গহণ বোধে

‘-শুয়োরের বাচ্চা, আমি আজকে রাতের মধ্যে শেষ করতে বলছি, আজকে রাতের মধ্যে! কথা তোর কানের **** মধ্যে যায় না? আর কিছু হইলেই ফোন দেও কেন টাকা দেয় কে তোর বাপ? বলছি না বাসায় আসলে ফোন দিবি না, *****। রাতের মধ্যে কাজ শেষ করবি সকালে আমি আসব।রাখি। রাতের থালা বাসন পরিষ্কার করতে করতে ভাবছিলাম আজকের দিনটা বোধ হয় ভালোই কাটবে। ভাবতে না ভাবতেই আবার শুরু হয়েছে। লোকটা এসব ছাড়া কথাই বলতে পারে না। প্রথম প্রথম ভাবতাম বাবা-মা ছাড়া ছন্নছাড়া জীবনযাপনে এমন হয়েছে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। আজ তিন বছর হল আমাদের বিয়ে হয়েছে কিন্তু কিছুই বদলায়নি। জীবন তার খুবই গোছানো এবং বেশ পরিকল্পিত। কিন্তু মুখের ভাষা!! কোন আসবাবের নাম মুখে নিলেও এভাবেই বলবে শালার টেবিল, *** টিভি ইত্যাদি।

আর ইনিই আমার বাবার ভালো মানুষ, যার সাথে আমার কোন মতামত ছাড়াই আমার বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার বাবা সাংবাদিক ছিলেন।কিন্তু অল্প দিনেই তিনি সাংবাদিকতা ছেড়ে লেখালেখিতে হাত দিলেন। তার অবশ্য একটা কারণ আছে। যদিও তা আমাদের ধারণা। কারণ বাবাকে বুঝবার মত ক্ষমতা আমাদের কোন দিনই ছিল না। আমরা চার ভাই বোন ছিলাম। ছিলাম বলছি কারণ আমাদের বড় বোন সুলেখা খুব ছোট বেলায় মারা যায়। এর পর থেকেই বাবা সাংবাদিকতা ছেড়ে দেন। সুলেখা আপুর মৃত্যুর সাথে এর কোন যোগ আছে কিনা আমরা জানি না। সুলেখা আপুর পরে মিলি আপু, আমি এবং সবার শেষে নিপুণ। আমার জন্মের পর থেকেই আমি বাবাকে দেখেছি সারা দিন ঘরে দরজা বন্ধ করে লিখতে। মাঝে মাঝে মাঝ রাতে চিৎকার করে উঠতেন “লেখারে!!” বাবার ঘরে আমাদের প্রবেশ অধিকার সংরক্ষিত ছিল। মার কাছে শুনেছি তিনি ঝিম ধরে বসে থাকতেন আর হঠাৎ করে এমন করে চিৎকার করতেন। হয়ত তাঁর দুঃখ প্রকাশের ধরণই এমন ছিল। লেখক হিসেবে তিনি তেমন খ্যাত ছিলেন না। কিন্তু আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন দেশের অধ্যাপকরা আসতেন বাবার সাথে গল্প করতে।

বাবার লেখা যে প্রকাশনা থেকে বের হত তার নাম “আখতার পাবলিকেশনস” আর এর মালিক আখতারুজ্জামানই বাবার ভালো মানুষ। বাবা একদিন আমায় ডেকে বললেন, লীনা আমি চলে যাব, আমার সৌভাগ্য তোমার জন্য আমি একজন ভালো মানুষ খুঁজে পেয়েছি। বুঝে ওঠার আগেই আমার বিয়ে হয়ে গেল এবং আমার বিয়ের তিন মাসের মধ্যে বাবা সত্যি সত্যিই চলে গেলেন। নিপুণ উচ্ছন্নে যাওয়ার শেষ পর্যায়ে চলে গেছে তখন। বাবার মৃত্যুর খবর তাকে দেয়ার জন্য খুঁজেই পাওয়া গেল না। মিলি আপুর বিয়ে হয়েছে রাজশাহী রেলওয়ের স্টেশন মাস্টারের সাথে। ওর বাচ্চা হবে, তাই আসতে পারেনি। ওর বরও আসেনি। বাবার অন্তিম সংস্কার, দেনা-পাওনা, মিলাদ পড়ানো, গরীব লোকজন খাওয়ানো, মাকে আমাদের সাথে নিয়ে আসার কথা প্রস্তাব করা, মা রাজী না হওয়ায় গ্রাম থেকে কাজের মেয়ে আনিয়ে মায়ের সাথে রাখা, প্রতি সপ্তাহে বাজার পাঠানো সব এই লোকটাই করে আসছে। কিন্তু প্রকাশনা এবং প্রেসের স্টাফদের সাথে তার ব্যাবহার, মুখের ভাষা আর রোবটিক জীবনযাপন আমার ভালো লাগছে না। তিন বছরে আমি কোন পরিবর্তনই দেখলাম না। নিজের শরীর যেমন ঢিলেঢালা পোশাকও পড়বে তেমন; ঢোলা-লম্বা শার্ট,সস্তা রঙ চটা প্যান্ট, বাটার সস্তা জুতা ছাড়া তার পোষাকে কোন পরিবর্তন দেখলাম না। আজ পর্যন্ত আমার সাথে স্বামী-সুলভ কোন ব্যাবহার বা কথাবার্তা কখনও হয়নি। তার আর আমার সম্পর্ক অনেকটা রুমমেটের মত।

শুধু বাড়তি আমি তার রান্না করে দেই। — আমার কিছু কথা আছে। — হুম। — আমি এখানে আর থাকতে চাই না। — বুঝলাম না। — আমি ডিভোর্স লেটার পাঠাবো। কাল সকালেই আমি চলে যাব। লোকটা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমার এই দৃশ্য দেখে আরও মেজাজ খারাপ হল। পুরুষ মানুষ কিন্তু আচরণ করবে মেয়েদের মত। বিশ্রী!! আমি পাশের ঘরে চলে গেলাম। মাঝ রাতে শুরু হল গোঙানি। এটাও একটা সমস্যা। মাঝে মাঝে রাতের বেলা সে ভয়ংকর ভাবে গোঙায়। একলা ঘরে আমার কেমন যে লাগে আমি ভাষায় বলতে পারব না। আমার ধারণা একটা লাশের সাথে থাকতে হলেও আমি এতো ভয় পেতাম না। সারা রাত আমি জেগেই কাটালাম। সকাল হওয়া মাত্র আমি এক পোষাকে রওনা করে বাসায় চলে এলাম। বাসায় এসে দেখি মিলি আপু ওর বর ও ছেলে সহ আমাদের বাসায়। দুলাভাই দুপুরে খেয়েই চলে যাবেন। ঢাকায় কিছু কাজ আছে ওগুলো সেরে রাতের ট্রেনে রাজশাহী চলে যাবেন। এক সপ্তাহ পর আবার ওদের এসে নিয়ে যাবেন। আমি ওদের আর কিছুই বললাম না। বললাম এমনি বেড়াতে এসেছি। আমাদের কথা শুনে নিপুও চলে এলো। রাতে সবাই খুব মজা করলাম। কাউকে কিছু বুঝতে দিলাম না।

কিন্তু নিপু রাতের বেলা ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল , ঘটনা কি বল? আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম বটে কিন্তু লুকানোর চেষ্টা করলাম না। শান্ত স্বরে বললাম আমাকে ডিভোর্সের ব্যবস্থা করে দিতে পারবি? — তুই আর মা খাবি কি? — চাকরি জোগাড় হয়ে গেছে প্রায়। সজীবকে বলেছি। সজীবকে চিনেছিস তো? নিপু বড়দের মত সিগারেট ধরাতে ধরেতে বলল, ভালো মানুষ মারধর করে নাকি? আমি বললাম, এসব নিয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাস, আর আপাতত কাউকে কিছু বলিস না। উত্তরে নিপু অদ্ভুত একটা শব্দ করল। যার অর্থ আমি বুঝলাম না। আমি অবাক হলাম। সেই নিপু, লীনা বলতে পারত না বলত নিনা। সেই নিপুণ আজ কত বড় হয়ে গেছে। আর কত দূরে চলে গেছে। নিপুণের জগত আজ আমার কাছে বড় অচেনা। পরদিন লোকটা বাজার পাঠালো আর তার সাথে একটা চিঠি। খুব সংক্ষেপে যাতে লেখা –“এর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের যোগ খোঁজার কোন প্রয়োজন নেই।” চিঠি মায়ের হাতে পরল। ঘটনা বুঝতে কারো বাকি থাকল না। মা আমাকে ডাকলেন এবং সব কিছু জানতে চাইলেন। আমি ভাবলেশহীন ভাবে বললাম, আমি চলে এসেছি।

ওদিকে নিপু বাজার ফেরত দিয়ে দিল এবং তার সাথে হুমকিও দিয়ে দিল। ওর মত একটা ভালো ছেলের সাথে তোর কি এমন সমস্যা থাকতে পারে লীনা, যে তুই চলে এলি, মা রেগে রেগে বলছেন। — বাজার দিলেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না। তোমার বাজারের ব্যবস্থা আমি করব। আমি চাকরি নিচ্ছি। মা হতভম্ব হয়ে ছলছল চোখে চলে গেলেন। দু’সপ্তাহ চলে গেল। মিলিরা এখনও আছে। জরুরী কাজের কারণে ওর বর আসতে পারছে না। আজ সারাদিন অনেক কাজ করতে হল। সজীবের সাথে দেখা করা,সজীবের সাথে আমার সম্ভাব্য অফিসে যাওয়া, ইন্টারভিউ টাইপের কিছু কথাবার্তা এসব সেরে বাসায় এসে ক্লান্ত লাগছে। টেনশনও লাগছে। মিলিরা আছে ওরা বাজার করছে, নিপুও ঘরে আসলে এটা সেটা নিয়ে আসছে। কিন্তু সবাই চলে যাওয়ার আগে একটা চাকরী জোগাড় করতে না পাড়লে কি হবে বুঝতে পারছি না। সবাই ঘুমে বিভোর। মিলিরা আম্মার সাথে ঘুমাচ্ছে। নিপুটা আজ আসে নি। নিপুটা আসলে আমার সাথেই থাকত। আমি জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেলাম। লোকটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর শীত না লাগলেও বাইরে বেশ শীত।

লোকটা একটা হাফ শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আমার চোখের ভ্রম ভেবে এবং এমন ভ্রম দেখার পেছনে সম্ভাব্য মানসিক অবস্থার কথা ভেবে সত্যিই হতবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম ভ্রম নয় সত্যিই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। এবং আমার চোখে চোখ পড়তেই মাথা নিচু করে চলে গেল। তার মানে কি? লোকটা কি প্রতিদিনই আসে? কেন আসে? ভালবাসার কোন আবেগ কি তার মধ্যে আছে? কি চায় সে এখানে? পরবর্তী চার দিন আমি লুকিয়ে লক্ষ্য করলাম লোকটা প্রতিদিনই আসে এবং ঘরের বাতি না নেভা পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকে। মিলির ফোন থেকে নিপুকে ফোন করে বললাম লোকটা কেন আসে তা যেন জিজ্ঞেস করে আসে। এরপর দিন থেকে লোকটাকে আর দেখা গেল না। তিন দিন থেকে আমি লক্ষ্য করলাম লোকটা আসে না। আমার মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে। লোকটা আসতোই বা কেন আর এখন কেনই বা আসে না? নিপুও কিছু জানালো না। আমার অস্থির লাগছেই বা কেন? আমি নিজেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। দুপুরবেলা খাবার খেয়ে খাবার টেবিলে বসে আছি। পাশের ঘরে মিলি আপুর ছেলে চেঁচিয়ে উঠল। গিয়ে দেখি বিড়াল দেখে ভয় পেয়েছে।

আমাদের রান্না ঘরে বিড়াল মারার একটা লাঠি থাকে। মা লাঠি নিয়ে বেড়ালটাকে খুব মারল। বিড়ালটা প্রতিদিন খুব চেঁচামেচি করে আজ ঘোঁত জাতীয় একটা শব্দ করে পালিয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলা মিলি আপু আর মা নিউমার্কেট গেল। সেখান থেকে মিলি আপুর ননদের বাসায় যাবে। সারা ঘরে আমি একা। লাইট নিভিয়ে আমি বসে আছি এর মধ্যে বিড়ালটা বারান্দা থেকে ডাকতে শুরু করল। খুব মিহি আর নিচু স্বরে বিড়ালটা মিউ মিউ করছে। প্রতিদিন সে গ্রিল পেড়িয়ে এক লাফে চলে আসে। আজ সে ডাকছে। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি সে বলছে, আমার ক্ষুধার দিনে খাবার তো তোমরাই দাও। তোমরা মারলেই কি আমার সকল কৃতজ্ঞতা শেষ হয়ে যাবে।আমি এসেছি দরজা খোল। আমি ভাবলাম, আমরা মানুষকে পশু বলে গালি দেই কেন? আমাদের থেকে ওদের নৈতিকতা কম কিসে? আমার মাথা ঘুরছে, কি হচ্ছে এসব? বিড়াল কি কথা বলে? আমি বিড়ালের কথা শুনছি কেন? আবার বিড়ালের কথায় যুক্তিও খুঁজছি!! বিড়াল ডাকছে, মিউ…মিউ…মিউ…। আমার অস্থিরতা বাড়ছে। আমি স্থির থাকতে পারছি না।

আমি ছুটে গেলাম বারান্দার দরজা খুলে বিড়ালটিকে ভেতরে আসতে দেবার জন্য। কিন্তু বারান্দায় আমার জন্য অন্য কিছু অপেক্ষা করছিলো আমি বুঝতে পারিনি। আমার পাগল বাবার ভালো মানুষ আখতারুজ্জামান বাড়ির পেছনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে প্লাস্টার। আমি কাঁদছি না, কাঁদবার কোন অনুভূতিও আমার হচ্ছে না। কিন্তু আমার চোখ দিয়ে উষ্ণ দু’টি ধারা গড়িয়ে পরছে। পৃথিবীর অদ্ভুত নিয়মের প্রায় কিছুই আমি জানি না। জানার ইচ্ছেও কখনো হয়নি। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্ব পিতার কাছে আমার সমস্ত জীবনের সমগ্র অস্তিত্ব অনুভবের দোহাই দিয়ে একটাই প্রশ্ন- আমার এই চোখের জলের উৎস কি? আমি জানতে চাই, আমাকে জানতে দাও। অদ্ভুত কোন কারণে হুমায়ূন আহমেদের দ্বৈরথের প্লটের সাথে আমার এই গল্পের প্লট মিলে গেছে। কিন্তু বক্তব্য পুরোপুরি আলাদা তা চিন্তাশীল পাঠাক মাত্রই তা বুঝতে পারবেন বলেই মার ধারণা। অদ্ভুত কোন কারণে স্যার হুমায়ূন আহমেদের দ্বৈরথের প্লটের সাথে আমার এই গল্পের প্লট মিলে গেছে। কিন্তু বক্তব্য পুরোপুরি আলাদা তা চিন্তাশীল পাঠাক মাত্রই তা বুঝতে পারবেন বলেই আমার ধারণা।

ইশকুল

ঘূর্ণাবর্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *