নেতাগিরি !

কালাম, এক সময়ের ডাকসুর নেতা। এমপি-ও হয়েছিলেন একবার। বিদেশ সফরে গিয়ে প্রথম সন্তানকে আমেরিকার নাগরিক করেছেন। ঢাকার অভিজাত এলাকায় দুইটা প্লট বাগিয়েছেন। তবে তার সহকর্মীদের তুলনায় এসব একেবারে নস্যি। ইদানিং তার তেমন কোন কাজ নেই। সারা জীবন করেছেন রাজনীতি। ব্যবসায় মনে নেই। ব্যবসা শুরু করেন কিন্তু দেখাশুনা করেন না। দলের মধ্যে বহু লবিং। ছাত্র আন্দোলনের সময়ে থেকে সে একটা লবি মেইনটেইন করে। এখনো সেটাই ফলো করে। তবে ছাত্র আন্দোলনের বাইরের নেতাদের সাথে উপরে- নীচে, দিনে- রাতে নানান ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। বহুদিন থেকে দল ক্ষমতায় নেই। লোকজনের আসা-যাওয়া কমে গেছে। ইদানং ফোন-টোনও কমে যাচ্ছে। নিজের নির্বাচনী এলাকায় অনেকগুলি উপদল। একদলের মিটিং এ গেলে আরেক দল রাগ করে। এলাকায়ও যেতে ইচ্ছা করে না। আর গেলেই খালি খরচ। বাড়ী ভাড়া ছাড়া আর কোন ইনকামও নেই। নিজের একটা, বউয়ের একটা গাড়ি। তার খরচওতো কম না। কন্যা, দেশের সব চেয়ে দামি স্কুলগুলির একটাতে পড়ে। ড্রাইভার, দারোয়ান, ম্যানেজার, বাবুর্চি এরাই এখন তার চ্যালা-চামুণ্ডা

কালামের বড় সমস্যা হয়েছে, একা থাকা বা চলা। এটা সে পারেই না। সাদা পাঞ্জাবি পরে দুইহাতে দুই বড় সাইজের মোবাইল ফোন, যার একটা কানে থাকবে আরেকটা বাজবে আর অন্তত পনেক কুড়ি জন লোক তার থেকে সামান্য পিছে হাঁটবে। এই তার সবচেয়ে পছন্দের লাইফ স্টাইল। রাস্তায় লোকজন সালাম দিতে থাকবে, সে কারো দিকে তাকিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে সালামের জবাব দেবে। কিন্তু ইদানিং তার সাথে কেউ থাকছেনা। তবুও সে সাদা পাঞ্জাবি পরে খুবই ব্যাস্ত ভংগিতে বাসা থেকে বের হয়। নির্বাচনী এলাকার নেতা পাতিনেতাদের নিজেই ফোন দেয়। অফুরন্ত সময় কথা বলে ফোনে। এক কানে ফোন ধরা অবস্থায় ড্রাইভারকে ইশারায় গাড়ি বের করতে বলে।

তার একটা ছোট খাট অফিস আছে। সেখানে গ্রামের লোকজন বিভিন্ন বিচার নিয়ে আসে। কেউ আসে মামলার তদবিরে। কেউ আসে চুকলিবাজি করতে। ঐ সময়গুলি কালামের সবচেয়ে ভাল লাগে। সে চায়, কিছু লোক তার রুমে থাকুক কিছু বাইরে অপেক্ষা করুক। প্রতিদিন সে তার অপিসে যায়। মাঝে মাঝে কেউ থাকেনা। এই সময়গুলি তার নিজের কাছে খুব অসহায় লাগে। পার্টি অপিসে যাবার কথা ভাবে। কিন্তু রাস্তায় জ্যামের কথা মনে হতে আর পার্টি অপিসের দখল নেয়া পাগলদের কথা মনে হলে আর যেতে ইচ্ছা করেনা। ইদানিং তার পেপার পড়ার অভ্যাস হয়েছে। কিন্তু কাজটা সে খুব গোপনে করে। পেপার পড়বে বেকার মানুষ। তার মত কাজের মানুষের পেপার পড়ার সময় হবে কেন? সারাক্ষণ তার ভয়, তার যে কোন কাজ নেই এটা যেন কেউ বুঝতে না পারে। তার কাজ যে আগের চেয়ে কমে গেছে এটাও সে কাওকে বুঝতে দিতে চায় না। এমনকি নিজের বউকেও না।

ইনএকটিভ নেতাদের তালিকায় তার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে তার বিপরীত লবি। তার লবির আরো কয়েকজনের নাম এসেছে ওখানে। নাম আসাটা যে খুব অন্যায় হয়েছে তাও না। দলের কর্মসূচী; অনেকের মত সেও এড়িয়ে গেছে। তাদের কথা হল, তারা ছাত্র নেতা। জীবনে বহু আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। এখন অন্যরা করুক। নির্বাচনের আগে নমিনেশন পাবার জন্য কি করতে হবে তা তাদের ভালই জানা আছে। শুধু শুধু পুলিশকে চটিয়ে তাদের নেতা হতে হবে না। এই সব করবে যারা নতুন করে নেতা হবার চেষ্টা করছে তারা। কিন্তু এই তালিকার একটা জবাব ইমিডিয়েটলি দেয়া দরকার। তার মত আরো যাবা ইনএকটিভের তালিকায় এসেছে তাদের সাথে দেখা করলো। কিন্তু সেখানে মদ খাওয়া আর বিপরীত লবির নেতাদের গালি দেয়া ছাড়া কিছুই হলো না। গভীর রাতে চিন্তামগ্ন হয়ে বাড়ী ফেরে সে। পরের যে কোন জ্বালাময়ী কর্মসূচীতে তাকে তার কাজ করে ফেলতে হবে।

তিন দিনের মাথায় আবার হরতাল। পিকেটিং করতে যেয়ে পুলিশের গুলি খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন কালাম। দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্রের হেড লাইন হলেন। সারা দেশ এই গুলির প্রতিবাদি পোস্টারে ছেয়ে গেল। কোন ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে তার সাথে দেখা করতে দেয়া হলনা। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি আমেরিকাতে চলে গেলেন। এদিকে সরকারি গুলির জবাবে আবার হরতাল ডাকলো তার দল।

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

দুঃখিত!