অনেক কিছুই ভুলে যাই প্রতিনিয়ত। ভুলে যাই দুঃসহ স্মৃতি, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, প্রথম প্রেমের কাতরতা- কতো কিছুই না ভোলার জন্যে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। তারা নিজেরা এসে ভিড় করে জীবনে, অপ্রয়োজনে একাই চলে যায়।
এরকম যাওয়া আসার কোরাসে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা, কথা ও স্মৃতি কখনোই ভোলার জন্যে নয়। কেননা সেগুলো মনে রাখার মধ্যে দিয়েই জীবন ক্রিয়াশীল হয়, আমরা সামনে চলার প্রেরণা পাই। আমি প্রেরণা পেয়েছিলাম একজনের কাছে থেকে, যে আমাকে চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছিল- স্ফুলিঙ্গের ছটার মতো জ্বেলে দিয়েছিল আমার অপার বিস্ময়কে, আমার কৌতূহলকে।
সেই মানুষের মৃত্যুদিন ভুলে যাওয়া আমার কাছে প্রতিভাত হচ্ছে আস্তিত্বিক পাপ হিশেবে- হয়তো তার জন্যে আমি অপরাধী নিজের কাছে। হুমায়ুন আজাদ- নামটাই যথেষ্ট জ্বলে ওঠার জন্যে, নিজের পরিচয়ের বিম্ব তৈরি করার জন্যে। কিন্তু তাকে নিয়ে যখনই কিছু লেখার চিন্তা করছি, তখন আমার আলাদা করে ভাবতে হচ্ছে। কারণ আমাদের জীবনের প্রস্তাবনাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সেখানেই আমাদের জীবনদৃষ্টি নিহিত। সেই প্রস্তাবনার ভূমিকার রচয়িতা যিনি, তিনি অবশ্যই আমার বা আমার মতো অনেকের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ।
হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে আমার এই কথাগুলো একান্তই ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন এবং তাকে নিয়ে আমার চিন্তার ক্ষুদ্রতম নির্যাস। অনেক লেখার ইচ্ছে নিয়ে লিখতে বসি নি, শুধু শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। কারণ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এই লেখকের সাথে আমার সম্পর্কটা ভীষণভাবে ব্যক্তিগত।তিনি একজন, যে কী না আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিল চিন্তার অবারিত উদ্যানে। নিজেকে আমি প্রথমবারের মতো স্বাধীন বলে ভাবতে পেরেছিলাম তাঁর লেখা পড়ে। অনেকের লেখাই পড়েছি, কিন্তু কৈশোরের সেই উচ্ছল দিনগুলোতে তিনি এনে দিয়েছিলেন নতুন উদ্যম, বাঁধভাঙার উল্লাস। জীবনে চিন্তার স্বাধীনতার থেকে মূল্যবান কিছুই নেই, তিনি আমার সেই স্বাধীনতার রুপকার।
উনার একটা কবিতা মনে পড়ছে এই মুহূর্তে, কবিতার নাম “হাঁটা”, সেই পঙক্তিগুলোই আমাকে বলে দেয় তাঁর কথাঃ প্রথম যেদিন টলোমলো দাঁড়াতে শিখেছিলে তেমনি দাঁড়াও একা হাঁটো, সম্পূর্ণ নতুন পথে, হেঁটে যাও। এই হাঁটার আত্মবিশ্বাসটা আমি পেয়েছিলাম উনার কাছে, যদিও একসময় আমি প্রবলভাবে আচ্ছন্ন ছিলাম তাঁর দ্বারা। সেটা হওয়া স্বাভাবিক মনে করি আমি এখন, কারণ আমি যে-বয়সে হুমায়ুন আজাদ পড়েছিলাম, তখন উদ্দীপ্ত হওয়ার সময়ই ছিল। এখনো হয়তো হই, কিন্তু এখন আমি মূল্যায়ন করতে পারি উনাকে- হয়তো আগে, সেই সময়ে যেটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অসংখ্য সীমাবদ্ধতা ছিল তাঁর, কিন্তু তাঁর থেকেও বড় কথা- তিনি আগুন জ্বালিয়েছিলেন, সেই আগুন এখনো আমরা বয়ে বেড়াই। হয়তো আমি,এবং আমার মতো আরও অনেকে- এটা বিশ্বাস করেন, অথবা আততায়ীর মতো হুমায়ুন আজাদের আদর্শ ধারণ করেন। কিন্তু জানি, সেটা আত্মহত্যার শামিল। নিজের চিন্তাকে কুক্ষিগত করার মতো।
এখন আমি বলতে পারি, হুমায়ুন আজাদকে পড়ে তাকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে, তারপর তাকে বিচার করতে হবে। কারণ তিনিই বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা না বুঝে মুখস্ত করা বর্বরতা। সেই বর্বরতার শিকার তিনি ইদানিং হচ্ছেন। মানুষ তাঁর বই পাঠ করছে, উদ্দীপনায় আগ্রাসী হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞার আলোয় আলকিত হচ্ছি না আমরা, ভিড়ের মধ্যে থেকে তিনি চলে যাচ্ছেন আড়ালে। আমি মনে করি, হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে যৌক্তিক বিরুদ্ধতা ঘোষণা শুরু করার মাধ্যমে চিন্তার মুক্তি আসতে পারে; তা না হলে হুমায়ুন আজাদও দেবতার আসনে আসীন হবে- যেটা তিনি ঘৃণা করতেন। ভাবতে পারি, তিনি কতোটা ভ্রান্ত ছিলেন যখন বলেছিলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাস ব্যর্থ উপন্যাস, যখন তিনি সমর্থক ছিলেন মার্কিন যুদ্ধনীতির, যখন প্রবচনের পর প্রবচন তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঋণ করেছেন।
এরকম আরও হাজারও উদাহরণ থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলোর ভেতর থেকেই আবিষ্কার করতে হবে হুমায়ুন আজাদকে- যিনি লিখতে পারেন “কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দুর” মতো অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ, “নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু”র মতো উপন্যাস, “আমার অবিশ্বাস”এর পাতায় পাতায় অবিরাম সাহসী উচ্চারণ- যার তুলনা হয়তো এখনো বাঙলাতে নেই- বলেছিলেন আহমদ শরীফ। তাঁর মানদণ্ডটা তিনি এভাবে নিজেই তৈরি করে গিয়েছেন।
অন্ধ অনুকরণ নয়, সেই আজাদকে আবিষ্কার করতে হবে। হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়ন তাঁর অন্ধ ভক্তরা করতে পারবেন না, সেটা এক নতুন পীরবাদের জন্ম দিবে। হুমায়ুন আজাদের অবস্থান নির্ণয় করার জন্যে তাঁর যৌক্তিক সমালোচনাই মুখ্য। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন- কিন্তু সোনার মধ্যেও খাদ থাকে, সেই খাদ নির্ণয় করতে হবে তাকে ভালোবেসেই। তাঁর কবিতায় ছিল অভাবিত সৌন্দর্য, গদ্যে ছিল আকর্ষণ করার দুর্নিবার ক্ষমতা- যেটা গেঁথে থাকতো হৃদয়ের দেয়ালে, স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা তিনি কখনোই করেন নি, আমাদের ভাবাতে চেয়েছিলেন, পরিচয় করে দিতে চেয়েছিলেন চিন্তারাজির সাথে। হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
হুমায়ুন আজাদ, আমার ওপর সম্ভবত একজনই ছিলেন এত প্রভাবশালী – যার জন্যে আমি নতুন করে হাঁটতে শিখেছিলাম। সেই মিছিলে আছে আরও হাজারো মানুষ। আজ তাই সেই মিছিলের অনেকের মতো আমিও, ঘুমিয়ে পড়ার আগে অন্তত কিছুদূর যেতে চা