
ঢাকায় তেমন শীতের দেখা না মিললেও সিলেটে এসে বোঝা গেল পৌষ এসে গেছে। ট্রেন সেই শ্রীমঙ্গল অতিক্রম করার সময় বাবলুরা গরম কাপড়-চোপড় পরে নেয়। ইমা একটু মৃদু প্রতিবাদ করেছিল, শীত লাগছে না, গরম কাপড় পরব না। কিন্তু আম্মু রেহানাকে ধমক দিয়ে কার্ডিগানটা পরিয়ে দেন। বাবলুর আব্বুও যথারীতি জাম্পার একটা গলিয়ে নেন। ট্রেন যখন হিস হিস হিস হিস করে প্লাটফর্মে মাথা ঢোকালো, তখন বাবলু ইমার চোখে মুখে কী আনন্দ! আরেকটু পরই তারা দাদুর বাড়ি পৌঁছে যাবে। দাদুর বাড়ি থেকে নানুর বাড়িও যাবে।
সবচেয়ে মজা হবে ছোট মামার গার্ডেনের বাসায়। ছোট মামা টি গার্ডেনের ম্যানেজার। ওখানেও তারা দু’তিন দিন থাকবে। প্ল্যান প্রোগ্রাম আগেই করা। নাও, মালপত্তর বাংকার থেকে নামিয়ে হাতে হাতে নাও। বলল বাবলুর আব্বু। ধীরে ধীরে আন্তঃনগর ট্রেনটা এক নম্বর প্লাটফর্ম ঘেঁষে হিস্হিস্ হিস্হিস্ করতে করতে দাঁড়িয়ে যায়। বাবলুর আম্মু দুটো ঝোলানো ব্যাগ, আব্বু বড় স্যুটকেসটা আর বাবলু পানির পট ও ছোট্ট একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নেমে পড়লো গটগট করে। ইমুর হাত খালি ছোট বলে। টিকিট চেকিং পয়েন্ট অতিক্রম করে তারা। রাস্তায় এসে দেখে হুলস্থূল কান্ড। ঝকঝকে তকতকে নতুন স্টেশন স্পেস পুরনোটার থেকে বহুগুণ বেড়েছে শান শওকত কম না।
কিন্তু ভিড়-ভাট্টা আগের মতোই। সবুজ রঙের সিএনজি চালিত স্কুটার, রিকশা সারি সারি। প্যাসেঞ্জার নিয়ে টানাটানি। সে এক ভিন্নরকম কারবার। ‘আব্বু, লেদু চাচাকে ফোন দাও না!’ বাবলু বলল। বাবলুদের দূর সম্পর্কীয় চাচা লেদু, তার গাড়ি আছে। বাড়ি এলে তাকে জানালেই গাড়ি নিয়ে নিজেই হাজির হবেন। ভীষণ মজার লোক। স্মার্ট। বিশ্ব ভ্রমণ করা। কথায় কথায় ইংরেজির খই ফোটান। বাবলুর চাচাকে তাই ভারী পছন্দ বাবলুর। নানা রকমের ন্যায়-অন্যায় আবদার রক্ষা করেন তিনি। গাড়ি থেকে নামার আগে ফোন দিয়েছিলাম। লেদু বলল, রাস্তায় যা জ্যাম সিলেট শহরে, হয়তো আটকে গেছে কোথাও। আর যদি বেশি দেরি দেখি, দুটো স্কুটার নিয়ে চলে যাবো আরকি। হিরক বলল হাসতে হাসতে।
‘উুঁ, হুঁ আব্বু, স্কুটারে যাবো না- লেদু চাচার গাড়িতে যাবো- চাচার গাড়িতে গেলে অনেক মজা হবে।’ বাবলু বলল। ‘কিন্তু যদি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও না আসে তবে’- কথা শেষ করার আগেই এ সময় দেখা গেল সারি সারি স্কুটারের ভিড়ে পেছনে একটা লাল হাতের ইশারা। বাবলুরই চোখে পড়ে প্রথম। বাবলুর আব্বুও ভালোভাবে নজর করে দেখেন, লেদুর হাত। লাল রঙের ফুলহাতা গরম গেঞ্জি পরেছে সে। ‘ঐ যে, ঐ যে আব্বু, চাচা-লেদু চাচা-’ বাবলু বলে উঠলো সোৎসাহে। হিরক দেখলো তার স্মার্ট ভাইটি ঠিকই তার মিৎসুবিসি লাল পাজেরো গাড়ি নিয়ে হাজির। ভিড়ের মধ্যে গাড়ি নিয়ে এগোতে পারেনি। তাই দূর থেকেই ডাকাডাকি করছে। ‘রেহেনা, লেদু ঠিকই এসে গেছে। চলো একটু আমরা এগোই, গাড়ি এ পর্যন্ত আসবে না বোধ হয়।’ হিরক বলল। ‘লেদু আসবে না, ইটস কোয়াইট ইম্পসিবল। খবর পেলে শত কাজ ফেলে ঠিকই ছুটে আসব রেহানা হাসতে হাসতে বলল। গাড়িতে চলে বাবলু ইমাদের ফুর্তি বেড়ে গেল। ‘চাচা, তুমি কিন্তু নতুন ব্রিজের ওপর দিয়ে যাবা, পুরনোটা একদম পচা। নড়া দাঁতের মতো দুলে ওঠে। বেশি গাড়ি উঠলে।’ বাবলু বলল, ‘ও পথে অনেকটা ঘোরা হবে। আমরা এখন যতো জলদি বাসায় পৌঁছতে পারি ততই ভালো, ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।’ হিরক বলল। ‘ঠিক আছে, একটু না হয় ঘুরে গেলাম, বাবলু চাচাজীর কথাই রাখা হবে। ব্রিজ আর ইটা নতুন নেই। আরো একটা নতুন হচ্ছে। খুব শিগগির পারাপারের জন্য খুলে দেয়া হবে।’ লেদুর গাড়ি নিচ পথ থেকে উঁচুতে মেইন রোডে উঠে সাঁই করে ডান দিকে টার্ন নিলো। বাবলু ইমা খুশি, হাততালি দেয় দু’জনে, মুখে লেগে আছে হাসি। সিলেট শহরের সেতুবন্ধ বলতে আগে একটা ব্রিজই ছিলো। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কিন ব্রিজ। তৎকালীন পূর্ববাংলার গভর্নর লর্ড কিন সাহেবের নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্পূর্ণ লোহা দিয়ে তৈরি। এই ব্রিজ এখনো সুরমা নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় অবদান রেখে চলেছে। কিন্তু ব্রিজের বয়স একশ পেরিয়ে গেছে। তাই আগের মত সবল নেই। ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ। তবু বেশি গাড়ি এক সঙ্গে চাপলে বুড়ো ব্রিজটা টাল সামলাতে পারে না। নড়ে চড়ে ওঠে। তাই জিয়াউর রহমানের সময় আরেকটি ব্রিজ তৈরি করা হয়। সে ব্রিজও যানবাহনের চাপ বহন করতে আর পারছে না। তাই, আরো একটি ব্রিজ হচ্ছে কাজির বাজারে। ‘চাচা, নুতন ব্রিজটা কবে খুলে দেয়া হবে?’ ‘ঠিক জানি না বাবা, তবে কাজ খুব একটা বাকি নাই বলিয়াই জানি।’ লেদু গাড়ি চালাতে চালাতে জবাব দেয়। ‘চাচা, পুরনো ব্রিজের ওপর গাড়ি উঠলে বুড়ো ব্রিজটা হেলে দুলে বলে উঠে, আর পারছি না বাবা, আর পারছি না।’ হি হি হি হি …। ইমা হাসে। ‘হ্যাঁ, ব্রিজের বয়স তো কম হইল না- তবে ইঞ্জিনিয়ার সাবরা মতামত দিছুইন, যদি এটা কিছু মেরামতের কাজ ভালোভাবে করা যায়, আরো পঞ্চাশ বছর ঐ ব্রিজ চলবে।’ লেদু বলল। ‘কিন্তু লেদু, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় অভাব সময়ের কাজ সময়ে না করা, আর মেইন্টেনেস না করা। সরকারি জিনিসের তো কোন মা-বাপ নেই।’ হিরক বলল। লেদু হ্যাঁ হু করে গাড়ি ড্রাইভিং করে যায়। দুই. হইচই করে দাদুর বাড়িতে দুটো দিন কেটে গেল। দাদুর বাড়ি সিলেট শহরে হলেও বেশ সুন্দর জায়গাটা। মূল শহর থেকে একটু প্রান্তে। পাঠানটুলা। গাঁও-গেরামের সবুজ পরিবেশ এখানে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ছোট্ট একটা টিলার ওপর ওদের দাদুর বাড়ি। গেটে লেখা পাহাড়িকা মজার নাম। বাবলু-ইমার পছন্দ। অবশ্য এটা ওদের আসল বাড়ি নয়। আসল বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ-কুশিয়ারা নদীর তীরে শুধু নদী নয় আছে সাতটি বিল মিলে বিশাল বিল সাতবিলা (স্থানীয় উচ্চারণ হাতবিলা)। আছে ছোট বড় বেশ কিছু টিলা। ওদের দাদুর বাড়িও বড় একটা টিলার ওপর। তবে এখানে ওর দাদু বহুদিন হলো বাড়ি বানিয়ে আছেন। আত্মীয়-স্বজন কেউ কেউ থাকেন লন্ডন-বিদেশে। তাই শহরে একটা স্টেশন চাই। এখানে এলে বাবলুর সময় কিভাবে গড়িয়ে যায় টেরই পায় না। মনে হয় ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা দ্রুত সরে যাওয়া ধানখেত ঘর-বাড়ি গ্রামের ছবি বুঝিবা দৌড়ে পালানোর মতো। বাবলু-ইমা দাদুর বাড়ি এলে মুক্ত স্বাধীন। চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো। সবচেয়ে মজা পায় ওরা ঝরনার কাছে এলে। চাচা বলেন, ওটা ঝরনা না, ছড়া। পাহাড়ি ছড়া। ছড়া আর ঝরনার প্রভেদটা মাথায় ঢোকে না। সে এবং ইমা দু’জন ঝরনাই বলে। কী সুন্দর টলটলে স্বচ্ছ পানি! ছোট বড় পাথর নুড়ির ওপর বয়ে চলেছে পানি। নুড়ি-পাথরের সঙ্গে কী যেনো কানে কানে কথা বলে কল কল শব্দে। কোথায় যে এর শুরু আর কোথায় যে শেষ তা বাবলুর জানতে খুব ইচ্ছে করে। চাচা বলেন- এই ছড়া অন্তত দশ বারো মাইল উত্তরে একটা বড় পাহাড় আছে সেখান থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু সেই পাহাড়টা আজো দেখা হয়নি বাবলুর। আর শেষটাও তার দেখা বাকি।
তা-ও বহু দূর চলে গেছে নাকি! কতো দিন ছড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ভেবেছে এর কিনার ধরে হাঁটতে হাঁটতে কী দেখে আসবে শেষটা এবং শুরুটা? কিন্তু তা কী করে সম্ভব। পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে ছুটে চলা ছড়ার সঙ্গে সে পা মিলাবে কিভাবে? পায়ে হাঁটার পথ কোথায়? তবু বাবলুর মন থেকে সরাতে পারে না। এই দেখার আগ্রহ। মনে মনে ঠিক করে আরো বড়ো হলে চাচার মতো, তখন না হয় খুঁজে দেখবে এই ছড়ার শুরু ও শেষটা। কাল ছোট মামার বাসায় যাবার কথা। এর মধ্যে মামা একদিন ঘুরে গেছেন। বাবলু ইমারা মামাকে পেয়ে খুশিতে বাগবাগ। ছোট মামা, মানে মীর্জা খবির, তাদের প্রিয় মামা। আব্বুর মতে- ভেরি জিনিয়াস বাট স্ক্রু ঢিলা। মামাকে বলছে বাবলু ইমা, এবার গেলে অবশ্যই পাখি শিকারে নিয়ে যেতে হবে। আব্বুর অবশ্য পাখি শিকার হবি। ছোট মামা পাকা শিকারি। দু’জন একত্র হলে পাখি শিকারে যাবেই। মামা থাকেন শ্রীমঙ্গল। ফুলতলি টি এস্টেটের ম্যানেজার। সিলেট শহর থেকে আশি-পঁচাশি মাইল পথ। চাচার গাড়িতেই ওদের যাওয়া হবে। লেদু চাচা মানেই গাড়ির ব্যাপার। আর ড্রাইভিংয়ে চাচার নেই কোন ক্লান্তি এবং আপত্তি, আত্মীয়-স্বজন পাড়া-পড়শি যে সেখানে জরুরি প্রয়োজনে যাওয়ার দরকার পড়লে লেদু চাচাকে জানাতে পারলেই মোরগের ঝুঁটি রঙের পাজেরো নিয়ে হাজির। চাচার সঙ্গে বাবলুর ভাব জমেও। গাড়িতে উঠেই শুরু হয় রাজ্যির গল্প।
ড্রাইভিং করতে করতে চাচা শোনান কোথায় কোন দেশে গিয়েছিলেন। কি বিপদ ঘটে, কিভাবে বেঁচে যান, কোন্ দেশের আচার আচরণ কেমন, কোন দেশের মানুষ বিষধর সাপ খায়। কুকুর খায়, ইঁদুর খায় সেসব নানা মজার অভিজ্ঞতার গল্প। বাবলুর আব্বু যতোই বলুক- লেদু, গাড়ি ড্রাইভিং এর সময় অতো বক বক করো না। আর তুমি ম্যালা বক বক করে আমাদের কান দুটো পচিয়ে দিচ্ছো। ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ রাখো। এক্সিডেন্ট বলে কয়ে আসে না। আর শুধু তো তোমার ভুলের জন্য হবে এমনতো নয়, অন্যের ভুলের জন্যও ঘটতে পারে। তাই ড্রাইভিংয়ে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। ‘জবাবে চাচা বলেন, ‘ভাইসাব কিতা যে বলেন, আমার এইটা অভ্যাস হইয়া গেছে। ড্রাইভিংয়ের সময় কথা বলিলে আমার কোনো সমুস্যা হয় না।’ হিরক বিলক্ষণ জানে, লেদু তার কারণ শোনার লোক না। বাবলুও জানে চাচা আব্বুর কথায় খামোশ হবার পাত্র নয়। রেহেনা বলে- লেদু ভাইয়া। একদম চুপ করতে বলি না, তার একটু কম কথা বললে ভালো হয়।’ ‘জি-ভাবী, জি-ভাবী’ বলে লেদু চাচা এক গাল হাসি দেবে। তিন. ছোট মামার টি-এস্টেটের উদ্দেশে ওরা রওনা হলো। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা লাগে লাগে। সূর্যটা লাল হয়ে আবির ছড়িয়ে দিয়েছে সমস্ত প্রকৃতিতে। গাছপালা লালায় চিক চিক করছে। বাসায় সবাই ছাড়তেই চায় না ওদের। ফেরার পথে আবার উঠবে এমন কথা দিয়ে তবেই ছাড়া পাওয়া। বাবলুর একমাত্র ফুপি সিলেট শহরে থাকেন। টিলাগড়। তার ছেলেমেয়ে নিয়ে এ দু’দিন বাপের বাড়িতে কাটায়। সেও চোখের পানিতে বিদায় জানায়। বাবলুর ফুপির একটা মাত্র মেয়ে পিচ্চি সারা। তিন বছর বয়স সেও চোখের পানি ফেলে বলে আর কয়টা দিন থাকি যাও। বাবলু শোনা ভাইয়া। কী যে মায়াবী চেহারা সারার। ডাগর ডাগর চোখ, লম্বা লম্বা চুল। চুলের দুটো করে প্রজাপতি কিরূপ। মনে হয় তাজা দুটো প্রজাপতি বাগান থেকে উড়ে এসে সারার ছোট্ট মাথায় বসেছে। তবু সবাইকে সালাম জানিয়ে তারা বিদায় নেয়।
পেছনে পড়ে থাকে দু’দিনের কিছু মজার স্মৃতি। লেদু চাচার গাড়ি ওদের বাহন। ঘণ্টা দুয়েক চলার পর ওরা চলে এলো শ্রীমঙ্গল। দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট আর তার রাজধানী হলো এই শ্রীমঙ্গল। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ শ্রীমঙ্গল। আধা ঘণ্টা চলার পর একটা চা বাগানের ভেতর ওদের গাড়ি এসে পড়েছে। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। দু’ধারে সবুজ টিলা। সবুজ কার্পেটের মতো চা বাগান। চা-বাগানের ভেতর ওরা চলছে। এটা বিখ্যাত ফিনলে চা-বাগান। রাস্তা তেমন ভালো না। ব্রিক সয়লিং। কোথাও কোথায় ভাঙাচোরা। উঁচু-নিচু। চা-বাগানের মাঝে মাঝে লম্বা গাছ। চা-গাছের উপকার করতেও গাছগুলো লাগানো। চা-গাছ চায় ছায়া এবং বৃষ্টি।
বৃষ্টি শুধু হলেই হবে না পানি দাঁড়াবে না তার গোড়ায়। তাই ঢালু ভূমিও চাই তার। এই ঢালু ভূমির জন্য উঁচু টিলার গায়ে ওদের রোপণ করা। এই উঁচু উঁচু গাছের জন্য চা বাগানের ভেতরে চলাচলের পথটা থাকে অন্ধকার। দিনের আলো নিবে গেলে হয় ঘুটঘুটে অন্ধকার এখন সন্ধ্যা উতরিয়ে রাতে প্রবেশ করছে। বনে রাস্তা খুব অন্ধকার। গাড়ির হেডলাইট সেই নিকষ কালো অন্ধকার কেটে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু অন্ধকার। হিম পড়েছে প্রচুর। কুয়াশা পড়ছে চিকন বৃষ্টির মতো ধারায়। বেশ শীত করতে থাকে গাড়ির ভেতরই। অথচ সিলেট শহরে এই বজ্জাত শীতটা এখনো ঢুকতে সাহস পায়নি। রাতে একটা কাঁথা চাপিয়ে দিব্যি রাতটা পার করেছে। ‘চাচা, শীতটা খুব মজার। এমন হিম রাতে গরম ভাঁপা পিঠা খেতে দারুণ। আর বন মোরগের ভুনা গোশত দিয়ে চুঙ্গা পিঠার সোয়াদ তুলনা হয় না কিছুর’ বাবলু বলল। ‘আমার জিভে পানি এসে গেল।’ ইমা বলল। ‘হি হি হি হি হি শীতটা কী মজার, তাই না ইমামণি?’ বাবলুর মুখে হাসি। ‘চাচাজী, ঐ যে বলিলা চুঙ্গা পিঠা, আর বন মোরগের গোশত, ইতা তোমার মামার বাসায় মিলবো আশা করি। ম্যানেজার সাবরা রাজা বাদশার মতো থাকঐন। ম্যানেজার সাব অর্ডার দিলে বাঘের ঘি পর্যন্ত পট্টাতকরি আনিয়া হাজির করঐন। তান কর্মচারী হগল’। লেদু চাচা বললেন। হি .. হি .. হি .. হি.. হি.. ইমার হাসি। তুমুল হাসি। ইমা লেদু চাচার কথায় মজা পেয়েছে। ‘চাচা, খরগোশের রোস্টও খাবো। খরগোশের গোশত যা তুলতুলে নরম, একদম মাখনের মতো। টপাটপ খাও আর ঝালে উহ আহ করো। আর ঝালটা একটু বেশি হলে নাক দিয়ে পানি। পানি থেকে সর্দি । কী মজা। ‘আম্মু, এবার আমি মামার সঙ্গে পাখি শিকারে যাবো না?’ বাবলু বলল। ‘তা যেয়ো, বাঘ শিকারে যেয়ো, তার আগে জ্যাকেটা পরো। আর আমরা এসে গেছি প্রায়। গাড়ি থেকে নামামাত্র বরফের কুঁচির মতো কুয়াশা মেশানো শীত আমাদের জাপটে ধরবে।’ রেহানা বলল। শীত কী ভূত আম্মু?’ ইমার ভয় ভূতের। ভূতের গল্প শুনে শুনে। ‘ভূতের চেয়েও অদ্ভুত!’ রেহানা হাসতে হাসতে বলল।
হি….হি…হি…হি… হি .. ইমা হাসে। রেহানাও হাসতে থাকে। হিরক ও তার হাসির সঙ্গে একটু কাশি মিশ্রিত হাসি যোগ করে। খুক খুক খুক খুক… বাবলু তার মায়ের হাত থেকে জিনসের জ্যাকেটটা নেয়। গায়ে আগেই একটা সোয়েটার চাপিয়েছে। তবে জ্যাকেটটা জিন্স হলেও ভেতরে নরম ভেলভেটের একটা পার্ট আছে। ক্যাপ আগেই পরেছে। এবার জ্যাকেট চাপলে শীতকে প্রতিহত করা যাবে। ‘আমাকেও কিছু একটা দাও।’ বাবলুর আব্বুর আকুতি। ‘আসার সময় বললে শুধু সোয়াটারে চলবে। কোর্ট নিলে না, এখন শীত খাও।’ রেহানা কৃত্রিম রাগ দেখায়। ‘নাও, আমার কাশ্মিরি আলোযানটা জড়াও।’ রেহানা বলল। রেহানা তার আলোযানটা যে কাশ্মিরি এটা জানান দিতে কখনো ভুল করে না। এটা তার স্বভাব। যে জিনিসটা যেখান থেকে খরিদ করে ঐ জিনিসের সঙ্গে ঐ দেশের নামটা সে স্মরণ করবে। এ আলোযানটা গত বছর খোদ কাশ্মির বেড়াতে গিয়ে হিরক কিনে দিয়েছিল। তেমনি আগ্রায় গিয়ে একটা সাউথ ইন্ডিয়ান বেনারসি শাড়ি কিনে দেয়, ওটার নাম আগ্রার বেনারসি। চার. বাবলুদের গাড়ি ফুলতলি চা বাগানে মাথা ঢোকালো। চারদিকে ঘুট ঘুটে অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ পোকারা আলো জ্বেলে সেই নিকষ আঁধার দূর করতে ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। বনের ভেতর থেকে পউত-পউত-পউত- পউত- লক্ষ্মী পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে। রাত অবশ্যি বেশি নয়। মাত্র সোয়া আটটা। চাচার রেডিয়াম ঘড়িতে দেখে নেয় বাবলু। ‘খুব জলদি আসিয়া গেলাম ভাইসাব! আমারে থ্যাংস দ্যান ভাবীসাব।’ ‘হুম! তুমি ড্রাইভার হিসাবে তো ক্লাস ওয়ান- তুমি যেভাবে চালাও না- একদম ওয়েস্টার্ন মুভির হিরোদের মতো- ‘লেদু ভাই, তুমি এমন চালাতে শিখলে কিভাবে?’ রেহানা একটু প্রসঙ্গ টেনে নিলো।’ ‘ভাবীসাব, কিতা যে বলেন, লন্ডন শহরে গাড়ি চালাইয়া আমি সাদা চামড়ার লোকদের তাক লাগাইয়া দিচ্ছি। লন্ডন শহরে অবশ্য মেয়েরা গাড়ি চালায় খুব সুন্দর ভাবী।
আপনারে আমি ড্রাইভিং শেখাইব, আপনি শিখাবেন নি? লেদু বলল। ‘অবশ্যই শিখব। যদিও আপনার ভাইয়ের গাড়ি নাই। তবে দুই-চার বছরের মধ্যে আমরা গাড়ি কিনবো। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া আসা ইত্যাদি কাজে গাড়ি খুব দরকার। রেহানা হেসে বলল।’ ‘এই যে ভাবী দেখেন আমার ব্রিটিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সটা।’ ‘থাক থাক লেদু ভাই, দেখতে চাচ্ছি না- আপনার হাত খুব পাকা।’ রেহানা বলল। ‘ভাইসাব, জানুইননি ঐ লাইসেন্সই আমার একমাত্র ভরসা। আর করি নাই। কি হবে লাইসেন্স করে? ঘুষ দিলে যে দেশে লাইসেন্স মিলে এইটা দিয়াই চলি-ফিরি। ট্রাফিক সার্জেন্ট আটকাইলে দেখাই, ভূত দেখার মতো চমকিয়া উঠে সালাম ঠুকে তিনট্ াহে : হে: হে: হে: … ‘তিনবার ঠুকে কেন চাচা?’ বাবলু জানতে চায়। ‘একবার ঠুকে ব্রিটিশ ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য। আরেকবার ব্রিটিশ সিটিজেন হিসাবে। আর আরেকেবার বাঙালি হইয়া, আমি এতো কিছু জানি। হে . হে … হে .. হে..’ ‘রিয়েলি চাচা, জ্যু আর গ্রেট।’ বাবলু বলল। ‘গাছগাছালির মধ্যে চিকন রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছো লেদু- একটু সমঝে চালাও।’ হিরক বলল। ‘কী অন্ধকার বাবা! অমাবস্যার রাতনি?’ লেদু গাড়ি চালাতে চালাতে বলল। ‘না, অমাবস্যার রাত না। শীত জেঁকে বসেছে দেখছি কঠিনভাবে।’ হিরক ‘গাছগাছালি রঙ হইতেছে সবুজ, ডিপ, গ্রিন। সবুজের সঙ্গে অ্যাশ মানে ধূসর মিলাইলে হয় কালো তাই এমন গভীর অন্ধকার।’ আবার লেদু বলল। ‘কিসের শব্দ হচ্ছে চাচা?’ ‘অন্ধকারের শব্দ অন্ধকার রাতের মধ্যে শব্দ কানে বেশি শোনা যায়। রাতের শব্দ বহুদূর যায়। তা ছাড়া পশুপাখির ডাকতো আছেই।’ হিরক বলল। এমন সময় গাড়ির সামনে একটা লাল আলো ফুটে উঠল। লাল আলোটার কাছে আসতেই দেখা গেল হারিকেন হাতে একটা লোক। মাথায় ক্যাপ। খাকি রঙের জামা। গাড়ি ব্রেক করলো লেদু। ‘সিলট থাকি সাব হগল আইরায়নি?’ জিজ্ঞেস করে বাতিঅলা। ‘অয় গো পাহারাদার, ম্যানেজার সাহেবের বাঙলো কতদূর?’ লেদু গাড়ির জানালার গ্লাস নামিয়ে জিজ্ঞেস করে। ‘দূরই না। আগে বাড়ান। লোক আছে, পথ দেখাইব।’ বাতিঅলা বলল। বোঝা গেল ম্যানেজার সাহেবের লোক। পাহারাদার। রাতে বাগান পাহারা দেয়া ওদের কাজ। লেদু যদিও এর আগে বার দুয়েক এখানে এসেছে। কিন্তু এই ফুলতলি চা বাগানের পথঘাট তার মনে নেই। তিন-চারটে বাগান পর পর। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়ে। নানা পথে ঢোকা যায়। আবার বের হওয়া যায়। আরো কিছুদূর গাড়ি এগোই আরেকটি লাল আলো জ্বলে উঠলো। ডানে বাঁয়ে কাঁপছে। বাবলু আন্দাজ করে আগেরটার মতো পাহাদারের বাতি। যথারীতি বাতি ধরা পাহারাদের কাছে গাড়ি থামায় লেদু।
জানালা খুলে গলা বের করে লেদু চাচা। জিজ্ঞেস করে- ম্যানেজার সাহেবের বাংলো কোন দিকে? বাতিঅলা গাড়ির খুব কাছে এসে সালাম ঠুকে- ‘সেলাম বাবু- সেলাম। বাম দিকে যাউকা সাব।’ হাত উঁচিয়ে ট্রাফিক পুলিশের কায়দায় দেখিয়ে দিলো পাহারাদার। অন্ধকারে পাহারাদার বেটাকে ঠিক দেখা গেলে না। মাথায় মানকি টুপি এরকম কিছু পরা। মুখটাও পুরো প্রকাশিত নয়। শীতে ঠক ঠক কাঁপছে। গায়ে খাকি রঙের জামা-কাপড়। লেদু চাচা সাঁই করে গাড়ি বাম দিকে ঘুরায়। গাড়ি ঘুরাতে চাচার দক্ষতা সত্যিই অপূর্ব। ইংলিশ ছবির দুর্ধর্ষ নায়কের মতো। আরো খানিক পথ গাড়ি চলতে চলতে আরেকটি লাল আলো জ্বলে ওঠে সামনে। এবারও চাচা বাতিঅলার কাছে এসে গাড়ি থামায়। পাহারাদার এসে সালাম ঠুকে পূর্ববৎ। একই কায়দা। একই পোশাক। শিয়াল রঙের ড্রেস। হাতে বাতি আর বেতের লাঠি। ‘সিলেটের মেমান আপনারা?’ গম্বীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে পাহারাদার। ‘ম্যানেজার সাহেবের বাংলোতে যাইমো।’ লেদু চাচা গাড়ির গ্লাস খুলে বলল। ‘জিয়ো সাব, আপনারা আসিয়া পড়ছেন। এই রাস্তায় একটু সামনে গিয়ে পাইবা একটা উঁচুমুখী রাস্তা। ঐ রাস্তা ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া উঠি গেছে বাংলোত। লাইট জ্বলে একটু পর পর। কোনো সমস্যা আইতো নয়। পাহারাদার লোকটা বলল। বোঝা গেল এসব ম্যানেজার মীর্জা খবিবের করা। পথ ভুল করে কোনো তকলিব যাতে না হয় তাদের। উঁচু রাস্তার মুখে এসে গাড়ি থামায় লেদু চাচা। তারপর গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে একসিলেটার চাপ দিয়ে স্পিড বাড়িয়ে মাথা সোজা করে গাড়ি উঠতে থাকে। এঁকে বেঁকে হেলে দুলে গাড়ি উঠতে থাকে। অর্ধ চন্দ্র্রকারের একটি পথ পেরিয়ে উঠে আসে বাংলোর গাড়ি বারান্দায়। ফুলে ফুলে সাজানো বিরাট লন। গাড়ি বারান্দায় লতা পাতার গাছ। অপরাজিতা ফুল কয়েক রঙের । আলো আছে। তবে খুব ফকফকা আলো নয়। সিঁড়ির দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল পোশাকধারী দু’জন। নাইট গার্ড গোছের। গাড়ির শব্দ শুনেই পটাপট ঠাস ঠাস, মাটি কাঁপানো স্যালুট ঠুকে দিলো দুটো। তারপর দৌড়ে এসে গাড়ির দরোজা খুলে দিলো। প্রথমে বের হলো বাবলু। তারপর হিরক চৌধুরী। তারপর ইমা। লেদু চাচা সিট বেল্ট খুলে তারপর বের হলো। সবশেষে রেহানা। শোরগোল পড়ে গেল। ‘মেমান আইছুন। মেমান আইছুন।’ এমন সময় হাজির হলো মীর্জা খবির। মাথায় ক্যাপ। ওভারকোট পরা। গোয়েন্দা গোয়েন্দা ভাব। ‘কী আপু, খুব কষ্ট দিয়ে ফেললাম?’ হাসতে হাসতে খবির বলল। প্রায় হাফ ডজন কাজের লোক ব্যস্ত হয়ে পড়েছে কে কোন মালপত্তর হাতে নিয়ে মেহমানদের সেবা করবে। খুব একটা মালপত্তর নেই সঙ্গে।
একটা স্যুটকেস। জার্নি ব্যাগ দুটো, ওয়াটার পট। ফ্লাস্ক আর দুটো ছোট ছোট ব্যাগ। তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি করে নিয়ে গেল। বোঝা গেল ম্যানেজার সাহেবের হুকুম বরদারের সংখ্যা কম নয়। ‘কিরে কেমন আছিস, খবির?’ রেহানা জিজ্ঞেস করে। ‘ভালো জাঙ্গল লাইফ। তোমাদের সমাজ থেকে দূরে। শান্তিতে আছি। তবে ইদানীং দস্যু-টুস্যু ছাড়াও অন্য উপদ্রব খুব বেড়েছে। খবির বলল। ‘কী সেটা?’ রেহানা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চায়। ‘পরে বলব। কেবল ঢুকেছো আমার বাড়িতে। মেহমানদারি করে নিই, তবে না অপ্রিয় প্রসঙ্গ।’ খবির হাসতে হাসতে বলল। ‘বুঝেছি ভায়া ভয় টয় করার মতো উপদ্রব আর কি।’ হিরক বলল। ‘দুলাভাই, খালি ভয়ের শঙ্কায় মরে গেলেন- না না কোন ভয় টয় নেই।’ হিরক আশ্বস্ত করে। পাঁচ. রাতে আর তেমন কিছু ঘটলো না, সবাই টায়ার্ড। বেশি পরিশ্রান্ত রেহানা বুঝি। এসে সারাক্ষণ উহ আহ করছে। গরম পানিতে হাতমুখ ধুয়ে বাগানের গরম গরম টাটকা পাতার চা নাস্তা গিলে রাতের খাবার না খেয়েই চিৎপটাং বিছানায়। এ ঘোষণা দিয়েছে তাকে যেনো ডাকাডাকি না করা হয়। ঘরে ঘরে হিটার আছে। প্রচন্ড শীত থেকে বাঁচার জন্য। রেহানাদের থাকার জন্য যে ঘরটা বরাদ্দ করা হয়ছে তাতে হিটার জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। শীতটা এখানে তীব্র বলেই মনে হয়। তবে এসব কোনো সমস্যা নয়। সেবা দানের জন্য ম্যানেজার সাহেবের বাসায় লোকের অভাব নেই। মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ওরা। কোনো কথা মুখ থেকে পড়তেই টুপ করে তা লুফে নেয়। কতো জলদি তা পালন করা যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে সমস্যা হয় ভাষা নিয়ে। বাবলুরা ওদের ভাষা বুঝে না। ওরাও বুঝে না মেহমানদের কথা। অবশ্য ভাষার সমস্যা মিটাতে এদের মধ্যে একজন একটু শিক্ষিত মহিলা আছে, নন্দিনী। সে ওদের লিডার। বুঝিয়ে দেয় মেহমানদের কথা। বাবলুর এখানে এসে বারবার মনে হতে থাকে এ বাসায় বুঝিবা রিমোট কন্ট্রোলে সব কিছু চলে। এ রিমোট কন্ট্রোলার হলেন মামী। মামা নন। মোটাসোটা গোলগাল চেহারা সুন্দর ফর্সা রঙের মামীকে ভীষণ শাহি মেজাজের মহিলা বলে মনে হয়। চেহারায় খানিকটা জাপানিজদের মতো ছাঁট আছে। নাক চ্যাপ্টা। চোখগুলো ছোট ছোট মেজাজ তিরিক্ষি সব সময়। হবে না কেন, ওমন হাফ ডজন ত্বরিৎকর্মা কাজের লোক যদি সব সময় ম্যাডাম ম্যাডাম বলে ঘুর ঘুর করে হুকুম তামিলের জন্য। তাহলে তার মেজাজ শাহি ধাঁচের হতে বাধ্য। এসব কাজের লোক কিন্তু বাগানের কুলি। বাগানের খাতায় এদের নাম কুলিদের কাতারে। বেতন বা রোজ তারা পায় বাগানের কুলি হিসেবে। এদের বাগানে কাজ করতে হয় না। অফিসে গিয়ে এক হপ্তাহ পর পর রোজ তুলে আনে। আর সেবা দান করে ম্যানেজার সাহেবকে। ওদের ভাষায় বড় বাবুকে। বাসায় কাজের লোকদের ডাকাডাকিতে কলিংবেল সিস্টেম করা। অবশ্য যথার্থ ব্যবস্থা বটে। বিশাল টিলার ওপর দোতলা বিরাট বাংলো বাড়িতে কে কতো দূর কোথায় তাকে গলা ফাটিয়ে ডেকে কী লাভ! এতে গলা কম্ম সাবাড় হবে শুধু। তাই কাজের লোকদের অবস্থান বেল ফিট করা। বেলবাজলেই এসে হাজির। বেলগুলো বিমোট কন্ট্রোল সিস্টেম।
স্থানান্তর করা যায়। কল করার পাঁচ মিনিটের মধ্যে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হলে নাকি মিসেস মলির পক্ষ থেকে শাস্তি বরাদ্দ থাকে। বকাঝকা তো আছেই। এসব বাবলু মামাতো বোন অর্থীর কাছে শুনেছে। বাবলুর মনে হতে থাকে মামার মতো এমন ভদ্র শান্ত মেধাবী লোক বাজখাঁই টাইপের স্ত্রী পেয়েছেন। মামীর গলার আওয়াজ স্কুলের পিটি করান লিলি ম্যাডামের মতো। তবে লিলি ম্যাডামের হাসিটা খুব মিষ্টি। মামির হাসিটা হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক। মামার এক মাত্র পুঁচকে মেয়ে অর্থী। দেখতে মামার মতো। ডাগর ডাগর চোখ। রঙ শ্যামলা। লম্বা লম্বা চুল। ভীষণ মিষ্টি। অল্প সময়ের মধ্যে ভক্ত হয়ে পড়ে বাবলু ভাইয়ার। ইমার বন্ধু বনে যায়। আর হবে না কেন। অর্থীর জন্য ঢাকা থেকে দুটো মজার খেলনা সঙ্গে নিয়ে এসেছে বাবলুরা। জামাও এনেছে। তবে ড্যান্সিং ডল আর ব্যাটারি চালিত ট্রেন পেয়ে অর্থী খুশিতে আত্মহারা।
এগুলো পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ ইমাকে নিয়ে খেলেছে। অর্থীর বয়স সাড়ে তিন কি চার। স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। কিভাবে করবে, গার্ডেনে তেমন ভালো স্কুল নেই। তাই মামা অর্থীকে স্কুলে ভর্তি না করিয়ে বাসায় পড়ান। একজন মাস্টারনি রাখা আছে শিলা দিদি। সপ্তাহে পাঁচ দিন এসে ঘণ্টা দুয়েক পড়ায়। আর মামী তো আছেনই। এ বি সি ডি, অ আ ক খ ছাড়াও গান আঁকাআঁকি মামীই শেখান। মামী এক সময় গান, ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। বাবুরা শুনেছে। অর্থী কিন্তু পাকা বুড়ি। রাজ্যির খবর রাখে। চোখ মুখ নাচিয়ে মাথা নেড়ে কথা বলে। সবাই হ্যাঁ করে শুনতে চায়। ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। টেবিলের ওপর রাখা অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে উঠলো। বাবলুর চোখ পড়লো ঘড়ির কাঁটার দিকে। রেডিয়াম দেয়া ঘড়ি। রাত দশটা বাজে। শীতকাল হিসেবে রাত গভীর। তা ছাড়া ক্লান্তিটা আস্তে আস্তে টের পাওয়া যাচ্ছে। বিছানা টানছে। পৌষেই মাঘের শীত। আর মাঘের শীত বাগের গায়ে। সবার বিছানায় দু’দুটো ডাবল সাইজের কম্বল দেয়া। এসব কম্বল (ব্লাংকেট) সরাসরি ইংল্যোন্ড থেকে আমদানি করা। পশমি। বেশ গরম কোম্পানির মালিক ব্রিটিশ, নাম লর্ড মরিসন। মরিসন তাঁর কোম্পানির অনেক ব্যবহার্য জিনিসপত্র ইংল্যান্ড থেকে পাঠান। তিনি ভিন দেশের জিনিসের ওপর আস্থাশীল নন। মামা একদিন বাবলুকে জানান। বাবলু ইমা মনি অর্থী মনি বিছানায় গরম কম্বলের ভেতর শরীরে অর্ধেক পাচার করে বসে গপ্পো করছিল জম্পেশ করে। অর্থী কথক। বাবলু ইমা শ্রোতা। যতোসব ভয়ের গপ্পো বলে বাবলু ভাইয়া ইমা আপুকে ভয় দেয়ার চেষ্টা। জানো বাবলু ভাইয়া, আমাদের বাগানে না বাঘ আছে। সেদিন রাতে হয়েছে কি, একটা বাঘ কু কু রবে বিকট চিৎকার করে।
আমাদের বাংলোর কাছে। ঢুকতে চেষ্টা করে। অনেক রাত তখন। আব্বুর ঘুম ভাঙে। আম্মুর ঘুম ভাঙে। আমিও জেগে উঠি। বাসায় কাজের লোক সবাই। আব্বু বন্দুক দিয়ে ঠাস ঠাস গুলি করে। কিন্তু কোথায় বাঘ, রাতে দেখা যাচ্ছিল না। আমি ভয়ে আম্মুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলি। আম্মু বলেন চুপ চাপ কাঁদলে বাঘ এসে যাবে। আমি কান্না বন্ধ করি। ‘অর্থী, মামনি, চলো শুতে যাবো।’ মামী এসে হাজির। অর্থীকে আগেই খাইয়ে দেয়া হয়েছে ছোট বলে। এতো রাত পর্যন্ত সে জেগেও থাকে না। বাবলুদের পাল্লায় পড়ে গেছে। ‘আরো একটু থাকি ভাইয়া আপুর সঙ্গে আম্মু। আদুরে কণ্ঠে বলল অর্থী। ‘কিন্তু রাত তো বসে নেই মামনি। অনেক রাত। কাল সকালে বাকি গল্পো বলো কেমন। ’ অর্থী কম্বল থেকে পুরো দেহ বের করে আনে গুটিসুটি। মামী দু’হাত বাড়ান। অর্থীকে কোলে তুলে নেন। রাতের বেলায় অর্থীকে কেউ মেঝেতে পা ফেলতে দেয় না। ভয়ে কাতর থাকে। ‘তোমরাও ওঠো বাবা-মা। খেতে যাবে।’ মামী বললেন। মামার বাসায় কিছু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা চালু। খাওয়া দাওয়া ব্যবস্থা মেঝেতে। নিচতলায়। মোটা ইরানি কর্পোটের ওপর ছোটো ছোটো কাঠের জল চৌকি রাখা। খান আষ্টেক দুই সারিতে রাখা। মাঝে একটা নিচু লম্বা চৌকিতে সারি সারি সাজানো খাবার। প্রাচীন কালে বন্ধে জাপানিরা এভাবে খাওয়া দাওয়া করতো নাকি। মামা জাপান গিয়ে দেখেন এখনো জাপানিরা কেউ কেউ এই রীতি বজায় রেখেছে। মামার পছন্দ হয় ব্যবস্থাটা। নিজের বাসায় চালু করেছেন। একজন সহকারী বাবুর্চি গারো মেয়ে খাবার পরিবেশন করে। খাবার গরম থাকার জন্যও সুন্দর ব্যবস্থা। চকচকে স্টিলের ডিশের নিচে ছোট ছোট স্পিরিট ল্যাম্প ফিট করা। এসব শুধু মামা নয় মামীর পছন্দেরও বিষয়। উভয়ের চয়েজের ওপরই শাহি মেজাজের কায়দা কানুন চালু হয়েছে তা বুঝা যায়। মামা জাপানে ছিলেন কিছু দিন। টি প্ল্যান্টেশনের ওপর পড়াশানা করেছেন। সূর্যোদয়ের দেশ জাপান মামার প্রিয় দেশ। তাই চালচলনে জাপানিদের মতো অনেক কিছুই অনুসরণ করেন। মামা বলেন জাপানিদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
‘মামা, পাখি শিকারে যাবো। ’ বাবলু খেতে বসে বলল। ‘পক্ষী শিকারে তো আমরা যাইবো। ভাইসাব তো পক্ষী শিকারে ওস্তাদ।’ লেদু চাচা বললেন। ‘কবে যাবে?’ খবির বাবলুর দিকে তাকিয়ে জানতে চায়। ‘কালই মামা।’ পা নাচাতে নাচাতে বাবলু বলল। ‘পা নাচাবে না বাবলু।’ রেহানা বলল। ‘স্যরি!’ একবার আব্বু আরেকবার আম্মুর দিকে তাকায় বাবলু। ‘কিন্তু বেড নিউজ বাবলু সাহেবের জন্য। আমাদের গার্ডেনে এক টাইগার আঙ্কেল ভিজিট করছেন এখন। তার অনারে পাখি শিকারের প্রোগ্রাম দু-একদিন পিছিয়ে দিই কেমন। বলা তো যায় না, টাইগার কখন কোথায় হাজির হয়। অবশ্য আমাদের শিকারে স্পট দূরে তবুও । খবির বলল। ‘সত্যি টাইগার, মামা। অর্থী বলছিল। বিশ্বাস করিনি তখনো। ‘সত্যিটা বলছ অর্থী, টাইগার মানে, চিতাবাঘ লিউপার্ড একটা গার্ডেনে ঢুকে পড়েছে। গম্বীর কণ্ঠে বলল মামা। ‘এখানে চিতাবাঘ এলো কিভাবে। কী বলছো হে খবির। এতক্ষণ পর মুখ খুললেন আব্বু। বাবলু তাকায়। ‘ঠিকই বলছি দুলাইভাই, আপনাদর ফেঞ্চুগঞ্জের মতো কম হিলি অঞ্চলে যদি চিতাবাঘ আসতে পারে। এখানে পারবে না? আমাদের লাউয়া ছড়া জঙ্গলে ভালুক পর্যন্ত আছে।’ খবির বলল। ‘তাহলে ভায়া আমরা তাহলে বাঘের কবলে পড়েছি দেখছি। এখানে বেড়াতে আসাটাই ঠিক হয়নি।’ হিরক চিন্তিতভাবে বলল। ‘দুলাভাই ভয় পেলেন? আপনি না সিপাহসালারের বংশের লোক। এতো অল্পেই ভীত? ভয়ের কিছু নেই। মানুষ আজ মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। ভীতিকর। দু’জন পাহারাদার বাংলোতে উইথ গান বসিয়েছি। হোল নাইট পাহারা দেবে তারা। এরা বাঙালি না। খাঁটি তামিল। সিদ্ধালিঙ্গা সুখনলান। বাঙালি হলে ফাঁকি দিতো। পাহারা না দিয়ে। যান নাক ডেকে ঘুমান গিয়ে। সকালে বাঘের ব্যাপারে কি করা যায় ভাববো। খবির বলল। খাওয়া শেষ করে খবির উঠে গেল। হিরক রেহানা বাবলু ইমারা পরে উঠলো। ছয়. প্রতি বছর শীত পড়লে যা হয় টি গার্ডেনে সে রকম ঘটনা ঘটেছে। সকাল টিল্লা বাবু সুখেন বাবু এসে বিস্তারিত ম্যানেজার স্যারকে জানান। টি এস্টেটের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গাছড়া নামে একটি ছড়া আছে। স্থানীয় লোকেরা মনে করে মা গঙ্গা নদীর সঙ্গে এই ছড়ার সম্পর্ক আছে। সে রকম একটা গল্প চা বাগানের কুলিদের মধ্যে প্রচলন আছে। বহু আগে এলাকায় খুব পানির সঙ্কট ছিলো। আশপাশ কোনো বন বা বিল হাওর কিছু ছিলো না। এলাকার লোকেরা গঙ্গাপূজা দিতে থাকে বারবার। একবার এক পূজারি একটি কুয়ার পাশে সকালে স্নান করছিল। এমন সময় গঙ্গাদেবী উপস্থিত হয়ে তার সামনে পূজারি দেবীকে প্রণাম করার উদ্দেশ্যে দুই হাত মিলিত করে মাথা নত করে মঙ্গল বাক্য উচ্চারণ করতে থাকে। কিছুক্ষণ মন্ত্র উচ্চারণের পর মুখ তুলে দেখে দেবী হেঁটে চলে যাচ্ছে। যে পথে যাচ্ছে সেই পথেই পানি কলকল বয়ে যাচ্ছে।
সে গল্প থেকে এ ছড়ার নাম গঙ্গাছড়া। সেই ছড়ার পাশে সকাল ৮টা সাড়ে ৮টার দিকে কুলিরা জড়ো হয়ে কেউ ¯œান, কেউ পানি ভরছিল কলসিতে। এমন সময় হঠাৎ একটা চিতাবাঘ কোত্থেকে এসে হাজির। পাশেই বন জঙ্গলের টিলা। সেখান থেকে বোধ হয় এসে পড়লো। পড়ে যায় হুড়োহুড়ি, হুলস্থূল কান্ড। দৌড়াদৌড়ি। পরে জানা যায় বাঘ একটা গরুও সাবাড় করেছে। টিলার ওপাড়ে বিছায় ছোট (ক্ষেত) পাওয়া গেছে অর্ধভুক গরু। শোনা যাচ্ছে এবারের বাঘটি আদম থেকে নাকি! এবার গরু নিয়ে টানাটানি করেছে। কখনো আস্তা মানুষ পেটে চালান করে সেই ভয়ে ভীত বাগানের কুলি কামিনরা। সুখেন যেসব বিষয় বিস্তারিত ইনিয়ে বিনিয়ে মীর্জা খবিরকে জানান। ‘কুলিদের গরু-ছাগলগুলোর খবর কী?’ খবির জানতে চায়। ‘স্যার, ওরা ঐ ঘটনার পর দলে দলে গরু-ছাগল গ্যারেজে আনিয়া বান্ধিয়া রাখেন। ’ সুখেন ধীরে ধীরে বলল। ‘এমনিতে আমরা চা পাতা যখন খায় তখন গরুর মুখ সামলিয়ে রাখে না- এখন বুঝি গ্যারেজে এনে বান্ধে?’ মীর্জা খবির মুচকি হাসে। ম্যানেজারে বাংলো খুব উঁচু টিলার ওপর। তার সামনেই তিন নম্বর সেকশন। এর পাশেই গঙ্গাছড়া বয়ে গেছে। বাঙলো থেকে ছড়া দৃশ্যমান। ওখানেই বাছাধনের যখন আনাগোনা বাংলোর পূর্ব দিকে খানিকটা সমতল ভূমি। কচুরমুখী, আলু, শাকসবজি চাষ করায় মীর্জা খবির। তারপরই ক্রমশ ঢালু হয়ে খাদে গিয়ে মিশেছে। পরশুদিন ডাক শুনেছে শুধু। ডাক শুনেই ঐ গভীর রাতে গুলি ছুঁড়ে খবির। পরে অবশ্য বুঝতে পারে বাংলোতে নয়, বাংলোর সামনে খাদের নিচে কাটা মেহেদির বেড়ার বইরে লম্ফ ঝম্ফ করে বাঘটি। ডাক দেয় কু-কু। পরদিন থেকে তাই বাগানের দু’জন সাহসী পাহারাদার বাংলোতে সারারাত ডিউটি দিয়েছে। অন্ধকার দূর করতে কয়েকটি পাঁচ শ’ পাওয়ারের বাতিও ঝুলিয়ে দেয় বাংলোর চারপাশে। সুখেন দাসকে বিদায় করে চিন্তিত মুখে ভেতর ঘরে আসে মীর্জা খবির।
ঢুকতেই মলির মুখোমুখি। তেলে ছেড়ে দিলে যেভাবে ছ্যাঁৎ করে ওঠে, তেমনি হামলে পড়লো মলি। এদিকে সবাই খিদায় মরছে, সেদিক খেয়াল আছে- তোমাকে ছাড়া কেউ খাবে না।ছাবেও না! ‘ওহ-হো। বড্ড বেলা করে ফেললাম- ঘটনাটা শুনতে শুনতে দেরি হয়ে গেলে মলি।’ খবির নরম স্বরে বলল। ‘মামা, তোমার টাইগারের খবর কি’ বাবলুর প্রশ্ন। খবির কোনো জবাব না দিয়ে খাওয়ার টেবিলে এসে বসে। সাত. মামার অফিস দেখতে বাবলুর আবদার। তাই অফিসে আসার সময় গাড়িতে মীর্জা খবির বাবলুকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হলো। অফিসে ঢুকতেই দেখে বাগানের এক জঙ্গল নারী কুলি ভিড় করে আছে। কুলিরা এখানে কেন। খবির ভাবে। তারা থাকবে এ সময় বাগানে। গাড়ি থেকে নামতেই দৌড়ে আসে টিল্লা বাবু সুখেন দাস । হেড ক্লার্ক পরেশ আদৌলি রইয়ব। মীর্জা খবিরকে জিজ্ঞেস করতে হয়। এর আগেই সুখেন আদাব দিয়ে বলতে শুরু করে স্যার, তিন নম্বর সেকশনে কুলি সর্দার দুখিয়ার বাড়িতে চিতাবাঘে আক্রমণ করছুইন- ‘আক্রমণ?’ খবির ভীতকণ্ঠে বলে।
‘আক্রমণ মানে স্যার, দুখিয়ার বাড়িতে পর্যন্ত ধাওয়া দিচ্ছে স্যার, এখন ওরা সবাই আইচ্চে একটা ব্যবস্থা করতে-’ সুখেন হাত দিয়ে গোঁফে তা দেয়। দেহডা লিকলিকে গোঁফটা জেনারেল ওসমানীর। দুখিয়ারে আমার চেম্বারে পাঠান।’ আমি কথা বলব। খবির গটগট করে হেঁটে নিজের চেম্বারে এসে ঢুকলো। দরোজার পাশে টুলে বসা পিওন রমাকান্ত দাঁড়িয়ে আদাব দেয়। বাবলু ও মামার পেছন পেছন মামার চেম্বারে ঢুকে। বিশাল রুম মামার। বিরাট টেবিল। মাথা উঁচু চেয়ার। মামার বসার জন্য চেয়ারে পেছনে একটা বিশাল ছবি। ইংরেজ সাহেবের বলে মনে হয়। বাবলুও মামার সামনের সিটে চেয়ারে একটাতে বসল। ‘বাবলু মামা তুমি কি খাবে?’ খবির টেবিলের ওপর পাইলে মুখ রেখে জিজ্ঞেস করে।’ ‘কিছু খাবো না মামা। ’ বাবলুর জবাব। ‘তা কি হয়, মামার অফিসে এসে কিছু না খেলে আপু কি বলবে?’ মুখ তুলে বাবলুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল। ‘পেছনের ছবিটা কার মামা?’ বাবলুর প্রশ্ন আবার। ‘মরিসনের। এই বাগানের মালিক। এই বাগান ছাড়া আরো পাঁচটা বাগান তাঁর। ইন্ডিয়াতেও তার একটা বাগান আছে। প্রত্যেক বাগানের ম্যানেজারের চেম্বারে তাঁর ছবি টাঙানো বাধ্যতামূলক।’ খবির বলল। ‘কেন মামা?’ বাবলু জানতে চায়। কারণ সে জানে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি সাধারণ অফিসে থাকে।
‘তার কথা হচ্ছে, তিনি সশরীরে থাকতে পারেন না, ছবি দেখে আমাদের ভাবতে হবে তিনি আছেন, তাঁর নির্দেশ মোতাবেক সব কিছু চলবে।’ খবির হাসতে হাসতে বলল। ‘তিনি আসেন না কখনো?’ ‘বাহাত্তর সালের পর আসেননি। বয়স নব্বই পেরিয়ে গেছে। তাই বিমান ভ্রমণ তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর ছেলে হেরাল্ড মরিসন প্রতি বছর ডিসেম্বরে আসেন। এবারও আসবেন।’ বাবলুর সঙ্গে খবির যখন কথা বলছিল তখন পিওন রামাকান্ত এসে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। খবির সেটা পরে খেয়াল করে। ‘রামাকান্ত, বিশেষ রঙের চা আর নারকেল ভাজা নিয়ে এসো।’ খবির মানিব্যাগ বের করে একটা একশা টাকর নোট দিলো এগিয়ে। ‘
বিশেষ রঙের চা মানে?’ ‘আনলেই দেখতে পাবে।’ খবির হাসে। ‘ আর দুখিয়াকে পাঠাও; রামাকান্ত বের হওয়ার মিনিট ছয়েকের মধ্যে দুখিয়ার দরোজায় পর্দা সরিয়ে আত্মাপ্রকাশ করল। দু’হাত জোড় করে বলল- হুজুর সাব, আন্ধারমে আয়েঙ্গে? ‘এসো দুখিয়ার!’ ম্যানেজার সাহেব নরম স্বরে ঢুকতে বলল। দুখিয়া ঢুকে। হাত নামায়। দুখিয়া এই প্রথম বড় বাবুর চেম্বারে ঢুকছে। ঘাবড়ে গেছে তাই। ‘কি খবর দুখিয়া তোমার পঞ্জিতে বাঘ হামলা করলো নাকি?’ খবির দুখিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘হুজুর সাব, কাল রাতমে বাঘ আমারে খাইয়া ফেলিত- আমি আমার বহু (বউ) ঘরের মধ্যে ঘুমাইয়া আছি, আন্দাজ রাত দু-তিন বাজে, লছমি পরথম টের পাইন, খস খস খস খস খস খস আওয়াজ হোতা। হামার সবকা যো আঙিনা পার বেড়া হ্যায়, হুয়াস্ েলছমি হামারে ডাক দিলো, প্রিয়ারিকা বাপ, কই কুছ আঙিনা পার- আউর কিয়া বলা কুঁ -কুঁ- হু-ঁহুঁ জবরদস্ত এক আওয়াজ। মেরা আঙিনা পার দো তিন লাফ দিয়া। হাম ধরপরাকে উটপার লছমি কো পাকড়্যা। লছমি কি হামকো পাকড়া। ভয়ে আমার গলা শুকইয়া গেছে বলিলাম- হেই বাবা, আমার ওপর পড়িস না ও ধরে চইল্যা যা বাবা।’ ‘তারপর কি হলো দুখিয়া?’ ধমকের স্বরে বলল খবির। ‘তারপর হুজুর দেখিলাম আন্ধারে জ¦ল-জ¦ল-জ¦লছে দুইটা চোখ আর কিছু বলতে পারি না হুজুর। দুখিয়ার ভয় পাওয়া চেহারাটা এখনো দৃশ্যমান।
‘এখন হুজুর আমরা কি করবো?’ দুখিয়া হাত কপালে তোলে। ‘বাঘ মারতে হবে। পারবা দুখিয়া?’ খরিব হাসতে হাসতে বলল। হ্যাঁ হ্যাঁ পারতে হবে হুজুর- আগে তো বাঘ মারা হইছে কতো- এখন হুজুর সরকারি নিয়মে নাকি মারা বারণ না আছে? ‘না মারলে আমার বাগানোর লোকের চা-পাতা চাষ করবে কিভাবে। কাল তোমার পঞ্জিতে, আজ আরেক জনের তারপর শুনিছি বাঘটা নাকি ‘মানুষ খাদক? ’ ‘সর্বনাশ হুজুর। আদমি খাওয়া বাঘ, আদমি খাবেই- ‘ম্যান ইটার বাঘ মারার হুকুম আছে বুঝনে দুখিয়া।’ ‘হ্যাঁ- হ্যাঁ হুকুম আছে হুজুর জরুরি মারতে হবে- ‘দুখিয়া তুমি এখান থেকে যেয়ে তোমাদের যতো কুলি সর্দার আছে সবাইকে খবর দাও। আমার অফিসে মিটিং ঠিক আছে?’ ‘ঠিক আছে হুজুর।’ দুখিয়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ‘তাহলে তুমি এসো এখন।’ খবির বলল। দুখিয়া সালাম জানিয়ে বিদায় নেয়। খবির কলিং বেলে আঙুলে চাপ দেয়। রামাকান্ত সঙ্গে সঙ্গে হাজির। ‘টিল্লার বাবু সুখেনকে আসতে বলো। ও হ্যাঁ, হেড ক্লার্ক পরেশ বাবুকেও আসতে বলো।’ মীর্জা খবিরকে চিন্তিত মনে হয়। বাবলু মামার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে প্রশ্ন করতে কি না। মামার চিন্তিত উদ্বিগ্ন চেহারা খুব একটা এর আগে সে দেখিনি। তাই, প্রশ্ন করতে খানিকটা ভয় পাচ্ছিল। ‘কি বাবলু মামা, বাঘের খপ্পরে পড়ে গেছো, এবার উপায়?’ খবির হাসে। ‘মামা, ঐ যে ম্যান ইটার বললে। সেটা প্রমাণ পেলে কিভাবে? ’ বাবলুর প্রশ্ন। ‘খুব যথার্থ প্রশ্ন ম্যান ইটার প্রমাণ করা না গেল পরিবেশ ও বন বিভাগ আমার বিরুদ্ধে বাঘ মারার জন্য মামলা করতে পারে। কারণ চা পাতা চাষ করি বলে বনের মালিক তো আমি নই। বন জঙ্গলে মালিক হচ্ছে বন বিভাগ এবং বন্য প্রাণীদের মালিকও তারা। এরা প্রমাণ করতে বাঘটাকে ক্ষুধার্ত করতে হবে। গরু-ছাগল সব আমার চা-গ্যারেজে নিয়ে আসা হচ্ছে। যখন বাঘটা খাদ্য হিসেবে গরু বা ছাগল শিকারি পাবে না, তখনই দুখিয়ার মতো কুলি পঞ্জিতে হামলা চালাবে। পেটের ক্ষুধা বড় ক্ষুধা। ‘মানুষ খাবে?’ বাবলু ভয় পায়। ‘মানুষ না খেলে তার চলবে না তখন- একটা মানুষ খেলেই আমি থানাকে জানাব বাগানে ম্যান ইটার বাঘ ঢুকছে। এখন কি করা যাবে’? থানা থেকে লোক আসবে বন বিভাগকে জানাবে। পত্রিকায় নিউজ হবে। ব্যাস, আমি বাঘ মারার জন্য ব্যবস্থা নিতে থাকবো।’ ‘কি ব্যবস্থা নিবে মামা?’ বাবলু উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে। ‘দু’রকম ব্যবস্থা। এক গানম্যানদের দিয়ে মারার জন্য অন্যান্য বাগানের পাকা বন্দুকবাজ কিছু শিকারিদের দিয়ে। আরেকটা হলো কুলি গ্রামবাসী সবাই মিলে নেটিং করে স্থানীয় ভাষায় গড় করে মারা। এতে বাঘ জীবিত ধরা পড়ে তবে ঝুঁকি আছে। বিকেলে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় দিনের আগে আগে নিভে যায়। সূর্য বিদায় নিয়েছে বৃষ্টি শুরুর আগেই। বৃষ্টি পড়ায় শীতের প্রকোপ আরো তীব্র হয়েছে। সেই শীতে একে একে কুলি সর্দাররা বড় বাবুর অফিসে এসে হাজির হতে থাকে। সবার মুখে এক গল্প। বাঘের। খবির উপস্থিত কুলি সর্দাদের আপ্যায়নের জন্য এক কাপ চা আর একটা করে বড় সাইজের খাজার ব্যবস্থা করে। সুখেন পরেশকে বলা ছিলো। মিটিং শুরু হতে তখনো বাকি। আপ্যায়ন পর্ব চলছিল। খবির তার অফিস রুমে বসেন। এমন সময় রামাকান্ত দৌড়ে আসে। জানায়- থানার বড় বাবু এসেছেন। খবির বলল- ‘নিয়ে আসো, আমার রুমে। মিনিট দুয়েকের মধ্যে থানার ওসি রুস্তম আলী প্রবেশ করছে খবিরের চেম্বারে। ‘স্যালাইকুম ম্যানেজার সাহেব। আপনি আমাকে স্মরণ না করলেও আপনার বিপদের সময় আমি ঠিকই হাজির। ‘পুলিশের কাজইতো নাগরিকের নিরাপত্তা দেয়া ডাকাডাকির কি দরকার আছে? হাসতে হাসতে খবির বলল।
‘আপনার বাগান থেকে একটা জিডি করা হয়েছে এই মর্মে বাগানে চিতা বাঘ ঢুকে গরু-ছাগল খাচ্ছে, মানুষ খাচ্ছে কিন্তু আপনি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।’ ওসি সাহেব হাসতে হাসতে বললেন। ‘আপনি স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন যখন তখন দেখে যান কি ব্যবস্থা নিচ্ছি আমি।’ ‘আপনার মিটিংতো, করে ফেলেন। আমি থাকতে পারব না। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বাঘ আমাদের জন্য যতোটা চিন্তার কারণ, মানুষরূপী বাঘের জন্য আমাদের ঘুম হারাম। চলি, ম্যানেজার সাহেব। হাসতে হাসতে হ্যান্ডশ্যাক করে থানার ওসি রুস্তম আলী উঠে পড়লেন। আট. বৃষ্টিটা পৌষের শীতকে আরো জাগিয়ে দিয়েছে। বাবলুরা সন্ধ্যা উতরাতেই খেয়ে দেয়ে যার যার বিছানায় কম্বলবন্দী। অর্থীও শুতে গেছে তাড়াতাড়ি। রেহানা ও হিরক দু’জনে আগেই বলে রাখে, রাতে কিছু খাবে না। বিকলে হেভি নাশতা খাওয়ায় রাতে এই বিরতি। তাই তারাও বিছানায় কম্বলবন্দী হয়ে পড়েছে। কবির পাহারাদারদের ডেকে নির্দেশ দেয়- বাঘের নড়াচড়া পেলে। গুলির হুকুমের অপেক্ষা করা লাগবে না।
দু’জন গানম্যানকে সহায়তা দিতে বাগান পাহারাদার দু’জন নৈশপ্রহরী কৃষ্ণলাল ও মনিলালকে বাংলোর পশ্চিম প্রান্তে পাহারা দিতে আনা হয়েছে। খবির বিছানায় শুয়ে এ পাশ ও পাশ করছিল। বাঘ মারার সিদ্ধান্ত নেয়েছে। কিন্তু সে রকম উদ্যোগী লোকজন নেই। মানুষ কেমন সাহস হারা হয়ে গেছে আজকাল। তা ছাড়া ছোটকালে পড়েছে একতাই বল সে ঐক্যও নাই মানুষের মাঝে। যে কারণে একটি হিংস জানোয়ারকে বধ করতে সবাই একমত হতে পারলো না। কেউ কেউ গানম্যান এনে মারার জন্য মত দেয়। কেউ কেউ সবাই একত্র হয়ে একটি ঢিলায় বাঘকে ঢুকিয়ে নেট দিয় গড় তৈরি করে তারপর কয়েকদিন ঐ টিলায় বাঘকে বন্দী করে মারার জন্য। কিন্তু সবাই মিলিতভাবে একটি বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলো না। খবিরে মনে উদ্বেগ যদি বাঘটা আ