
আনুমানিক দেড় হাজার বছর আগের কথা। সেই সময় ‘মহিলারোপ্য’ নামে দক্ষিণ ভারতে এক বিশাল রাজ্য ছিল। সে রাজ্যে যে শুধু বিশালতায় সুনাম ছিল তা নয়, সে রাজ্যের সমৃদ্ধির কথাও সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সে রাজ্যের তখনকার রাজা অমরশক্তিও ছিল বিদ্বান, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণতায় অদ্বিতীয়। তিনি যে শুধু নিজে গুণী ছিলেন তা নয়, তিনি গুণীদের কদর করতেও জানতেন।
তাই তার রাজ্যে বিদ্বান, বুদ্ধিমান, জ্ঞাণী গুণীর খুব একটা অভাব ছিল না। রাজ্যজয়ই যদি রাজার মান বাড়াবার মাপকাঠি হয়ে থাকে, তবে তাতেও অমরশক্তি পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি তার বাহুবলে বহু রাজ্য জয় করে নিজের রাজ্যের সীমানা বাড়িয়েছিলেন। তার রাজ্যকে করে তুলেছিলেন বিশাল ও সমৃদ্ধশালী। কিন্তু সব থাকা সত্ত্বেও তার মনে সুখ ছিল না। একদিন রাজা অমরশক্তি তার রাজসভায় পাত্র-মিত্র, অমাত্য ও সচিবদের সঙ্গে বসেছিলেন।
চারদিক থেকে তার জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছিল–কিন্তু রাজা বসেছিলেন ম্লান মুখে। রাজার মলিন মুখ দেখে তার প্রধান অমাত্য তাকে জিজ্ঞাসা করলেন–মহারাজ! আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? আপনি কি অসুস্থ? যদি শরীর ভালো না থাকে, তবে আপনি কিছুদিন বিশ্রাম নিন। আপনার সুশাসনে এ রাজ্যে কারও তো কোন অভাব অভিযোগ নেই। বৃদ্ধ মন্ত্রীর কথা শুনে মৃদু হেসে মহারাজ বললেন–মন্ত্রীবর! আপনার কথা সত্য, কিন্তু আমি শারীরিক সুস্থ থাকলেও মানসিক দিক দিয়ে অত্যন্ত অসুস্থ। একথা শুনে মন্ত্রী আবার বললেন–মহারাজ। আমি কি তাহলে একবার রাজবৈদ্যকে খবর দেব? ম্লান হাসি ফুটে উঠল রাজার মুখে। তিনি বললেন–দেখুন, রাজবৈদ্যের সাধ্য নেই আমার এ রোগ সারায়।
-মহারাজ! আপনার এমন কি রোগ হল যে, রাজবৈদ্য পর্যন্ত সে রোগ সারাতে পারবে না? একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজা বলল– আপনারা আমার ভাল চান। আমার রাজ্যে শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ব্যক্তির অভাব নেই, আমার রাজ্য ধন সম্পদে ভরা, আমার রাজ্যের প্রজারা সকলেই সুখী। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে। কিন্তু তবুও আমি দুঃখী কারন কি জানেন? –কি কারণ? মন্ত্রী খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন। — আমার তিনটি অকাট মূর্খ আর বোকাসোকা ছেলেরাই তার জন্য দায়ী। –এ আপনি কি বলছেন? অবাক হয়ে বললেন মন্ত্রী। –আমি ঠিকই বলছি। আমার রাজকার্য, প্রজাপালন, ঘরসংসার সবই অসার মনে হয়, যখনই ভাবি আমার তিনটি ছেলেই অকাট মূর্খ। রাজার এই আক্ষেপ শুনে বৃদ্ধ সচিব অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। শান্ত হয়ে বললেন, ‘মহারাজ! আপনি ঠিকই বলেছেন। মুর্খ ছেলের চেয়ে, ছেলে না থাকা অনেক ভাল। যেমন করেই হোক রাজপুত্রদের শিক্ষিত করে তুলতেই হবে। একথা শুনে অত্যন্ত হতাশ কন্ঠে রাজা বললেন–মন্ত্রিবর। আমার রাজ্যের পাঁচশ বেতনভোগী পন্ডিত যখন তাদের শিক্ষিত করে তুলতে সমর্থ হল না, তখন আর কি করে তাদের শিক্ষা সম্পূর্ন হবে? একথা শুনে বৃদ্ধ মন্ত্রী সুমতি হতাশা হলেন না।
তিনি রাজাকে আশা দিয়ে বরলেন–মহারাজ আমি জানি মানুষের জীবনের মেয়াদ ক্ষণস্থায়ী আর শিক্ষণীয় বিষয় অন্তহীন। অতএব যা পড়লে স্বল্প সময়ের ভিতর রাজপুত্রদের জ্ঞানর্জন হয় তেমন কোন নীতিশাস্ত্র রচনা করে আপনার পুত্রদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা উচিত। সভার সকলে প্রধান সচিবের এই যুক্তিকে সমর্থন জানালেন। মহারাজ অমরশক্তিরও প্রধান সচিবের এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য বলে মনে হল। তিনি বললেন, ‘মন্ত্রিবর! আপনার কি তেমন কোন নীতি শাস্ত্রবিদ ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় আছে? –আছে মহারাজ। — কে তিনি? –বিষ্ণুশর্মা নামে এক ভারতবিখ্যাত নীতিশাস্ত্রবিদ পন্ডিত আছেন। আপনি যদি অনুমতি করেন তবে তার কাছে দূত পাঠাতে পারি। –বেশ, তাই করুন। প্রধান সচিব সুমতি তখনই নীতিশাস্ত্রবিদ বিষ্ণু শর্মার কাছে দূত পাঠালেন। এই ঘটনার আর কিছুদিন পর। একদিন মহারাজ অমরশক্তি তার রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা সভায় বসে আছেন। এমন সময় হালকা পাতলা গড়নের এক বৃদ্ধ উপস্থিত হলেন। মহারাজ ব্রাহ্মণকের দেখে সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,‘– মহাশয়ের পরিচয়?’ –আমাকে লোকে বিষ্ণুশর্মা বলে জানে। — ও আপনিই সেই মহাজ্ঞানী বিষ্ণুশর্মা! আসুন আসুন, আসন গ্রহন করুন। মহারাজ অমরশক্তির এই বিনয়, এই ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হলেন বিষ্ণুশর্মা। তারপর আসন গ্রহন করে তিনি বললেন–মহারাজ! আপনার সুনাম অনেক শুনেছি।
এখন তা নিজের চোখে তার সঠিক পরিচয় পেলাম। এখন বলুন আমাকে আপনার কি প্রয়োজন? মহারাজ অতি বিনয়ের সঙ্গে বললেন–দেখুন আপনার পান্ডিত্য ও জ্ঞানের খ্যাতি সকলের নিকট পরিচিত। আমি আপনার কাছে একটি ইচ্ছা রাখতে চাই। — বলুন আমি আপনার জন্য কি করতে পারি? –আমার তিনটি মহামূর্খ ছেলে আছে। আজ পর্যন্ত কেউ তাদের শিক্ষিত করে তুলতে পারেনি। আমার অনুরোধ আপনি তাদের শিক্ষার ভার গ্রহণ করুন। বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে আমি আপনাকে একশত গ্রাম দান করব। একথা শুনে শান্ত স্বরে বিষ্ণুশর্মা বললেন– মাহরাজ! আমি শিক্ষা দান করি, বিক্রি করি না। এছাড়া আমার বয়স এখন আশি পেরিয়েছে। বিষয় আশয় দিয়ে আমি কি করব? –বেশ তো, আপনি আপনার মত ও পথকে সামনে রেখে–আমার পুত্রদের মূর্খ নাম ঘোচান, আপনার কাছে আমার এই অনুরোধ। –মহারাজ! আপনার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ। আমি আপনার অনুরোধ রক্ষা করলাম। আপনার তিন ছেলের শিক্ষার ভার আমি গ্রহণ করলাম। মহারাজ অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন– গ্রহণ করে আমায় এক চরম দুশ্চিন্তার হাত থেকে বাঁচালেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার ছেলেদের মূর্খ বদনাম ঘুচবে।
একথা শুনে বিষ্ণুশর্মা এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা করে বসলেন–মহারাজ! আমি এই রাজসভায় সমস্ত সভাসদদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করছি– যদি আমি ছয় মাসের মধ্যে আপনার ছেলেদের নীতিশাস্ত্রে পরদর্শী করে তুলতে না পরি তাহলে আমি নরকবাসী হব। বিষ্ণুশর্মার এ প্রতিজ্ঞা শুনে সভাসদদের কেউ কেউ খুশি হলেন আবার কেউ কেউ অসম্ভব বলে ভ্রুঁ কোচকালেন। বিষ্ণুশর্মা কিন্তু তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন। তিনি ১. মিত্রভেদ ২. মিত্রলাভ ৩. কাকোলুকীয় ৪. লবধ-প্রণাশ ও ৫. অপরিক্ষিকারক নামে পাঁচটি তন্ত্র রচনা করে ছয মাসের ভিতর অমরশক্তির তিনপুত্রকে নীতিশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। এই হল পঞ্জতন্ত্র গল্পের সূচনা