও না।