মানুষাঁড়

টিউশন থেকে মেসে ফিরেই রাজু দেখল-আপন বসে বসে কেমিস্ট্রি পড়ছে।ওরা দুই বন্ধু একসাথে শহরে মেসে থাকে।রাজু মহসিন কলেজে আর আপন সিটি কলেজে পড়ে। দুজনেই গ্রাম থেকে এসেছে।রাজুর বাড়ি আনোয়ারা, আপনের বাড়ি চন্দনাইশ।তারা বিজিসি একাডেমী স্কুলে একসাথে পড়েছে সেই ২য় শ্রেণি থেকে।এসএসসি তে দুজনেই গোল্ডেন এ+ পেয়েছে।তবে দূর্ভাগ্যক্রমে একই কলেজে চান্স পাইনি। আপনকে পড়তে দেখে রাজু বলে উঠল- -কিরে শালা! সারাদিন এত্ত পড়স কেমনে? -ক্যান? তুই পড়স না? -তুর মত সারাদিন বই নিয়া বসে থাকিনাতো!!! -জানি!জানি! বুয়েটে চান্স নিশ্চিত তুর! -কচু! পেলে আমরা দুজনেই পাবো!না পেলে কেউ পাবো না! -আরে বাদ দে এসব! অন্য কথা বল! -গল্প পড়ে করবো।মাগরিবের আজান দিছে।আমি নামাজ পড়ি আসি।

তারপর নাস্তা খেয়ে অনেক কথা আছে। রাজু নামাজ পড়তে মসজিদে চলে যায়।আপন বই বন্ধ করে পড়ার টেবিল থেকে উঠে দাড়ায়।চুলোতে চায়ের জন্যে পানি তুলে দেয়।এরপর এসে জানালার পাশে দাড়ায়।জানালা দিয়ে শীতের পরিষ্কার আকাশটা দেখা যাচ্ছে।তবে গ্রামের মত বিশাল না।বড় বড় বিল্ডিং এর কারণে ছোট একটা টুকরো দেখতে পাচ্ছে আপন।তাতেও অসংখ্য তারার ফুল মিটমিট করে হাসছে। আপন তাকিয়ে আছে আর ভাবছে- “কত্ত সুন্দর ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া স্কুল লাইফ।সবাই মিলে কত্ত মজা করতো স্কুলে।তাদের বাড়িটাও ছিল সেরকম-গাছগাছালির ছায়াঘেরা। তার রুমের পাশে ১টা হাসনাহেনা গাছ ছিল।তাই রুমটা সারাদিন এক স্বর্গীয় সুগন্ধের মধ্যে নিমজ্জিত থাকতো।

এখন কলেজ,প্রাইভেট, টিউশন এগুলোর চাপে বাড়িতেই যাওয়া হয় না। আচমকা দরজায় দুপদাপ শব্দে আপনের কল্পনার ঘোর কাটলো।রাজু এসে অনেক্ষণ ধরে দরজা নক করছে।আপন কল্পনার রাজ্যে থাকায় খেয়াল করেনি।দরজা খোলার পর রাজু উত্তেজিত হয়ে বলল- -কিরে বেটা! কি করস? দরজা খুলস না ক্যারে? -সরি। কিছুক্ষণ এর জন্যে অতীতে হারিয়ে গেছিলাম! -বুঝতে পারছি? -কি? -চুলোর উপর দেখ…শালা!!! -হায়! হায়! চায়ের পানি শুকিয়ে পাত্রটা জ্বলতে শুরু করেছে! এরপর রাজু নিজে চা বানিয়ে দুজনে মিলে খেল।খাওয়া শেষ করে শুরু হল গল্প! প্রতিদিন ২৪ ঘন্টার মধ্যে ১ঘন্টা ওরা সুখ-দুঃখের গল্প করে। আজকে শুরুটা করলো রাজু- -দোস্ত আগামীকাল বাড়ি যাব! – হঠাৎ বাড়িতে? -না আসলে আগামী ৩ দিন তো হরতাল।কলেজ প্রাইভেট সব বন্ধ।তাই ভাবলাম বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। -টিউশনে যাবিনা? -২ দিনের ছুটি নিছি।আজকে বেতন দিছে।

কালকে আম্মুর জন্যে ১টা শাড়ি কিনবো আর রিহানের জন্যে ১টা গল্প বই! বাড়ি গিয়ে ওদের দিব। -তোর ভাই রিহান এখন কিসে পড়ে রে? -সিক্স এ! তুই যাবি বাড়িতে? -নারে ভাই।টিউশন আছে। -ও! তো তৃপ্তির কি খবর? -জানিনা! কিছুতেই এক্সেপ্ট করেনা। -লেগে থাক মাম্মা।একদিন লাইন হয়ে যাবে। -ধুর! তানিমার কি খবর? -ইতির কথা ক্যান বলস? বলছিনা বুয়েটে চান্স পেলেই প্রপোজ করবো!না পেলে আর কোনদিন তাকাবোও না। -ওরে…বাপরে!!! -আরে ধুর এসব বাদ দে।ঠিকমত পড়াশুনা করতে হবে। ভালো কিছু করতে না পারলে আমাদের পরিবারের কি হবে? আব্বু,আম্মু,ভাই-বোনদের দেখতে হবে তো! -ঠিক বলছোস! এরপর রাজু পড়তে বসে।আপন ঘুমিয়ে যায়।আজ ভাত রাঁধবার দায়িত্ব রাজুর।ঘুমোবার আগে আপন রাজুকে বলে রাখে রাতে ১২টায় ডেকে দিতে।

রাজু পড়ে উঠে,ভাত রেঁধে ঠিক ১২টায় আপন কে ডেকে তুলে দেয়।এরপর দুজনেই ভাত খেয়ে নেয়।খাওয়া শেষে আপন পড়তে বসে, রাজু ঘুমিয়ে যায়।হরতাল বলে এই নিয়ম করেছে তারা।হরতাল না হলে দুজন একসাথে খায়,একসাথে পড়ে। ফজরের আজানের সময় আপন রাজু কে ডেকে দেয়।নামাজ পড়ে রাজু আর ঘুমোয় নি। একটু করে অংক করে নেয়।একসময় সূর্যিমামা উকি মারে পুব আকাশে।পৃথিবী যখন পুরোপুরি আলোকিত, পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে।সকাল ৭টা হবে যখন রাজু বের হচ্ছিল।বাইরে হালকা হালকা কুয়াশা ছিল।আপন ঘুমিয়ে পড়েছিল।ও উঠে দরজা বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়ল! হঠাৎ মোবাইলের শব্দে ঘুম ভেংগে যায় আপনের।রিসিভ করতে পারে নাই।ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি চোখে হালকা পানি ঝাপটা দেয়।এরপর মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে রাজুর কল।

২৮ টা মিসকল হয়ে আছে।তাড়াতাড়ি কল ব্যাক করে।অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনে অবাক হয়ে যায়।পাগলের মত বাসা থেকে বের হয়ে যায়।তাড়াতাড়ি একটা রিকসায় উঠে বলে চট্টগ্রাম মেডিকেলে যেতে। কি হয়েছে কিছুই বলেনি লোকটা।শুধু বলেছে তোমার বন্ধু এখানে।যত শীঘ্রই সম্ভব চলে আসো! গিয়ে যা দেখল তা দেখার জন্যে আপন প্রস্তুত ছিল না– রাজুর শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে পেট্রোল বোমার আঘাতে।রাজু, আপন কে ডেকে বলল-”দোস্ত শাড়িটা আর বইটা আমাদের ঘরে দিয়ে আসিস।আর আমার ডায়েরীটা তানিমাকে দিস।” আর কথা বলতে পারেনি।একটু পর সবাইকে ছেড়ে,এই মানুষ নামের বলদ দের পৃথিবী ছেড়ে,আপনকে একা ফেলে রাজু চলে গেল না ফেরার দেশে।

আপন শাড়িটা আর বইটা নিল।শাড়ির প্যাকেটের এককোণা পুড়ে গেছে।টেরীবাজার থেকে কেনা শাড়িটা।আর রিহানের বইটা হল– “আমাদের গল্প”।বইয়ের সাদা প্রচ্ছদটা একটু লালচে হয়ে গেছে।আপন একদম কাঁদছে না! ভাবছে রাজুর মাকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে? আর ঘৃণায় পাথর হয়ে আছে।এই ঘৃণা তাদের জন্যে যারা ক্ষমতার লোভে মনুষত্ব্য হারিয়েছে।এই ঘৃণা সেসব মানুষাঁড়দের জন্যে যেসব মানুষ নামের ষাঁড় গুলো উন্মাদ হয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে অগণিত মানুষের স্বপ্নকে।যাদের জন্যে মুকুলেই ঝরে যাচ্ছে অনেক রাজুরা।আপনের চোখে তাদের জন্যে শুধুই ঘৃণা,ঘৃণা আর একরাশ—থুঃ থুঃ থুঃ….. [মানুষাঁড়দের থেকে মুক্তি চাই]

কোথায় গেল ডোডো

কথাশ্রমিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *