রুকু থেকে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল মকবুল বুড়োর ।বয়সের চাপে মূত্রনালীর ভাল্ভ দূর্বল হয়ে গেছে ।বহুক্ষণ আটকে রাখা প্রশ্রাবের বেগটা সামাল দিতে পারলেন না ।মসজিদের মধ্যেই ঝোঁ ঝোঁ করে ছেড়ে দিলেন ।দুপাশে দাঁড়ানো মুসল্লিরা আড়চোখে তাকাল তার দিকে ।ইমাম সাহেব সালাম ফিরাতেই বড়ো-সড়ো একটা শোরগোল পড়ে গেল ।নাতির বয়সী কেউ কেউ কটূ কথা বলে বসল দু একটা ।মকবুল বুড়োর মনে হচ্ছিল মাটি যদি দুই ভাগ হয়ে যেত !সবকিছু অন্ধকার লাগছিল তার কাছে ।দুজন লোক তাকে ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এল ।বিকেল বেলা গা কাঁপিয়ে জ্বর এল মকবুল বুড়োর ।জ্বরের প্রকোপে প্রলাপ বকতে শুরু করলেন । মকবুল বুড়ো বুঝতে পারছিলেন, তার সময় বেশি বাকি নেই ।চার ভাই, দুই বোন- সবাই চলে গেছে ।একা মকবুল বুড়ো রয়ে গেছেন শুধু ।সত্তর বছরের সূদীর্ঘ জিন্দেগিটা পাঁচ মিনিটে ভ্রমণ করে ফেললেন মকবুল বুড়ো ।সবশেষে তার মনে হল-জীবন মানে কিছু না-শুধু না পাওয়ার বেদনা ।
ঈমানদার লোক বটে মকবুল বুড়ো ।তিরিশ বছর থেকে তাহাজ্জুদ কাজা হয়নি ।যৌবনের প্রথমদিকে তাবলিগ জামাতের সাথে প্রথম তিন চিল্লা দিয়েছিলেন ।তারপর থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তাকবিরে উলার সাথে, কদাচিৎ মিস হয় ।দাড়ি- টুপি-পাঞ্জাবি ।বিবিকে পর্দার আড়ালে রাখেন ।মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়েছেন দ্বীনদার পাত্র দেখে ।একজন মসজিদের ইমাম আরেকজন একটা ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভ ।একমাত্র ছেলেটা তিন চিল্লার সফরে আছে ।মহল্লার মসজিদে পাঁচ কাজের সাথে জুড়ে থাকেন মকবুল বুড়ো । পরদিন মকবুল বুড়োর অবস্থা আর খারাপ হয়ে এল ।আত্মীয়- স্বজন সবাই এসে দেখে যেতে লাগল ।সবাই সান্ত্বনা দিচ্ছে-ভালো হয়ে যাবে । মকবুল বুড়ো মনে মনে হাসছিলেন ।বিকেলের দিকে মহল্লার তাবলিগ জামাতের সাথিরা হাদিয়া সহকারে দেখতে এলেন ।মহল্লার আমির সাব তাকে অনেক উৎসাহব্যঞ্জক কথা শোনালেন ।শুনে মৃত্যুকাঙ্খা প্রবল হয়ে উঠল মকবুল বুড়োর । মাগরিব বাদ ঘটল ঘটনাটি । মকবুল বুড়ো পাশ ফিরে শুয়ে তিন তসবিহ আদায় করছেন এমন সময় ঘরের মধ্যে সালামের আওয়াজ পেলেন । *. আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ । *. ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু । সালামের জবাব দিতে দিতে পাশ ফিরে তাকালেন তিনি ।দেখলেন দরজা বন্ধ ।অথচ ঘরের মধ্যে একদল বরং অসংখ্য সুন্নাতি পোশাক পরিহিত লোক ।সবাই হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে ।
লোকগুলো শান্ত, সৌম্য, উজ্জ্বল এবং সকলের গায়েই সাদা পাঞ্জাবি ।সবার হাতে একটা করে খুব সুন্দর ফুল।ফুলগুলোর পাপড়ির রঙ অজানা, সুবাসটাও অচেনা ।কিন্তু পু্রো ঘর সুবাসে সুবাসিত হয়ে উঠেছে ।মকবুল বুড়োর কিছুই বুঝতে বাকি নেই ।তবু বললেন- *. আফনেরা কারা? *. আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি । *. কোথায়? সামনের লোকটি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করে বললেন- ঐখানে । মকবুল বুড়ো আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন আকাশটা দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে ।মধ্যখান থেকে একটা অতি সুন্দর স্থান দৃশ্যমান হয়ে উঠল।উঁচু উঁচু অট্টালিকা- ফুল ও ফলের বাগান-মণি মাণিক্য- আর… অপূর্ব এবং অপরূপ সুন্দরী একদল যুবতি গান গাইছে ।হাতের ইশারায় ডাকছে… তাকে ডাকছে … ।শরীরে যৌবন ফিরে পেলেন মকবুল বুড়ো । উত্তেজিত হয়ে লোকগুলোকে বললেন- নিয়া চলেন, আমারে নিয়া চলেন ।এক্ষুণি । মৃদু হেসে সামনের লোকটি বলল- তাহলে আপনি নামাজে দাঁড়ান । মকবুল বুড়োর মনে পড়ল, একবার চিল্লার জামাতের আমির সাব বয়ানের মধ্যে বলছিলেন- ভাই, পাঁচ কাম যে করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে মউতের সময় পাঁচটা পুরস্কার দেবেন- ইজ্জতি মউত, সোহলতি মউত, শাহাদাতি মউত, এস্তেগবালি মউত আর জান্নাতের মাকাম দেখে মউত ।
মকবুল বুড়ো মনে মনে আমির সাবের কথার সত্যতা অনুভব করলেন । তার শরীর এখন পুরোপুরি সুস্থ্য ।বিছানায় দাঁড়িয়ে গিয়ে আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধলেন । সুরা ফাতেহার পর সুরা ইখলাস । এরপর রুকু করে সেজদায় গেলেন ।ফেরেশতার দল চলে গেল ।সাথে মকবুল বড়োকে নিয়ে ।নশ্বর মকবুল বুড়ো সিজদায় লুটিয়ে রইলেন ।অবিনশ্বর মকবুল বুড়ো ইল্লিনের পথে যাত্রা শুরু করলেন । শৈশবে মকবুল বুড়োর পড়শোনা বেশি একটা এগোয়নি ।চাঁদে মানুষ গেছে এই তথ্য তার জানা ছিল না ।বস্তুর মধ্যে ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন থাকে এই তথ্যও না ।মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে কোনো বস্তু নিচে পড়ে এই তথ্যও না ।শুধু কালেমাটাই জানতেন মকবুল বুড়ো ।সেটাও শুদ্ধ করে শিখতে পুরো চিল্লাটাই গেছে ।বাকি জীবনটা এই কালেমার ওপর মেহনত করে কাটিয়েছেন-