জয়পরাজয়-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-২য় অংশ

প্রতিঘাত করিতে লাগিল , এবং কেবল সেই ধ্বনির বেগে সমস্ত জনমণ্ডলীর বক্ষকবাট থর্ থর্ করিয়া স্পন্দিত হইয়া উঠিল । কত কৌশল , কত কারুকার্য , উদয়নারায়ণ নামের কতরূপ ব্যাখ্যা , রাজার নামাক্ষরের কতদিক হইতে কতপ্রকার বিন্যাস , কত ছন্দ , কত যমক ।

পুণ্ডরীক যখন শেষ করিয়া বসিলেন , কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ সভাগৃহ তাঁহার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ও সহস্র হৃদয়ের নির্বাক্‌ বিস্ময়রাশিতে গম্‌ গম্‌ করিতে লাগিল । বহু দূরদেশ হইতে আগত পণ্ডিতগণ দক্ষিণ হস্ত তুলিয়া উচ্ছ্বসিত স্বরে ‘ সাধু সাধু ‘ করিয়া উঠিলেন ।

তখন সিংহাসন হইতে রাজা একবার শেখরের মুখের দিকে চাহিলেন । শেখরও ভক্তি প্রণয় অভিমান এবং একপ্রকার সকরুণ সংকোচপূর্ণ দৃষ্টি রাজার দিকে প্রেরণ করিল এবং ধীরে উঠিয়া দাঁড়াইল । রাম যখন লোকরঞ্জনার্থে দ্বিতীয়বার অগ্নি-পরীক্ষা করিতে চাহিয়াছিলেন তখন সীতা যেন এইরূপভাবে চাহিয়া এমনি করিয়া তাঁহার স্বামীর সিংহাসনের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিলেন ।

কবির দৃষ্টি নীরবে রাজাকে জানাইল , ‘ আমি তোমারই । তুমি যদি বিশ্বসমক্ষে আমাকে দাঁড় করাইয়া পরীক্ষা করিতে চাও তো করো । কিন্তু — ‘ তাহার পরে নয়ন নত করিলেন ।

পুণ্ডরীক সিংহের মতো দাঁড়াইয়াছিল , শেখর চারি দিকে ব্যাধবেষ্টিত হরিণের মতো দাঁড়াইল । তরুণ যুবক , রমণীর ন্যায় লজ্জা এবং স্নেহ-কোমল মুখ , পাণ্ডুবর্ণ কপোল , শরীরাংশ নিতান্ত স্বল্প — দেখিলে মনে হয়, ভাবের স্পর্শমাত্রেই সমস্ত দেহ যেন বীণার তারের মতো কাঁপিয়া বাজিয়া উঠিবে ।

শেখর মুখ না তুলিয়া প্রথমে অতি মৃদুস্বরে আরম্ভ করিলেন । প্রথম একটা শ্লোক বোধ হয় কেহ ভালো করিয়া শুনিতে পাইল না । তাহার পরে ক্রমে ক্রমে মুখ তুলিলেন — যেখানে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন সেখান হইতে যেন সমস্ত জনতা এবং রাজসভার পাষাণপ্রাচীর বিগলিত হইয়া বহুদূরবর্তী অতীতের মধ্যে বিলুপ্ত হইয়া গেল । সুমিষ্ট পরিষ্কার কণ্ঠস্বর কাঁপিতে কাঁপিতে উজ্জ্বল অগ্নিশিখার ন্যায় ঊর্ধ্বে উঠিতে লাগিল । প্রথমে রাজার চন্দ্রবংশীয় আদিপুরুষের কথা আরম্ভ করিলেন । ক্রমে ক্রমে কত যুদ্ধবিগ্রহ , শৌর্যবীর্য , যজ্ঞদান , কত মহদনুষ্ঠানের মধ্য দিয়া তাঁহার রাজকাহিনীকে বর্তমান কালের মধ্যে উপনীত করিলেন । অবশেষে সেই দূরস্মৃতিবদ্ধ দৃষ্টিকে ফিরাইয়া আনিয়া রাজার মুখের উপর স্থাপিত করিলেন এবং রাজ্যের সমস্ত প্রজাহৃদয়ের একটা বৃহৎ অব্যক্ত প্রীতিকে ভাষায় ছন্দে মূর্তিমান করিয়া সভার মাঝখানে দাঁড় করাইয়া দিলেন — যেন দূর দূরান্ত হইতে শতসহস্র প্রজার হৃদয়স্রোত ছুটিয়া আসিয়া রাজপিতামহদিগের এই অতিপুরাতন প্রাসাদকে মহাসংগীতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল — ইহার প্রত্যেক ইষ্টককে যেন তাহারা স্পর্শ করিল , আলিঙ্গন করিল , চুম্বন করিল , ঊর্ধ্বে অন্তঃপুরের বাতায়নসম্মুখে উত্থিত হইয়া রাজলক্ষ্মীস্বরূপা প্রাসাদলক্ষ্মীদের চরণতলে স্নেহার্দ্র ভক্তিভরে লুন্ঠিত হইয়া পড়িল , এবং সেখান হইতে ফিরিয়া আসিয়া রাজাকে এবং রাজার সিংহাসনকে মহামহোল্লাসে শতশতবার প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল । অবশেষে বলিলেন , “ মহারাজ , বাক্যতে হার মানিতে পারি , কিন্তু ভক্তিতে কে হারাইবে । ” এই বলিয়া কম্পিতদেহে বসিয়া পড়িলেন । তখন অশ্রুজলে-অভিষিক্ত প্রজাগণ ‘ জয় জয় ‘ রবে আকাশ কাঁপাইতে লাগিল ।

আরো পড়ুন  হরিণের হৃৎপিণ্ড

সাধারণ জনমণ্ডলীর এই উন্মত্ততাকে ধিক্কারপূর্ণ হাস্যের দ্বারা অবজ্ঞা করিয়া পুণ্ডরীক আবার উঠিয়া দাঁড়াইলেন । দৃপ্তগর্জনে জিজ্ঞাসা করিলেন , “ বাক্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কে । ” সকলে একমূহূর্তে স্তব্ধ হইয়া গেল ।

তখন তিনি নানা ছন্দে অদ্ভুত পাণ্ডিত্য প্রকাশ করিয়া বেদ বেদান্ত আগম নিগম হইতে প্রমাণ করিতে লাগিলেন — বিশ্বের মধ্যে বাক্যই সর্বশ্রেষ্ঠ । বাক্যই সত্য , বাক্যই ব্রক্ষ্ম । ব্রক্ষ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর বাক্যের বশ , অতএব বাক্য তাঁহাদের অপেক্ষা বড়ো । ব্রক্ষ্মা চারিমুখে বাক্যকে শেষ করিতে পারিতেছেন না; পঞ্চানন পাঁচ মুখে বাক্যের অন্ত না পাইয়া অবশেষে নীরবে ধ্যানপরায়ণ হইয়া বাক্য

খুঁজিতেছেন ।এমনি করিয়া পাণ্ডিত্যের উপর পাণ্ডিত্য এবং শাস্ত্রের উপর শাস্ত্র চাপাইয়া বাক্যের জন্য একটা অভ্রভেদী সিংহাসন নির্মাণ করিয়া বাক্যকে মর্ত্যলোক এবং সুরলোকের মস্তকের উপর বসাইয়া দিলেন এবং পুনর্বার বজ্রনিনাদে জিজ্ঞাসা করিলেন , “ বাক্যের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কে । ”

দর্পভরে চতুর্দিকে নিরীক্ষণ করিলেন ; যখন কেহ কোনো উত্তর দিল না তখন ধীরে ধীরে আসন গ্রহণ করিলেন । পণ্ডিতগণ ‘ সাধু সাধু ‘ ‘ ধন্য ধন্য ‘ করিতে লাগিল- রাজা বিস্মিত হইয়া রহিলেন এবং কবি শেখর এই বিপুল পাণ্ডিত্যের নিকটে আপনাকে ক্ষুদ্র মনে করিলেন । আজিকার মতো সভা ভঙ্গ হইল ।

 

পরদিন শেখর আসিয়া গান আরম্ভ করিয়া দিলেন — বৃন্দাবনে প্রথম বাঁশি বাজিয়াছে , তখনো গোপিনীরা জানে না কে বাজাইল , জানে না কোথায় বাজিতেছে, একবার মনে হইল দক্ষিণপবনে বাজিতেছে; একবার মনে হইল, উত্তরে গিরিগোবর্ধনের শিখর হইতে ধ্বনি আসিতেছে ; মনে হইল , উদয়াচলের উপরে দাঁড়াইয়া কে মিলনের জন্য আহ্বান করিতেছে ; মনে হইল , অস্তাচলের প্রান্তে বসিয়া কে বিরহশোকে কাঁদিতেছে ; মনে হইল, যমুনার প্রত্যেক তরঙ্গ হইতে বাঁশি বাজিয়া উঠিল ; মনে হইল , আকাশের প্রত্যেক তারা যেন সেই বাঁশির ছিদ্র — অবশেষে কুঞ্জে কুঞ্জে , পথে ঘাটে , ফুলে ফলে , জলে স্থলে , উচ্চে নীচে , অন্তরে বাহিরে বাঁশি সর্বত্র হইতে বাজিতে লাগিল — বাঁশি কী বলিতেছে তাহা কেহ বুঝিতে পারিল না এবং বাঁশির উত্তরে হৃদয় কী বলিতে চাহে তাহাও কেহ স্থির করিতে পারিল না ; কেবল দুটি চক্ষু ভরিয়া অশ্রুজল জাগিয়া উঠিল এবং একটি অলোকসুন্দর শ্যামস্নিগ্ধ মরণের আকাঙ্ক্ষায় সমস্ত প্রাণ যেন উৎকন্ঠিত হইয়া উঠিল ।

আরো পড়ুন  মাটির পুতুলের হাড়গোড় ----- মেহেদী উল্লাহ

সভা ভুলিয়া , রাজা ভুলিয়া , আত্মপক্ষ প্রতিপক্ষ ভুলিয়া , যশ-অপযশ জয়পরাজয় উত্তর-প্রত্যুত্তর সমস্ত ভুলিয়া, শেখর আপনার নির্জন হৃদয়কুঞ্জের মধ্যে যেন একলা দাঁড়াইয়া এই বাঁশির গান গাহিয়া গেলেন । কেবল মনে ছিল একটি জ্যোতির্ময়ী মানসী মূর্তি , কেবল কানে বাজিতেছিল দুটি কমলচরণের নূপুরধ্বনি । কবি যখন গান শেষ করিয়া হতজ্ঞানের মতো বসিয়া পড়িলেন তখন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্যে- একটি বৃহৎ ব্যাপ্ত বিরহব্যাকুলতায় সভাগৃহ পরিপূর্ণ হইয়া রহিল, কেহ সাধুবাদ দিতে পারিল না ।

এই ভাবের প্রবলতার কিঞ্চিৎ উপশম হইলে পুণ্ডরীক সিংহাসনসম্মুখে উঠিলেন । প্রশ্ন করিলেন , “ রাধাই বা কে , কৃষ্ণই বা কে । ” বলিয়া চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিলেন এবং শিষ্যদের প্রতি চাহিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া পুনরায় প্রশ্ন করিলেন , “ রাধাই বা কে , কৃষ্ণই বা কে । ” বলিয়া অসামান্য পাণ্ডিত্য বিস্তার করিয়া আপনি তাহার উত্তর দিতে আরম্ভ করিলেন ।

বলিলেন , “ রাধা প্রণব ওঁকার , কৃষ্ণ ধ্যানযোগ , এবং বৃন্দাবন দুই ভ্রূর মধ্যবর্তী বিন্দু । ” ইড়া , সুষুম্না , পিঙ্গলা , নাভিপদ্ম , হৎপদ্ম , ব্রক্ষ্মরন্ধ্র , সমস্ত আনিয়া ফেলিলেন । ‘ রা ‘ অর্থেই বা কী , ‘ ধা ‘ অর্থেই বা কী , কৃষ্ণ শব্দের ‘ ক ‘ হইতে মূর্ধন্য ‘ ণ ‘ পর্যন্ত প্রত্যেক অক্ষরের কত প্রকার ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হইতে পারে , তাহার একে একে মীমাংসা করিলেন । একবার বুঝাইলেন , কৃষ্ণ যজ্ঞ , রাধিকা অগ্নি; একবার বুঝাইলেন , কৃষ্ণ বেদ এবং রাধিকা ষড়্‌দর্শন ; তাহার পরে বুঝাইলেন কৃষ্ণ শিক্ষা এবং রাধিকা দীক্ষা । রাধিকা তর্ক , কৃষ্ণ মীমাংসা ; রাধিকা উত্তরপ্রত্যুত্তর , কৃষ্ণ জয়লাভ ।

এই বলিয়া রাজার দিকে , পণ্ডিতদের দিকে এবং অবশেষে তীব্র হাস্যে শেখরের দিকে চাহিয়া পুণ্ডরীক বসিলেন ।

রাজা পুণ্ডরীকের আশ্চর্য ক্ষমতায় মুগ্ধ হইয়া গেলেন , পণ্ডিতদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না এবং কৃষ্ণরাধার নব নব ব্যাখ্যায়

আরো পড়ুন  হরিপুরের হরেক কান্ড--পঞ্চম পর্ব- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

গল্পের তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

দুঃখিত!