“সারাটা দিন গরম বাতাস বইছিল। জানলা-দরজা বন্ধ করেও ফাঁক ফোকর দিয়ে যেন গলন্ত লাভার মত ঘরের ভিতরে ঢুকে জিভ-তালু শুকিয়ে দিচ্ছিল একেবারে। বিকেল চারটে-সাড়ে চারটে নাগাদ রোদের হামালটা একটু কমল। দীর্ঘ ছায়ার মত কালো কুচকুচে মেঘে ঢেকে গেল গোটা আকাশ। আর তার খানিকক্ষণ বাদেরি ঝড় উঠল। বাইরের শুকোতে দেওয়া কাপড়গুলি জোরে জোরে দুলতে লাগল পাখার মত। খালি তারগুলোতে অদ্ভুত এক ঝন্ঝনে শব্দ। এক পা এক পা করে বাইরে বেরিয়ে দেখি ঝড়ের বাতাস ঠাণ্ডা এক আমেজে ভরিয়ে দিচ্ছে। দূরের আমবাগানে বাতাসের লুটোপুটি। বৃষ্টি নামল ব’লে। আর ঠিক তখনই, ওই আম্রপালী গাছের তলায় আমি ওটাকে দেখলাম। স্থির, নিশ্চুপ। অবিচল ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।”
– “কতদিন আগের ঘটনা এটা?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
– “আজ তো আগস্টের ৫ই… ঠিক তিন মাস, দুই দিন আগে।”
কথা চলছিল সিদ্ধার্থ সেনের বৈঠকখানায় বসে। আমি উঠতি মনোবিজ্ঞানী। উনি প্রবীণ ব্যবসায়ী, কোথা থেকে আমার নাম জেনেছেন জানি না, তবে গতকালই ফোনে আমাকে একান্ত অনুরোধ করেন তার বাড়ীতে একবারটি আসার জন্য। আমিও সবে প্র্যাকটিস শুরু করেছিস। পসারও তেমন জমেনি। তাই এই দাঁও মারার সুযোগটা ছাড়লাম না। মিঃ সেনের খামার বাড়ি মোহনপুরের কাছে। বেশ কয়েক বিঘা জমি, আমবাগান নিয়ে এলাহী কারবার। শুনেছি কলকাতা আর দিল্লীতেও নাকি বাড়ি আছে। এটা ওনার প্রমোদগৃহ বললে ভুল হয় না।
– “তারপর?” আমার প্রশ্ন।
– “তারপর? তারপর থেকেই তো আমার রোগের শুরু। যাকে কেউ দেখতে পায় না, তাকে আমি দেখতে পাই। ছোট একটা স্পিৎস কুকুর। নাকে কাছে কালো ছোপ। প্রায় প্রতিরাতে আমার শোবার ঘরের জানলা থেকে ওটাকে দেখতে পাই। আর কি আশ্চর্য জানো, প্রতিদিনই একটু একটু করে ওটা এগিয়ে আসে। সারা রাত জানলার কাঁচের মধ্যে দিয়ে আমায় দেখে।
– “তো, জানলার পর্দা নামালেই হয়।”
– “পারি না। জানো, সে কিরকম সম্মোহন, তোমায় বোঝাতে পারব না। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে আমিও তাকিয়ে থাকি ওটার দিকে। ভয় হয়। আমি চোখ বুজলেই ভয়ানক কোন বিপদ হবে আমার।”
– কুকুরটার ভঙ্গী দেখে কি মনে হয়?
– “জানি না”, হতাশ ভাবে মাথা নাড়েন সিদ্ধার্থ বাবু। “এক ভাবে স্থির দৃষ্টিতে কোন ইতর প্রাণী যে ভাবে চেয়ে থাকতে পারে, তা আগে জানতাম না।”
– আপনি ছাড়া আর কে দেখেছে কুকুরটাকে?
– “কেউ না। বিশ্বাস করো, প্রথম দিকে বাড়ির চাকর, দারোয়ান সবাইকে দেখাতে চেয়েছি। কেউ দেখেনি। শুধুমাত্র আমি একা থাকলেই ও আসে… জিমি আসে।” শেষ শব্দগুলো প্রায় ফিসফিসিয়ে শোনা গেল।
– জিমি? জিমি কে?
– অধীশের কুকুর। অধীশ বর্মন, আমার পার্টনার। আমি তখন চেন্নাইতে একটা ব্যবসার কাজে গেছি। অধীশকে কারা যেন খুন করে ওই আমবাগানে পুঁতে দিয়ে গেছিল। সঙ্গে ওর কুকুর জিমিকেও ঘাড় মটকানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
– আর পুলিশ? পুলিশ আপনাকে কিছু বলেনি?
– আমার অকাট্য অ্যালিবাই ছিল। আর দুর্মুখ অধীশের শত্রুও কম ছিল না।
– আপনি তাহলে বলতে চান এতদিন বাদে জিমিই ফিরে এসেছে? শুনুন সিদ্ধার্থবাবু আমার যা মনে হয় সমস্তটাই আপনার দৃষ্টি বিভ্রম ছাড়া কিছু নয়।
– “গত রাত্রে জানলার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল প্রাণীটা। বলতে বলতেই বাইরের ভিজে বাতাস শনশন করে জানলা বেয়ে ঢুকে পড়ল। এক ঝটকায় কারেণ্টটাও চলে গেল দপ্ করে। অন্ধকারে সিদ্ধার্থবাবুর গলা পেলাম, “ওই!… ওই শুনতে পাছেন?” খুব চেষ্টা করেও বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছু শুনতে পেলাম না। বললাম, “কার কথা বলছেন বলুন তো?” অদ্ভুত অপার্থিব কাঁপা কাঁপা গলায় সিদ্ধার্থবাবু বললেন, “কুকুরটা ডাকছে!”
এবার আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। বুড়ো চাকরটা এই ফাঁকে একটা লন্ঠন ধরিয়ে দিয়ে গেছে। তার হলদেটে আলোয় সেনবাবুর কপালের চিক্চিকে ঘামের বিন্দু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন স্থিরভাবে কোন অনাগত বিপদের প্রতীক্ষা করছেন। তাকে হাত ধরে উঠিয়ে বললাম, “অনেক রাত হলো। শুতে চলুন।” অশান্ত কন্ঠে সেনবাবু বললেন, “আর আমার সমস্যাটা? সেটার কি হবে? যে জন্য তোমাকে ডাকা!” বললাম, “আমি এখনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। তবে যা মনে হচ্ছে… এ আপনার চোখের ভুল। যাই হোক, রাতে জানলাগুলো ভালো করে ছিটকিনি দিয়ে শুতে যান। আর দরজাখোলা রাখবেন, যাতে প্রয়োজনে আমি সাহায্য করতে পারি। আমি বাইরেই কৌচে শুয়ে বই পড়ে রাত কাটিয়ে দেব। বাকি কথা সকালে হবে।”
সিদ্ধার্থবাবুকে শুভরাত্রি জানিয়ে কৌচে টানটান হয়ে বসলাম। সঙ্গে কিছু মেডিক্যাল জার্নাল ছিল। তাই উলটে পালটে দেখছি, এমন সময় রাতের স্তব্ধতাকে ছিঁড়েখুঁড়ে তীব্র এক আর্তনাদ ভেসে এল সিদ্ধার্থবাবুর ঘর থেকে। দরজায় ঠেলা দিয়ে বুঝলাম উনি আমার কথা শোনেন নি। আর্তনাদটা একবার হয়েই বন্ধ হয়ে গেছিল। কিন্তু তার রেশে গোটা বাড়ি তখনও কাঁপছিল থরথর করে। তিন-চারবার জোরে ধাক্কা দিতে ভেতরের ছিটিকিনি ভেঙে গেল। এলোমেলো বিছানার পাশে, মেঝেতে হাঁ করে ঊর্দ্ধ-পানে চেয়ে পড়ে আছেন সিদ্ধার্থ সেন। টুঁটির কাছটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। স্থির… মৃত।
বুঝলাম বড্ড ভুল করেছি। লোকটাকে একা ছাড়া উচিৎ হয় নি। এই ধরনের মানুষদের একরকম আত্মহত্যার প্রবনতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আবার গলার ক্ষতর দিকে চোখ পড়ল। টেবিলে রাখা নিভু নিভু লণ্ঠনটার আলো বারিয়ে কাছ থেকে দেখলাম। ক্ষত নয়। সিদ্ধার্থবাবুর জুগুলার ধমনি বরাবর কোনও শ্বাপদ শ্রেণীর প্রাণীর দাঁতের দাগ। এ দাগ আমার চেনা। স্পিৎস জাতীয় ছোট কোন কুকুরের দাঁতের চিহ্ন। কিন্তু, ঘরে কোনও কুকুরের চিহ্নমাত্র ছিল না!
"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।