দৃশ্য-১ দশ-বারো বছরের আশ্রয়হীন অনাথ বালক দুলাল গ্রাম ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পা বাড়িয়েছে। উদ্দেশ্য শহরে এসে একটা কিছু করে খাওয়া। প্রথমে নিজের চেনাজানা চৌহদ্দির মধ্যে এবং নিকটবর্তী জেলা শহরের এখানে সেখানে চেষ্টা করে কোন কিনারা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঢাকামুখী বাসের ছাদে চেপে বসে। তারপর ঢাকার কোন একটি টার্মিনালে নেমে একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এসে পৌঁছে। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লঞ্চ টার্মিনালেরই কোন একটি কোনায় অপেক্ষাকৃত কম যান চলাচল করে এমন স্থান দেখে নিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। তার পর গ্রাম থেকে সঙ্গে করে আনা পুঁটলি খুলে এক বোতল পানি আর একটি পাউরুটি বের করে। পানি দিয়ে গিলে পাউরুটিটা শেষ করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে। তার পরপরই সারাদিনের ক্লান্তিবশত রাজ্যের ঘুম নেমে আসে তার চোখে। এদিক সেদিক এক নজর দেখে নিয়ে পুঁটলিটা মাথার নিচে দিয়ে শান্তির ঘুমে ঢলে পড়ে বালক দুলাল। পাশ দিয়ে অসংখ্য পায়ে চলার শব্দ, লোকজনের হট্টগোল হাঁক-ডাক, ট্রলারের গড় গড় শব্দ কিংবা ঘাট পুলিশের বাঁশির কর্কশ সুর কোন কিছুই তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে না।
দুলাল ঘুমাচ্ছে অকাতরে। এমন সময় দুইজন পুলিশ এসে তার শান্তির ঘুম ভেঙে দেয়। শুয়ে থাকা দুলালের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডেকে, বাঁশি বাজিয়ে ফ্লোরে বুটপায়ে আঘাত করে তাকে জাগিয়ে দেয়। দুলাল থতমত খেয়ে উঠে বসে পড়ে। পুলিশ-১ : ওরে বাপরে বাপ! কী ঘুম! ভূমিকম্প হইয়া গেলেও ভাঙবো না মনে হয়। দুলাল : (চোখ কচলাতে কচলাতে) কি অইল? এতো চেঁচামেচি করতাছেন কেন? সারাদিন পরে একটু শুইছিলাম… (দুলালের মুখের ওপর দিয়েই এক ধমক।)
পুলিশ-১ : চৌ…প…! একটা দিব ঘাড়ের ওপর। জানিস এখানে শুয়ে কতবড় অন্যায় করেছিস? আবার প্যান পেনিয়ে কথা বলিস? (ধমক শুনে দুলাল একেবারে চুপসে যায়। বুঝে নেয় সে। যেমনটি আঁচ করেছিল পরিস্থিতি তেমনটি নয়।) পুলিশ-২ : এই ঘাটে নতুন আমদানি মনে হয়…। (কোন জবাব নেই) তা কোন খোঁয়াড় থাইক্যা আইছো বাপ? দুলাল : আমি কি মুরগি নি যে খোঁয়াড়ে থাকতাম? পুলিশ-২ : বাহ! মুখতো ভালই চলে মনে হয়। আরে জিজ্ঞেস করি বাড়ি কই? কোন জেলা? দুলাল : ডিস্ট্রিক্ট কিশোরগঞ্জ, থানা কইট্যালি, গেরাম আচমিতা। পুলিশ-১ : হ্যুম… , তা এইখানে যে শুইছিস জায়গার ভাড়া দিছস? দুলাল : (অবাক হয়) ভাড়া ! এই জায়গার ভাড়া লাগবো ক্যারে? এইডা কি বাসা বাড়িনি? পুলিশ-১ : লাগবো, এই জায়গারই ভাড়া লাগবো। দে বিশ টাকা দে। দুলাল : আমার কাছে টেকা নাই। পুলিশ-১ : তাহলে ১০ টাকা দে। দুইজনে পান বিড়ি খামু। দুলাল : পাঁচ টেকাও নাই।
পুলিশ-১ : (মাথায় চাঁটি মেরে) ৫ টাকাও নেই! ওরে ফকিন্নির পুত তাহলে এইখানে মরতে আসছু কেন? (পুলিশ-১ দুলালের ঘাড় ধরে টনতে টানতে বকতে থাকবে।) পুলিশ-২ : (প্রসঙ্গ বদলে) ছাইড়া দেন, তারচেয়ে বরং কদ্দুর খেদমত লইয়া লন। পুলিশ-১ : (প্রস্তাবটা ভাল লাগবে) হ.., মন্দ কন নাই। কদ্দুর খেদমত লইয়া লই। দেরে, আমার পিঠটা একটু চুলকায়া দে। (বলেই ইউনিফর্ম তুলে পিঠ উদাস করে দুলালের সামনে বসে যাবে।) পুলিশ-১ : ওরে বাপরে…, পিঠের চামড়া তুইল্যা ফেলাইলরে.. (পুলিশ ব্যথা পেয়ে চেঁচিয়ে উঠবে। দুলালকে ধরতে যাবে। দুলাল ভয়ে পড়ি কি মরি করে পুঁটলিটা হাতে নিয়ে দেবে এক দৌড়। পুলিশ খোলা ইউনিফর্ম ঠিক করতে করতে দুলালকে ধাওয়া করবে। তবে ধরতে পারবে না। দুলাল এক দৌড়ে লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বেরিয়ে প্রধান সড়কে এসে দাঁড়াবে। চারদিক তাকিয়ে দেখে সব নীরব নিস্তব্ধ। শুধু তার মত আরও কিছু লোক, নর-নারী বেওয়ারিশ কুকুর এখানে সেখানে শুয়ে অকাতরে ঘুমাচ্ছে। দুলালও কিছুক্ষণ পায়চারি করে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর অনতিদূরে আরো ২-৩টা বেওয়ারিশ কুকুর মারামারি আর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। এতে ফুটপাথে ঘুমন্ত অনেকে সজাগ হয়ে যায়। এর মধ্যে থেকে বৃদ্ধ বয়সী একটা লোক তার হাতের লাঠি নিয়ে কুকুরগুলোকে তাড়াতে উদ্যত হবে।)
বৃদ্ধ : হিস… যা যা… দুর হ! দুর হ!! (লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে দেবে) সারাডা দিন খাইট্যা একটু ঘুমাইলাম আর তোরা আইসুুস এইখানে সংসদ সদস্যগিরি দেখাইতে। (বলে আবার শুয়ে পড়বে। কিছুক্ষণ পর আরো একটা লোক ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে দুলালের জায়গায় যাবে। সেখানে অজানা অচেনা একটি বালককে শুয়ে থাকতে দেকে অবাক হবে। কিছুক্ষণ দেখে ডাক দেবে) লোক : (স্বগত) মর জ্বালা! এইডা আবার কোন আপদ আইয়া জুটছে! এই লেদা, ওড দেহি ….হেইয়া মোরজাগা, ওড..ওড..। (কোন সাড়া না পেয়ে গা ধরে জোরে ঝাঁকুনি দেবে। দুলাল ধড়ফড়িয়ে উঠে বসবে।) দুলাল : (ঘুমের ঘোরেই) আরে ভাই কইলামতো আমার কাছে কোন টেহা নাই। (বলেই অবাক হয়ে যাবে। ঘুমের ঘোরও কেটে যাবে।
তাকিয়ে দেখে এ অন্য লোক।) লোক : (অবাক হয়ে) ও মামু ..! তোমার কাছে টাহা চাইল কেডা? দুলাল : হ্যাঁ….অ্যা…(কিছুই বলতে পারবে না) লোক : তুমি লেদা পোলা, গুঁড়া গাড়া এইহানে আইছো কা? দুলাল : (কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ) মামা, আপনে আমার মামা হইন। আইজকার রাইতটা এইহানে ঘুমাই, সকালে উইঠ্যাই যায়মগা। লোক : একসের ঝামেলা দ্যাখতে আছি। আরে মুই নগদ টাহা দিয়া হেইয়ার পার ভারা নিছি। (ভেংচে) মামা ডাকলেই সব হইয়া গেল? দুলাল : কি করাম? আমার যে যাওয়ার কুনু জাগা নাই। লোক : যাওইন্যালা জায়গা নাই তো মর না কা? নদীতো কাছেই আছে, ওইহানে গিয়া ডুইব্যা মরলেই পার। (নির্দয় কথা শুনে দুলাল মনে ব্যথা পেয়ে চোখ মুছতে মুছতে হাঁটা দেবে। কিছু দূর যাওয়ার পর লোক পেছন দিয়ে ডাক দেবে।) লোক : (স্বগত) আরে এ দেহি সত্য সত্যই চইল্যা যায়। (ডাক দিয়ে) ও বাডু.. বাডু আরে মুইকি সত্যসত্যিই কইছিনি?
(দুলাল তাকাবে) কোম্মে যাও? দুলাল : (হাতে দেখিয়ে) হেম্মে, মরতে। লোক : (দুলালকে সহজ করার প্রয়াসে) হে.. হে.. হে…আহারে মনু, মজাডাও বুঝলা না? আও কোন হানে যাওন লাগবো না। (দুলাল কাছে আসবে) মুই বুঝছি তোমার হিসটরি। একখান কাম চাই, পেট চালাইতে হইবো, এইতো? (দুলাল হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়বে) দুই দিন থাহ মোর লগে, হেই য়ার পর কমলাপুর যামু। হেই ইস্টিশনে মোর এক বড় ভাই আছে, তার লগে পরিচয় করায়া দিমু কাম জোগাড় কইরা দিব। পার বা না? দুলাল : (হাসি মুখে) খুব পারাম..। দৃশ্য-২ (প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ড. সফি মাহমুদ তাঁর বাড়িতে একটি কক্ষে বই কাগজপত্রের স্তূপের মাঝে একটি চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন। তার হাতে ধরা কতগুলো কাগজ।
কিন্তু সেগুলোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সাদা দেয়ালের দিকে। এর মধ্যে বন্ধু কায়েসের আগমন। তিনি সেদিক লক্ষ করবেন না। কিছুক্ষণ দেখে কায়েস গলা পরিষ্কার করবে। তখন সফি সাহেবের ধ্যান ভাঙবে।) সফি : আরে কায়েস যে! কখন এলে? কায়েস : এইতো কিছুক্ষণ…। সফি : হ্যম….. (আর কিছু না বলে হাতে থাকা কাগজগুলোর দিকে নজর দেবে।) কায়েস : (আরেকটু দেখে নিয়ে) কিরে তুই এরকম অসামাজিক হয়ে পড়লি কবে থেকে? অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে, বসতে বল, চা-টা অফার কর। সফি : উহ….! ও …হ্যাঁ..বসতে বলবো। তা বসতে বলতে হবে কেন? তুই না বন্ধু, চেয়ারতো দেয়াই আছে, বসে গেলেই হয়। (এর মধ্যে কায়েস নিজেই চেয়ার টেনে বসে পড়বে) আর চা-টা? ওটা বোধ হয় সম্ভব হবে না, কারণ বাসায় কেউ নেই। কায়েস : নেই মানে? সফি : যে যার তার মত গেছে। কায়েস : কাজের ছেলেটা? হোম ম্যানেজার? সফি : ওরাও গেছে। আমি যদিও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করি কিন্তু শিশু বা বালক বালিকা আমার বাড়িতে কাজ করতে এসে বেশি দিন টেকে না। কায়েস : যাকগে, ভাবি তো আছে। সফি : আরে ওর কথাইতো ভাবছিলাম দেয়ালের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।
কায়েস : মানে..! সফি : ঐ দেয়ালে তুই কিছু দেখতে পাচ্ছিস? কায়েস : না, নাথিং, একেবারে নষধহশ. সফি : জরমযঃ, নষধহশ, তোর ভাবীর আচরণ দেখে আমিও মাঝে মাঝে এ রকম নষধহশ হয়ে যাই। আর তখন নষধহশ নয়নে নষধহশ জিনিসের দিকে তাকিয়ে থাকি। কায়েস : তা ভাবি কী করেছে? সফি : আজ সকালে সাদার ওপর কালো বুটিদার একটি শাড়ি পরে আমাকে এসে বললো, কেমন লাগছে? আমিও তাকে খুশি করার জন্য অনেক ভেবে চিন্তে বললাম, আমাদের গ্রামের বাড়ির পেছনের পুকুরে শীতের সকালে বাঁশের খুঁটির ওপর যে মাছরাঙা পাখিটি বসে, ঠিক তার মতো। বাস, রেগে মেগে আগুন। কেন তাকে এত দূরের জিনিসের সাথে তুলনা করলাম। কায়েস : হা….হা….হা.. তারপর? সফি : তারপর আর কি? পিত্রালয়ের উদ্দেশে যাত্রা। কায়েস : তোর মনে হয় গা সওয়া হয়ে গেছে। শোন, তোর ভাবী হচ্ছে একটা উত্তপ্ত কড়াই। গায়ে পানি সয় না, ছ্যাত, ছ্যাত করে ওঠে।
কায়েস : (হেসে) তাহলে তেল দিবি। সফি : আরে বউকে কত তেলানো যায়? কায়েস : যাক গে, রান্নাঘরটা কোনদিকে বল, আমিই দু কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসি। সফি : ভালোই হয়, অইতো ওই দিকে। (কায়েস যাবে কফি বানাতে আর সফি কাগজপত্রে মন দেবে।) দৃশ্য-৩ (দুলাল এখন কমলাপুর স্টেশনের মুটে বালক। কাজের সন্ধানে এদিক ওদিক ঘুরছে। মাঝে মাঝে দু একজন যাত্রী দেখে ছুটে যায়, ব্যাগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করে, কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হয়। এক পর্যায়ে একজন তাকে গ্রহণ করে।) দুলাল : স্যার, দেইন না ব্যাগগুলা নিয়া দেই। ২০টা টাকা দেয়েন যে। স্যার কাইলা থাইক্যা কুনু কাম নাই, খাওনও নাই। দেইন্ স্যার। যাত্রী : (ভাল করে দেখে) নে ধর, ফেলে দিবি না কিন্তু। দুলাল : না স্যার। (দুটি ব্যাগ মাথায়, আরেকটি ছোট ব্যাগ হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করবে। পেছন পেছন যাত্রীও হাঁটবে।
কিছুদূর যেতে না যেতেই যুবক বয়সী মাস্তান টাইপ এক কুলি এসে তাকে থামিয়ে দেবে।) কুলি : এই পিচ্চি, খারা। (দুলাল দাঁড়াবে) কাস পাইছস দেখা যায়। দুলাল : হ ভাই, পুরা একদিন পরে। কুলি : (ধমকে) তোরে এইখানে কাম দিছে কেডায়? দুলাল : কইলকা মামা আইয়া আপনের লগে আমার পরিচয় করায়া দিল। কুলি : রাখ তোর মামা …। গুল্লি মারি…! (যাত্রীকে উদ্দেশ করে) স্যার, এগুলো অবৈধ কুলি। দেখেন কোন নাম্বার নাই। এরা টাকা চাইবো অনেক বেশি। যাত্রী : না খুব বেশি চায়নিতো, মাত্র ২০ টাকা। (শুনে কুলি দুলালকে ঘাড় ধরে এক পাশে দিয়ে বলবে) কুলি : (চাপা) ওই বলদার পো, ৮০ টেকার মাল তুই ক্যারি করতাছুস মাত্র ২০ টাকা দিয়া। নিজের ভাত মারবি আমাগো ভাতও মারবি? (ব্যাগগুলো জোর করে নিজের কাঁধে নিয়ে লাথি দিয়ে দুলালকে সরিয়ে দেবে) যাত্রী : আরে, আরে, তুমি করছো কি! ওতো ভালোই নিচ্ছিল, নিতে দাও। কুলি : না স্যার, আপনে বুঝবেন না। ও এই মাত্র আমারে কইল যে ওর পিলা আছিল টার্মিনালের বাইরে, ওর বন্ধু ফিট করা আছে, কোন রকমে মালগুলা ওইখানে নিয়া গেলেই ওরা আইসা আপনেরে ঘিরে ধরবে। সুযোগমত মাল নিয়া পলাইবো। আমি এইডা পারুম না স্যার। কারণ আমার নাম্বার আছে। সরদারের কাছে গিয়া নাম্বারটা দিলেই ধরা পইড়া যামু। কিন্তু ওরে পাবেন না। হেয় লইগ্যাই মাত্র ২০ টেকা চাইছে। যাত্রী : (রেগে যাবে) কী…! (একবার দুলালের দিকে তেড়ে যাবে, পরক্ষণে আবার যুবক কুলির দিক ফিরে আসবে) ঠিক আছে চল, তুমিই চল। কুলি : এইতো বুঝছেন স্যার।
আপনে ৮০ টেকা না দেন ৬০ টেবাই দিয়েন। তাও মালগুলা খোয়াইবেন না। (কুলি আর যাত্রী সামনে এগিয়ে যাবে, দুলাল মন খারাপ করে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকবে। এক পর্যায়ে মন খারাপ করে স্টেশন বেঞ্চিতে বসে পড়বে। হতাশভাবে এদিক সেদিক দেখতে থাকবে হঠাৎ দূরে দেখতে পাবে এক ভদ্রলোক প্রকান্ড একটি ব্যাগ নিয়ে টেনে টেনে আসছে। তার মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দেবে। দুলাল দৌড়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যাগটা ক্যারি করতে চাইবে, কিন্তু ভদ্রলোক দেবে না। তাকে আবারো হতাশা ঘিরে ধরবে। এর মধ্যে স্টেশনের অন্য একজন অভিজ্ঞ কুলি তাকে উপদেশ দেবে।) কুলি-২ : আরে বেটা তুইতো রঙ নাম্বারে ডায়াল করছস। ওয় তোরে ব্যাগ নেয়ার লইগ্যা দিব! ভালা কইরা চাইয়া দেখ ব্যাগের তলে চাক্কা লাগানো। ওইডার ভেতর দুই মণ ওজন থাকলেই কি? আমাগোরে যেন পয়সা দেয়া না লাগে হের লইগ্যাই এই বুদ্ধি। গরিবের পেডে লাথ্িথ মারা আর কি। বুঝবার পারছস? (দুলাল তাকিয়ে দেখে যে সত্যি সতিই ব্যাগের নিচে চাকা লাগানো। আর তাতে ভদ্রলোক অবলীলায় বিশাল ব্যাগটি টেনে নিয়ে যাচ্ছে) দুলাল : (হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে) কোন ইঞ্জিনিয়ার এইডা আবিষ্কার করছে, জানতে পারলে ওর বাড়ির সামনে ময়লা ফেলাইয়া আইতাম।
দৃশ্য-৪ (মহিউদ্দীন মেমোরিয়াল এতিমখানা। শিশুকল্যাণ ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী জনাব সফি মাহমুদের মরহুম পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত অনাথ আশ্রম। বর্তমানে পরিচালিত হয় শিশুকল্যাণ ফাউন্ডেশনের অধীনে এবং জনাব সফি মাহমুদ এর পরিচালনা পর্যদের সভাপতি। সকালবেলার দৃশ্য। এতিম ছেলেরা মাঠে খেলা করছে। স্পোর্ট টিচার বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, কাউকে কাউকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিচ্ছেন। ছেলেদের কেউ কেউ মাঠের কোনায় একে অপরের সঙ্গে দুষ্টুমি করছে। এমন সময় স্পোর্টস টিচার বাঁশি ফুঁক দেবেন। সবাই দৌড়ে তার দিকে যাবে।) স্পোর্টস টিচার : সবাই এক সারিতে দাঁড়াও (সবাই দাঁড়াবে)। সাবধান! আরামে দাঁড়াও! সাবধান! আরামে দাঁড়াও! আজকে আমাদের কর্মসূচি হচ্ছে মাঠ পরিষ্কার করা। সবাই গোড়ালির ওপর বসে যাও। আমি বাঁশিতে ফুঁ দেয়ার সাথে সবাই কাজ শুরু করে দিবে। মাঠে যত টুকরো কাগজ, আইসক্রিমের কাঠি, বড়ই বিচি, বকরির লাদি, শুকনো গোবর, যা আছে সব পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। কেউ কোন ফাঁকি দেয়ার চেষ্ট করবে না দু’দিন পর ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আমাদের এতিমখানা পরিদর্শন করতে আসবেন। তিনি যেন এসে দেখেন সব কিছু ফিটফাট। অতএব কাজ শুরু কর। (কথা শেষ করেই বাঁশি ফুঁ দেবে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরাও কাজ শুরু করবে। কাজের মধ্যে পাশাপাশি ব্যস্ত দুই বন্ধু ফটিক ও ছটকু পরস্পর কথা বলবে।) ফটিক : ঐ ছটকু, কইছিলাম না, আমগোরে দিয়া এমন কিছুই করাইবো। ছটকু : সমস্যা কি? এই রকম অনেক জায়গায়াই করায়। ফটিক : তা করায়, তয় অত রইদের মধ্যে না। আর কাম করানির পর, পেট ভইরা চাইট্যা খাইবার দেয়। ছটকু : তা ঠিক কইছুস। এই খানেতে ঐ ব্যাটা ডাইনিং ম্যানেজারই সব খায়া ফেলায়। ফটিক : শোন, অত পরিশ্রমের পর আইজকাও যদি খাওন কম দেয় তাইলে কি করবি? ছটকু : কি আর করমু? আবার চামু।
ফটিক : তাই? চাইতে পারবি? স্পোর্টস টিচার : (ধমকে) এই কি হচ্ছে এখানে? কাজ রেখে কথা? (একজনকে কান ধরে নিয়ে কাতারের অন্য প্রান্তে বসিয়ে দেবে। নে, দু’জন দুই প্রান্তে থাকে।) (সবাই সারিবদ্ধভাবে বসে মাঠ পরিষ্কার করতে থাকবে।) দৃশ্য-৫ (কমলাপুর রেলস্টেশন দুলাল যথারীতি কাজের প্রত্যাশায় প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে আছে। এমন সময় প্রায় সমবয়সী আরও দু’জন কুলি এসে তার সঙ্গে আলাপচারিতা জুড়ে দেবে। দুলাল তাদের কথায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারবে না। একটু শুনবে, একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে কাজের খোঁজ করবে, আবার নিজেও একটু বলবে। এভাবে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বিতন্ডা শুরু হবে। এর মধ্যে একজন দুলালের মাথায় চাঁটি মারবে। এতে সে প্রচন্ড রেগে যাবে এবং একাই দু’জনের ওপর চড়াও হবে। দু’জন চেষ্টা করেও দুলালের সাথে পেরে না উঠে অন্যান্য কুলিদের ডাকা শুরু করবে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ ক’জন কুলি তাদের সঙ্গে যোগ দেবে। এবার সব কুলির সম্মিলিত প্রয়াসের নিকট দুলাল কাবু হয়ে পড়বে। তারা তাকে কিল ঘুষি লাথি চড় মেরে মেঝেতে ফেলে দেবে। তারপরও মার থামাবে না।) দুলাল : (সংলাপ স্পষ্ট হবে) ওমা….বাবা.. গো…! ও আল্লাহ….! (এক একটা আঘাতের সাথে এক একটা আর্তনাদ শোনা যাবে।
এমন সময় স্টেশনে তার বরিশালী মামা এসে হাজির হবে। প্ল্যাটফর্মে এসে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে যে সবাই মিলে তার পাতানো ভাগনেকে মারছে। দৌড়ে গিয়ে দুলালকে আড়াল করার চেষ্টা করবে। মামা : এই কি হইচ্ছে? তোরা সবাই একলা পায়া পোলাডারে মারতে আছিস কেন? একসের বদমাইশ সব কয়ডা। যা কইতাছি, ভাগ হেইয়ার পার থিইক্যা। একদম ঐ কুল যা কইলাম। (মামার ধমকে আস্তে আস্তে সবাই সরে যাবে। তিনি দুলালকে তুলে বেঞ্চিতে বসিয়ে আদর করে মুখ ও গা ঝেড়ে পরিষ্কার করে দিবেন।) দুলাল : উহ… আহ….! মামা : ইশ, দেখছোনি…। ছোড পোলা পাইয়া এহেবারে ঘিইর্যা দরছে। খুব লাগছে, তাই না রে? দুলাল : না…! ওইডা কিছু না আমিও দিছি। মামা : এ..এ..এই দেখি ..দেখি.., ঠোডের কোনা দিয়া রক্ত বাইর হইতাছে। (মুছতে মুছতে) আচ্ছা কও দেখি হেগর লগে লাগতে গেছিলা কেন? এক লগে মিল্যা মিল্যা থাকপা। দুলাল : আমার এই খানে মন টিকতাছে না মামা। কোন কাম টাম পাই ন্।া যাও টুকটাক দুই একটা পাই, তাও সরদারে লইয়া যায়গা। কয় আমি নাকি এই ইস্টিশনের অবৈধ কুলি। আমার কোন সিরিয়াল নাম্বার নাই। তাই কাম করার কোন অধিকারও নাই। মামা : এইডা কি কও! হাছা কথা নি? দুলাল : (জোরের সাথে) হ! মামা : (ভেবে) ঠিক আছে, আর দুইডা দিন থাক কষ্ট মষ্ট কইর্যা। আমি তোমার লাগি অন্য কাম দেখতে আছি।
(আবার ডেকে) কোন বাসা বাড়ির কামে দিলে পারবা? মোর চেনা মানুষ অনেক বড় অফিসার। দুলাল : আমি তো সব কাম করতেই রাজি আছি। কিন্তু পাইলাম কই…? মামা : ঠিক আছে, তাইলে আগামী রোববার দিন আইস্যা মুই তোমারে হের কাছে লইয়া যামু। (দুলাল হেসে ঘাড় ঝুলিয়ে সম্মতি জানাবে) অহন লও, দুইজনে মিল্যা চাইড্যা খাই। (দু’জনে হোটেল বা রেস্টুরেন্টের উদ্দেশে পা বাড়াবে।) দৃশ্য-৬ (এতিমখানার দৃশ্য। সবাই বড় একটা কক্ষে কয়েক সারিতে ভাগ হয়ে খেতে বসেছে। কক্ষময় একটা কানাঘুষার শব্দ, এ ওর দিকে তাকাচ্ছে কারও কারও নজর কখন খাবার দেয়া শুরু করবে বা কি দিবে তার দিকে। এর মধ্যে ফটিক আর ছটকু দেখা যাবে আগের মতই পাশাপাশি বসে চাপা গলায় কথা বলছে) ফটিক : কিরে ছটকু, মনে আছে? পারবি? ছটকু : খুব পারমু, দেখিস তুই। এতিম : (খুশি হয়ে) এই জানিস আজকে নাকি গোশত খিচুরি খাওয়াইবো..? (এমন সময় এক পাশ দিয়ে দু’জন কর্মচারী ঢুকবে। তাদের হাতে বড় ডিশ মাখানো মজাদার খাবার আছে বোঝা যাবে।
সবার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা যাবে। কর্মচারী দু’জনে পেছন দিয়েই এতিমখানার ডাইনিং ম্যানেজার রুস্তুম আলিও প্রবেশ করবে। রুস্তুম আলি বিশালদেহি, মোটা ভূরিওয়ালা ও বদমেজাজি লোক। বাজখাই কণ্ঠের অধিকারী সে সবসময় নিজেকে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর স্বভাবের লোক হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু আড়ালে আবডালে বা একান্তে নিজস্ব পরিবেশে মোটেও তা নয়। ছাত্রদের পাতে খাবার কম দেয়া তার স্বভাব। তাই কোন ছাত্র যেন সেই কম খাবার খেয়ে ক্ষুধা না মেটাতে পেরে আবার তার কাছে বাড়তি কিছু না চায় তার জন্য তার এই ভড়ং।) ম্যানেজার : (কর্মচারীকে) ঠিক আছে তাহলে এক পাশ দিয়ে বিতরণ শুরু কর। তুমি এ পাশে, আর তুমি ও পাশ দিয়ে শুরু কর। আর শোন, সবাইকে একবার করেই দেবে, পরিমাণমত। এরা পোলাপান মানুষ। এদের ক্ষুধাটা পেটে নয় চোখে। বেশি দেখলে বেশি চায়। খেতেতো পারবেই না মাঝখান দিয়ে অপচয় করবে। আমি আবার অপচয় একদম পছন্দ করি না। কর্মচারী-১ : না স্যার, আইজ অপচয় করবো না। আইজাকা পেটে অনেক ক্ষুধা আছে। কর্মচারী-২ : সকাল থাইক্যা মেলা খাটনি গ্যাছেতো স্যার। ম্যানেজার : (মারার ভঙ্গিতে হাতে দেখিয়ে) একটা দেবো ধরে! আমার মুখের ওপর দিয়ে কথা! ঠিক যা বলেছি তাই করবে। আরে, কিছু থাকলে কি সেটা আমি একা একা গিলবো? তোমাদেরকে দেবো না? যাও, দেয়া শুরু কর। এই ছেলেরা, বেশি হইচই হচ্ছে কিন্তু, একদম চুপ। খেতে বসে কথা বলতে নেই। সবাই লক্ষ্মী ছেলের মতো চুপচাপ খেয়ে, যার তার প্লেট সঙ্গে নিয়ে কলপারে গিয়ে হাত ধুবে। মনে থাকে যেন..? সবাই : জি স্যার। ম্যানেজার : হুম….। (খিচুরি বিতরণ চলতে থাকবে, ম্যানেজার আলগা ভাব নিয়ে কিছুক্ষণ তদারকি করে পাশে নিজের কক্ষে প্রবেশ করবে। পাতে অল্প খিচুরি দেখে কেউ মনোক্ষুণœ হবে। কেউ এতেই খুশি হবে কেউবা বিতরণ শেষ হতে হতে খাইয়াই শেষ করে ফেলবে।
তারপর বসে বসে। প্লেট চেটে খাবে বা আঙুল চুষতে থাকবে। সবাইকে একবার দেয়া হলে কর্মচারীরা সন্তর্পণে যেন ম্যানেজার না দেখে কাউকে কউকে দ্বিতীয়বারের মতো খিচুরি দেবে) কর্মচারী-১ : পাতে দ্বিতীয়বার দিয়ে চুপচাপ খাইয়া উঠ। কতা কইলে তোগোরও বিপদ আমাগোরও বিপদ। (ম্যানেজার তার কক্ষের দরজা লাগিয়ে দিয়ে কোন খাত থেকে কত মারা যাবে তার হিসাব কষছে। তার হাবভাব আর চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক বোঝা যাবে যে অবৈধ উপার্জন ভালোই হয়েছে। টেবিলে দেয়া ডিশভর্তি খিচুরি থেকে বিশ্রীভাবে খাচ্ছে রসিয়ে রসিয়ে গান গাচ্ছে, না অঙ্গভঙ্গি করছে, আর পরিহিত বিশাল আলখিল্লার অসংখ্য পকেট থেকে এই কাগজ সেই কাগজ, এই টাকা সেই টাকা বের করে মিলিয়ে দেখছে সব ঠিক আছে কি না। খিচুরি খাওয়া শেষ করে পাশে গ্লাস রেখেও জগ ধরে পানি খাবে। তারপর কক্ষের কোণ থেকে ৪-৫ চাল ডালে একটি পুঁটলা নিজের আলখিল্লার বিশালকায় ফ্রন্ট পকেটে লুকিয়ে ফেলবে। এমন সময় বাইরে একটু হইচই শুনে দরজা খুলবে।
ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়াবে। সাথে সাথে সবাই চুপ হয়ে সে যার তার পশিজনে স্থির হয়ে থাকবে। ম্যানেজার পুরো হল একবায় চোখ ঘুরিয়ে দেখবে যে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে? আর কেউ লাইন ভেঙে ২-৪ স্টেপ সামনে এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ফটিক আর ছটকু একটু বেশি অগ্রসর।) ম্যানেজার : কী হয়েছে? একটা হইচই শুনতে পেলাম মনে হয়। কর্মচারী-১ : দেখেন না স্যার, এই পোলাডা (ছটকুকে দেখিয়ে) আরও চায়। ছটকু : হ্যাঁ চাইছি, আমার পেট ভরে নাই তাই। কর্মচারী-১ : অত কইরা বুঝায়া কইলাম যে নাই, দিমু কই থাইক্যা? আর একবারের বেশি দেয়া স্যারের নিষেধ?…। ছটকু : (কথা কেড়ে নিয়ে) তো নিষেধ হইলে হারে দিচ্ছেন কেমনে? ওরে দিচ্ছেন ক্যামনে? অহন আমায় বেলায় নাই কেন? (কথা শুনে ম্যানেজার শুধু চোখ কটমট করে একবার কর্মচারীর দিকে তাকাবে। এতই তারা ভয়ে জড়সড় হয়ে যাবার পর আরও গম্ভীর হয়ে ছটকুর দিকে এগিয়ে যাবে। ছটকু ভয় না পেলেও অবাক হবে। বাকি সবাই বাকরুদ্ধ। আতঙ্ক আর আশঙ্কায় পাথর হয়ে যাবার উপক্রম। ম্যানেজার ছটকুর কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াবে। তারপর…) ম্যানেজার : (ভয়ঙ্কর হুঙ্কার ছেড়ে) এতবড় সাহস! আমার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে মুখে কথা! (এক ঝটকায় ছটকুকে ধরে খিচুরির ডিশে তুলে নেবে। তারপর চ্যাংদোলা করে সেটা নিয়ে তার কক্ষে ঢুকে দরজা আটকে দেবো) দৃশ্য-৭ বরিশালের মামার কথা অনুযায়ী দুলাল এখন ড. সফি মাহমুদের বাসার কাজের ছেলে। নানাবিধ কাজের তৎপরতা দেখে বোঝা যাবে যে, দুলাল আগের চেয়ে অনেক চালু হয়েছে। এই ঘর পরিষ্কার করছে, পর মুহূর্তেই শেলফের বই গোছাচ্ছে, আবার এর ডাকে ওর ডাকে সাড়াও দিচ্ছে ইত্যদি।
দৃশ্য-৮ ছটকু এতিমখানার বারান্দা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে একটা ছায়াযুক্ত জায়গা দেখে বসবে। তাকে দেখতে পেয়ে মাঠে খেলতে থাকা ফটিক সেন্টু, হাবিলসহ আরও কয়েকজন সহপাঠী ছুটে আসবে। তাকে ঘিরে ধরে নানা খোঁজখবর নিতে থাকবে। ফটিক : তরে খুব মারছে, তাই নারে দোস্ত? সেন্টু : ইশ, হাতে পায়ে কেমন দাগ ফালায়া দিছে! হাবিল : জামার নিচেও আছে? (তুলে দেখবে সেখানেও দাগ) আহারে এইডা মানুষ না পিশাচ! ফটিক : (দাগে হাত বুলিয়ে) মাফ কইরা দিস দোস্ত, আমার কথায় তুই..। ছটকু : (কথা কেড়ে নিয়ে) আরে ধ্যাত্! আমার গায়ে যত না লাগছে তার চেয়ে বেশি লাগছে মনে। (এর মধ্যে সেন্টু কয়েকটা দূর্বা চিবিয়ে কচলে তা থেকে রস বের করে ছটকুর আঘাতের জায়গা দিতে চাইবে) সেন্টু : নে দোস্ত, আমি তরে একটা ওষুধ বানায়া দেই। ছটকু : (ঝাঁকি দিয়ে সরিয়ে) রাখ তোর ওষধ! দুই দিন পর এগুলো লাগায় কি হইবো? আমি যদি খালি আমার মত আরেকটা পাইতাম, তাইলে ঐ ম্যানেজারের বুঝায় দিতাম আমাগো রিজিক মাইরা খাওয়ার মজা কত। কিন্তু তোরা তো সব ভিতুর ডিম। ফটিক : আচ্ছা দোস্ত, আস্তে আস্তে সব হইবো। তয় এই খানের আড্ডাটা এখন ভাইঙা দে। দেখলে পরে আবার …।
ফটকু : তা তুই টিকই কইছস। এই যা তরা সবাই খেলতে যা। (সবাই আবার মাঠে ছড়িয়ে পড়বে। ছটকু একা একা এক খন্ড পাথর বা ইট নিয়ে আরেক খন্ড ইট বা পাথরের ওপর আনমনে আঘাত করতে থাকবে।) দৃশ্য-৯ (সফি মাহমুদ দুলালকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে লেকচার শুনাচ্ছেন। দুলাল তার চেয়ারের সামনে মেঝেতে বসে মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার চেষ্টায় হাঁ করে কথা গেলার প্রয়াস চালাচ্ছে। মাথা নেড়ে মাঝে মধ্যে তার বোধগম্যতার জানান দিচ্ছে) সফি : বুঝেছিস, সারা পৃথিবীর মানবসমাজ আজ দুটো ভাগে বিভক্ত; শাসক ও শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। এই শোষিত, বঞ্চিত, পদদলিত মানুষেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান। আজ যারা বাষ্প শকাঠে চড়ে বেড়াচ্ছে, বহুতল ইমারতে বসবাস করছে, তারা আদৌ জানে না যে এ ইমারতের ইটের ভাঁজে ভাঁজে কত শোষিত-বঞ্চিতের রক্ত ঘাম লেগে আছে। (সফি মাহমুদ ইত্যকার লেকচার দিয়ে যাবেন, দুলাল শুনে শুনে হ্যাঁ-হু করলেও মুখের ভাবভঙ্গিতে বোঝা যাবে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। একপর্যায়ে বলেই ফেলবে…) দুলাল : খালু জান কি ছাতা কন বুঝি না..। শোষিত বঞ্চিত হেইতা আবার কী? সফি : আচ্ছা, বুঝতে পারছিস না….।
ঠিক আছে বুঝিয়ে বলছি। যেমন তুই হচ্ছিস গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের এক দারিদ্র্য নিষ্পেষিত, অধিকার বঞ্চিত অসহায় শিশু। দুলাল : (মুখ খিঁচিয়ে) কী কইলেন! তিরতীয় বিশ^! হেইডা আবার কী সফি : ণবং, তৃতীয় বিশ^। ও সবধহ ঃযরৎফ ড়িৎষফ, মানে তিন নম্বর দুনিয়া। দুলাল : ওমা! আল্লাহর দুইন্যাতো একটাই আছে জানি, হেই আনে আমার তিন নম্বরে দুনিয়া আইলো কই থাইক্যা! সফি : আরে এই তিন নম্বর সেই তিন নম্বর না। তৃতীয় বিশ^ বলতে পৃথিবীর গরিব দেশগুলোকে বোঝানো হয়েছে। দুলাল : ও, এইবার বুঝতাম পারছি। জে, হের পরে কইন। সফি : তোদের মত এরকম তৃতীয় বিশে^র শিশুদেরকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে পৃথিবীর অনেক সংগঠন। আমাদের দেশেও আছে। তার একটা হচ্ছে আমার শিশু কল্যাণ ফাউন্ডেশন। দুলাল : (কথার মধ্যেই মাথা চুলকে) উহ…! মাথাডা খুব খাইজ্জইতাছে। সফি : চুলকা, এটা তোর অধিকার। (দুলাল দু’হাতে খুব করে মাথা চুলকাবে) শোন, তোদের ভাগ্যাকাশের কালো মেঘ অচিরেই দূর হয়ে যাবে। এই তোদের কথা চিন্তা করেই ইউনিসেফের সাবেক মহাপরিচালক হুয়ান সোমাভিয়া বলেছেন….। দুলাল : (কথার মাঝে খানে) খালুজান, আমি এইবার যাই। এইডা আমার অধিকার না? সফি : (রেগে গিয়ে) কি সেই কখন থেকে যাই যাই করছিস! ও ভালো কথা শুনতে ভালো লাগে তাই না? এই জন্যই তোদের জীবনে কোন উন্নতি হয় না। যা, ভাগ আমার সমনে থেকে। (দুলাল থমমত খেয়ে বেরিয়ে যাবে। সফি সাহেব তার হাতের কাগজ বই টেবিলের ওপর বিরক্তি সহকারে রেখে দেবেন।
তারপর ধপ করে চেয়ারে বসে পড়বেন।) দৃশ্য-১০ পুকুরঘাট। এতিমখানার ম্যানেজার খালি গায়ে, চটি পায়ে, গামছা-লুঙ্গি কাঁধে নিয়ে গোসলের উদ্দেশ্যে ঘাটে গিয়ে বসবে। তার এক হাতে থাকবে সাবান আরেক হাতে সরষের তেলের বোতল। মনের সুখে গুন গুন করতে করতে ঘাটের কোনায় কিছুক্ষণ বসবে; তারপর গামছা লুঙ্গি সাবান রেখে সরষের তেলের বোতলটা ঝাঁকিয়ে দিয়ে খানিকটা তেল আঙুলে লাগিয়ে নাকে ও নাভিতে দেবে। এরকম কয়েকবার করার পর হাতের তালুতে তেল নিয়ে দু’হাতে ঘষে সারা গায়ে হাতে পায়ে মাখা শুরু করবে। মাঝে মাঝে থেমে থেমে পুকুরে পাড়ে বিভিন্ন বৃক্ষশাখায় বসে থাকা পাখির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাবে। এমন সময় দেখা যাবে ছটকু, ফটিক, সেন্টু, হাবিল এসে একটি গাছের আড়াল থেকে ম্যানেজারের কর্মকান্ড দেখছে।) ছটকু : (স্বাগত) এতিম পোলাপানের কিসমত মাইরা নিজের গায়ে তেল বানাইছ, আবার ওপর দিয়াও তেল মাখ। মাখ ভালা কইরা, বুঝবা। ফটিক : কিরে কি করছস তুই? সেন্টু : তেলের মধ্যে কিছু দিচ্ছিস নাকি? ছটকু : দেখ খালি তাকায়। হাবিল : ঐ তেলের বোতল তুই পাইলি ক্যামনে? (এরা কথা বলতে বলতে ওই দিকে ম্যানেজারের অ্যাকশন শুরু হবে। সে প্রথম প্রথম সামনে নেয়ার চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণ পরই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ভয়ানক রকম চুলকানি আর গাত্রদাহে পাগল প্রায় হয়ে যাবে। উদভ্রান্তের মত সে এই পানিতে ডুব দেবে। এই সাবান মাখবে, আবার সাবান ফেলে দিয়ে কাদা মাখবে, আবার ডুব দেবে, পরক্ষণেই উঠে এসে গাছের সাথে পিঠ ঘষবে। ঘাসের ওপর গড়াগড়ি দেবে, আবার ছুটে গিয়ে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এসব দেখে ছেলেরা আড়ালে হাসতে থাকবে। তবে ফটিকের একটু মায়া লাগবে।) ফটিক : দোস্ত, ভোজ বেশি হইয়া গেছে মনে হয়। এতটা করা ঠিক হয় নাই। ছটকু : (থামিয়ে দিয়ে) চুপ কর। আমারে পুরা দুইডা দিন ঘরে আটকায়া রাখছে। আমার সামনে বইস্যা হেয় খাইছে, অথচ আমারে এক চিমটিও দেয় নাই। দৃশ্য-১১ (কোন এক নির্জন দুপুরে দুলাল সফি সাহেবের জন্য সিগারেট কিনে বাড়ি ফিরছে। প্রচন্ড রৌদ্রতপ্ত দুপুর। তাই গলিটাও নীরব। আশপাশে কেউ নে এমন সময় মোটরবাইকে চড়ে দু’জন মাস্তান ধরনের ছেলে এসে দুলালের পথ আগলে দাঁড়াবে। পেছনের জন ঝটপট নেমেই দুলালকে ল্যাঙ বা ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেবে। দুলাল ঝটপট উঠে গা ঝেড়ে জিজ্ঞেস করবে..) দুলাল : (কিছুটা ভয়েও থাকবে) কি অইলো, আমারে আটকাইছেন ক্যারে? মাস্তান-১ : তোর প্যান্টের পকেটে চেক করে দেখ। (যে ধাঁকা মেরেছিল) দুলাল : (তা দিয়ে) হায় হায়! আমার টেহা কই! খালুজান আমারে ৫০০ টেহা নোট দিচ্ছিল, বাকি টেকা ফিরত দিতে না পারলেও আমারে মাইরা লাইবে.. ইত্যাদি বকতে থাকবে)
মাস্তান-১ : হাম-হাম-হাম .. (হাতে টাকা দেখিয়ে) এই যে তোর টাকা। দুলাল : (হাসি ফিরে আসবে) ও -ও- ও..! আপনের কাছে গেছে ক্যামনে? আইছা দেইন, আমি যাই। (টাকা নিতে যাবে কিন্তু মাস্তান সরিয়ে নেবে) মাস্তান-১ : তোর পকেটের টাকা আমার কাছে এলো ক্যামনে…? তুই তো কিছু টেরও পাস নাই, তাই না? দুলাল : (অবাক হয়ে থেকে) না, ক্যামনে করলেন ? জাদু জানুুইন? মাস্তান-১ : হ্যাঁ, এই জাদু তোকেও শিখিয়ে দেবো। আমাদের সঙ্গে আয়। দুলাল : মানে….। মাস্তান-১ : আরে অনেক ইনকাম। খালি একটু সাবধান থাকলেই হয়। দুলাল : আ- আ- আমি যাই, দেরি হইয়া যাইতাছে, খালাম্মা বকা দেবো। মাস্তান-২ : রাখ তোর খালাম্মা! আমাদের সঙ্গে যোগ দে, পুরা ক্যাডার বানায়া দিমু। (অপরজনকে উদ্দশে করে) দে, ওর টাকা দিয়া দে। (মাস্তান-১ : টাকা দিয়ে দেবে। দুলাল সেটা নিয়ে দ্রুত পায়ে চলে যাবে। মাস্তানদ্বয় নিজদের মধ্যে হাসাহাসি করতে করতে এলাকা ত্যাগ করবে) দৃশ্য-১২ এতিমখানার ম্যানেজার তার কক্ষে খালি গায়ে বসে বাতাস লাগছে। মাথার ওপর ফুল স্পিডে সিলিং ফ্যান ঘুরছে, তারপরও দুই পাশে দুটো স্ট্যান্ড বা টেবিল ফ্যান চালিয়ে ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে বসে আছে। দু’জন কর্মচারী তার ক্ষতস্থানসমূহে মলম লাগিয়ে দিচ্ছে।) ম্যানেজার (মলম লাগাতে উদ্যত হতেই) এই এই এই আস্তে আস্তে … আগে দেখ আবার মলমের মধ্যে কিছু মিশিয়ে রেখেছে কি না।
কর্মচারী-১ : সেইটা সম্ভব না। এই মলম আমি ড্রয়ারে তালা মাইরা রাখছিলাম। আর আপনেওতো রুম থাইক্যা বাইর হন নাই। ম্যানেজার : ঠিক আছে, লাগিয়ে দাও, সাবধানে, ভীষণ জ্বলে কিন্তু, ছিলে গেছে (ওষুধ লাগাতে থাকবে আর কথা বলতে থাকবে) কর্মচারী-২ : তেলের বোতলডা যে কেমনে চিনল? কর্মচারী-১ : কামডা যে কেডা করলো সেই টাইতো ভাইবা পাই না। ম্যানেজার : আমি পাই। কর্মচারীদ্বয়: (অবাক হয়ে) জীব …। আপনে বুঝবার পারছেন? ম্যানেজার : (স্বগত) বড় ধুরন্ধর পোলা…। হাতে নাতে একবার ধরতে পারলেই হলো। ছোট মানুষ বলে ছেড়ে দিলে হবে না, আরো সাবধান থাকতে হবে। দৃশ্য-১৩ (ফটিক, ছটকু, সেন্টু, হাবিল চার বন্ধু ছুটকার খাটে বসে পর্যালোচনা করছে। বাকি দু’জন রুমমেট তাদের সাথে খুব সক্রিয় না হলেও সমর্থন দেয় সেটা বোঝা যাবে। তারা তাদের জায়গায় বসে থাকলেও আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে কান দেবে, দু-একটা কথাও বলবে।) ফটিক : (ছটকুকে) সাবধান তোকেও হতে হবে। হাবিল : হ্যাঁ, তুই ওর গায়ে আগুন জ্বালায়া দিস, অহন খালি চান্স খুঁজবো ক্যামনে তোরে ধরা যায়। সেন্টু : আর তুই ধরা খাওয়া মানে আমাগো চাইর জনই ধরা খাওয়া। (এ সময় আলগা বসে থাকা বাকি দু’জনের একজন কথায় ধরবে) নয়ন : খালি তোরা চাইর জনই না। এই রুমের সবাইরে ধরব। (সঙ্গে সঙ্গে অপরজনও কণ্ঠ মিলাবে।) সাগর : ঠিক। তবে একটা বিষয়, তুই ম্যানেজারের সাথে যা করছিস সেটা ভালো না খারাপ তা নিয়া আমি কিছু কমুনা। খালি বুঝি ওই ব্যাটার একটা শাস্তি হওয়া দরকার ছিল। ছটকু : (খুশি হয়ে) তাইলে তো হইয়াই গেল। দোস্ত, আমরা সবাই এক জোট। আর কোন ডর নাই। নয়ন : আছে, এ খালি সিটে যে আসবে যে আমাগো মতো নাও হইতে পারে।
ছুটকু : হু.. (চিন্তিত মানে) দৃশ্য-১৫ (জনাব সফি মাহমুদ নিজের সাথে করে দুলালকে এতিমখানায় নিয়ে এসেছে) সফি : এই ছেলেটা বেশ কদিন ধরে আমার বাসায়, কাজ কর্ম ভালোই করে, পড়াশুনার দিকেও আগ্রহ আছে মনে হয়, তাই নিয়ে এলাম। কর্মকর্তা : কিন্তু স্যার আপনার বাসায়? সফি : সে হবে ক্ষণ, শিক্ষা অর্জন করা মানুষের অধিকার, সুযোগ নয়। কর্মকর্তা : ওকে, আমরা তাকে নিয়ে যাচ্ছি। (নাম ধাম ক্লাস লিখে দফতরিকে ডাকবে) এই কফিযুল..! কফিযুল : (ব্যস্ত হয়ে ) জি স্যার….! কর্মকর্তা : যাও, একে ক্লাস ফৌরে দিয়ে এসো। আর ওর জিনিস পত্রগুলো গুছিয়ে দাও, কোথায় থাকবে সেটাও দেখিয়ে দাও। (কফিযুল দুলালকে নিয়ে বারান্দা দিয়ে যেতে থাকবে। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বা আড্ডা মারতে থাকা অনেক ছাত্র তার দিকে লক্ষ্য করবে। কেউ কেউ তাদের নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করবে। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে দুলালকে তার শ্রেণিকক্ষ দেখাবে, তারপর মাঠ, বাগান, পুকুর দেখাবে। শেষে হোস্টেল কক্ষে নিয়ে আসবে। সেখানে আগে থেকে.. আস্তানা করতে থাকা অন্য ছাত্ররা তাকে স্বাগত জানাবে।) কফিযুল : এই ছেলে, এ-এ এই হইলো দুলাল মিয়া, তোমাগো নতুন ফেরেন্ড। (দুলাল জিনিসপত্র নিয়ে ঢুকবে) আইজ থাইক্যা হেয়ও থাকবো এইখানে। (খাটটা দেখিয়ে) এইডা হইলো গিয়া তোমার বিছানা, ৭ নম্বর বেড লাকি সেভেন। নেও এখন গোসল টোসল কইরা ফেরেশ হইয়া লও। আর এগোর লগে খাতির কইরা ফেলাও।
(এই বলে চলে যেতে উদ্যত হবে, তখন ছটকু তাকে পেছন দিয়ে ডাক দিবে) ছটকু : কফিযুল চাচা..। কফিযুল : (থামবে) কী ব্যাপার….? ছটকু : (কাছে গিয়ে) কই থাইক্যা আইছে, বাড়ি কই? কফিযুল : জানি, তয় ডিরেক্টর স্যার নিজে লইয়া আইছে, মনে হয় তাতে এলাকার পোলা। ছটকু : তাই না কি? কফিযুল : হ্যাঁ, আমি যাই। (কফিযুল চলে যাবে। ছটকু আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাববে। তারপর এগিয়ে গিয়ে নিজ উদ্যাগে দুলালের বিছানা গুছিয়ে দেওয়া শুরু করবে।) দুলাল : (অবাক হয়ে) আরে আরে করতাছ কি! আমি গুছাই, তোমার লগোতো অহনও পরিচয় হয় নাই। ছটকু : আমরা সবাই এক ক্লাসে পড়ি, এক রুমে থাকি, এইডাই বড় পরিচয়, বাকি জানাজানি থাকতে থাকতে হইবো। (অন্য বন্ধুরকে উদ্দেশ করে ) এ এই, তোরাও হাত লাগা। (ছটকুর নির্দেশে ফটিক, সেন্টু, হাবিল, এবং আরো দু’জন দুলালের জিনিসপত্র গুছানো শুরু করবে। দুলাল এহেন বন্ধুসুলভ ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হবে।) দৃশ্য-১৪ সফি মাহমুদের বাড়িতে কর্মব্যস্ত দুলাল। বেগম সাহেবের হুকুমে কিছু একটা আনতে যাচ্ছে এমন সময় ছেলে হুকুম করবে তার প্যান্ট ইস্ত্রি করে দেয়ার জন্য। সে দ্রুত গিয়ে ইস্ত্রিটা হিট দিয়ে বাইরে যেতে উদ্যত হবে। এর মধ্যে মেয়ে হুকুম করবে টেইলর থেকে কাপড়গুলো এনে দিতে। শুনে খানিকটা এগুতেই আবার বেগম সাহেব বলবে গরম পানিয় হাঁড়িটা বাথরুমে দিয়ে আসতে।
সব মিলিয়ে বোঝা যাবে দুলালের কাজের কোনো শেষ নেই এবং এখানে এসে সে মাঠেও শান্তিতে নেই। বাথরুমে গরম দিয়ে ফেরার সময় আবার ছেলে দেখে বিলম্বের জন্য বকাঝকা শুরু করবে। এদিকে দুলালের প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থা।) দুলাল : ইশ …! খাই না খাই ইস্টিশনেই ভালো আছিলাম (স্বগত) সফি : (পেছন দিয়ে ডেকে) দুলাল। আতঙ্কিত হয়ে পেছন ফিরবে) তোকে এখানে আর থাকতে হবে না। রেডি থাকিস, কাল এক জায়গায় নিয়ে যাবো। (দুলাল মিটি মিটি হাসবে) দৃশ্য-১৫ (এতিমখানার ডাইনিং হলে সবাই সারিবদ্ধভাবে খেতে বসেছে। ফটিক, ছটকু, সেন্টু হাবিল, নয়ন, সাগরের সাথে এবার দুলালও যোগ দিয়েছে। তারা সবাই এক সঙ্গে বসেছে। খাওয়ার মাঝখানে আলখিল্লা পরা ম্যানেজার এসে সব তদারকি করছে) ফটিক : (চাপাগলা) দুলাল দেখ, এইডা হইছে ডাইনিং ম্যানেজার। ছটকু : (চাপা হাসি হেসে) দেখতে খুব হ্যান্ডসাম, তাইনারে? হাবিল : কালা পাহাড় …। সেন্টু : ব্যাটা কোন দোকানের চাল খায় কে জানে। দুলাল : (ম্যানেজারকে ভাল করে দেখে) কোন দোকানের চাল না, বল কোন চালের দোকান খায়। (দুলালের কথায় গ্রুপের সবার হাসির রোল পড়ে যাবে। তবে কেউ শব্দ করে হাসবে না, সবাই চেপে রেখে হাসবে আর নিচের দিক তাকিয়ে খাবার খেতে থাকবে।) নয়ন : না হাইস্যা পারলাম না, তোর বুদ্ধি আছে দোস্ত। (চাপাগলায় কথা বলা আর চাপাহাসি হাসলেও সেটা ম্যানেজারে দৃষ্টি এড়াবে না। কারণ তার একটা চোখ বরাবর ছটকুর দিকে থাকবে। ওদিকে তাদের প্লেটের খাবারও শেষ হয়ে আসবে।
দুলাল বসে সে প্লেটাই খুব পরিষ্কার করে খাচ্ছে। এমন সময় ম্যানেজার এসে বাজখাই গলায় জিজ্ঞেস করবে…) ম্যানেজার : এইখানে কী হচ্ছে? তোরা হাসাহাসি করছিস কেন? (থতমত খেয়ে কোন কিছু না ভেবেই দুলাল দাঁড়িয়ে যাবে। যেহেতু ম্যানেজারের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সে পুরোপুরি অবগত নয়, তাই সে অবলীলায় কথা বলে যাবে) দুলাল : না স্যার, হাসাহাসি না। আমরা কইছিলাম খাবারটা খুব মজা হইছে। তাই আমরা আরেকটু কইরা চাই। তা ছাড়া ক্ষুধাটাও পুরোপুরি মেটেনি। খালি আমি না, দেখেন এ রকম আরো অনেকেই আছে। সবাই প্লেট খালি কইরা বসে বসে আঙুল চুষছে, কিন্তু লজ্জা সঙ্কোচ ছাইড়া কেউ চাইতে পারতাছে না। তাই সবাইরেই দেন স্যার। (দুলালের কথাগুলো ম্যানেজারের কানে তীরের মত বিঁধতে থাকবে। অন্যরা দুলালের সাহস দেখে অবাক হয়ে যাবে। বন্ধুদের কেউ কেউ ইশারায় চুপ করতে বলবে। কিন্তু দুলাল চুপ না করে তার কথা শেষ করবে। কথা শেষ হলে ম্যানেজার রাগে ফেটে পড়বে। খেই হারিয়ে ধরবে কি মারবে ঠিক বুঝতে না পেরে বিশাল ভুঁড়ির পেট দিয়ে দুলালকে ঠেলে নিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরবে।)
ম্যানেজার : তুই তোর পেটের কথা ভাব। সবার পেট নিয়ে তোরে চিন্তা করতে বলছে কে? নেতা হইতে চাও না? নেতা? (কথা বলতে থাকবে আর দুলালকে দেয়ালের সঙ্গে ক্রমেই শক্তভাবে চেপে ধরতে থাকবে। উপায়ান্তর না দেখে একপর্যায়ে সে ম্যানেজারে নাভির মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে চাবির মত মোচড় দেবে …. ম্যানেজার সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে ছেড়ে দেবে। এ দৃশ্য দেখে সবার মাঝে হাসির রোল পড়ে যাবে। তবে এবার আর চাপা হাসি না, একেবারে প্রকাশ্যে। একটা বিশৃঙ্খলা অবস্থার সৃষ্টি হবে। ম্যানেজার কর্মচারী মিলে সবাইকে ধমকে শান্ত করার চেষ্টা করবে। এর মধ্যে দুলাল হন হন করে বেরিয়ে সোজা তার কক্ষের দিকে ছুটবে। কিছুক্ষণের মধ্যে গ্রুপের অন্য বন্ধুরাও পানি খেয়ে হাত দুয়ে কক্ষের দিকে রওনা হবে। দুলাল তার রুমের কাছে গেলে পাশের রুমের কয়েকটা সিনিয়র ছেলে তার পথ আগলে দাঁড়াবে।)
ছেলে-১ : কি মিয়া, অমন হন হন কইরা কই যাইতাছ? বাথরুম পাইছে না কি? ছেলে-২ : আমরা তোমার বড় ভাই, পাশের রুমে থাকি, একটু সেলাম-টেলাম দিতে জানো না? (দুলাল কিছু বলবে না। শুধু ঘাড় নিচু করে উত্তেজিত ভঙ্গিতে চোখ ঘুরাবে) ছেলে-৩ : (মাথায় চাঁটি) কথা কও না কেন? খালি চোখ গরম কইরা ঘাড় তেড়া কইরা কি দেখ? দুলাল : (মাথা তুলে) আমি আপনাদের খেয়াল করি নাই। কিন্তু আপনেরাতো করছেন। তো আপনেরাই সেলামটা দেন। (এ কথা শুনে তিনজনের মধ্যে হাসিও পাবে উত্তেজনাও পাবে। তারা এটাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে শুরু করবে।) ছেলে-১ : (হেসে) হে-হে-হে-.. কয় কি! আমরা নাকি ওরে সালাম দিব! হা- হা- হা… ছেলে-২ : পোলায় ছোট হইলে কি হইবো গোটা পাকনা মনে হয়। (দুলাল আর কিছু না বলে মেতে উদ্যত হবে।) ছেলে-৩ : (বুকে ধাক্কা দিয়ে থামিয়ে) খাড়াও মিয়া! সাহসতো দেখি কম না। আামাগোরে এখনো তুমি ঠিক চিনবার পার নাই। দুলাল : আপনেরাও আমারে চিনেন নাই। কমলাপুর ইস্টিশনে একলাই তিনটারে শায়েস্তা করছি।
আইজ ম্যানেজাররে করছি…। ছেলে-১ : (মুখের ওপর) ও মাম্মা..! চাপাতো ভালাই চলে দেখা যায়..। দেইখ্যাতো মনে হয় এখনো বিছানায় হিসু করস। দুলাল : খালি চাপা না, হাতও চলে। ছেলে-৩ : তাই নাকি! তা কি করবি, হ্যাঁ, কি করবি…? (দুলালের গায়ে গা লাগিয়ে ঠেলতে থাকবে। দুলাল লক্ষ্য করবে যে তার এঁটো হাত শুকিয়ে গেলো তাতে এখনো কিছু ঝাল মরিচের মত লেগে আছে। হঠাৎ সেই হাত দিয়ে ছেলে-৩ এর চোখে মুখে এক ঘুসি দিয়ে বসবে। ছেলে-৩ সঙ্গে সঙ্গে বাবাগো মা গো বলে ছিটকে পড়বে। পেছন দিয়ে দুলালে বন্ধুরা চলে আসবে। তিন বড় ভাই আর কোন কথা না বলে ভবিষ্যতে প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিতে দিতে স্থান ত্যাগ করবে।) দৃশ্য-১৬ (এতিমখানার সীমানার বাইরে রাতের জমাট অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে দু’জন ব্যক্তি কারও জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ম্যানেজার খুব সাবধানে তাদের কাছে এসে দাঁড়াবে। ব্যক্তি দু’জনের একহন লাইটার জ্বালিয়ে সিরগারেট ধরাবে। তখন দেখা যাবে যে তারা সেই গলির মাস্তান। এর আগে তারা দুলালকে পিক-পকেটিং-এর প্রস্তাব দিয়েছিল।)
মাস্তান-১ : এতে দেরি হইল কেন? মশায়তো কামড়ায়া শেষ কইরা ফেলল। ম্যানেজার : সবাই ঘুমাইলে পরে আসতে হলো। কোন দিক দিয়া কার চোখে পইড়া যাই ঠিক আছে? মাস্তান-২ : ঠিক আছে, এখন দেন, জিনিসগুলো দেন। ম্যানেজার : (টাকার বান্ডিল দিয়ে) এইটা চাল আর তেলের। গম আর চিনির টেকা এখানো পাই নাই।
মাস্তান-১ : হুম, শেয়ার কত কত? ম্যানেজার : ৪০-৬০, মানে আপনেরা ৬০ পার্সেন্ট। মাস্তান-১ : ঠিক আছে। শেয়ারে যেন কোন গোলমাল না হয় .. আর একটা কথা। ম্যানেজার : (খুব তৎপরতার সাথে) কি কথা? মাস্তান-১ : শুনলাম ডিরেক্টরের বাসায় কাজের পোলাডা নাকি এখানে ভর্তি হইছে। ম্যানজার : হ্যাঁ, দুলাল এক নম্বর বজ্জাত পোলা। (মাস্তান কিছু না বলে শুধু মাথা ঝাঁকাবে। বোঝা যাবে তাদের কিছু একটা উদ্দেশ্য আছে। তারপর প্রস্থান।) দৃশ্য-১৭ (তিন বড় ভাই মিলে দুলালকে শায়েস্তা করার ফন্দি এঁটেছে।
সুনসান রাতের নীরবতায় তারা তিনজন দুলালদের রুমে ঢুকবে। অন্ধকারের মধ্যেই পা টিপে টিপে দুলালের বেডের কাছে দাঁড়াবে। তারপর সঙ্গে করে আনা বোতলের পানি দিয়ে দুলালের কোমরের নিচ থেকে ভিজিয়ে দেবে। খুব সাবধানে তারা বিছানায় পানিটা ঢালবে। গায়ে লাগবে না তাই দুলালের ঘুমও ভাঙবে না। ঢালা শেষ হলে দরজাটা আবার টেনে দিয়ে তিনজন চুপচাপ বেরিয়ে যাবে। ওি