
১ টট ট ট্ররররররররর …… আওয়াজটা দূর থেকে ভেসে আসতে আসতে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। অথবা জমাট ঘুমটা বাড়ন্ত বেলার কুয়াশার মতো ক্রমশ ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছে। তিতলী ঘুমের মধ্যে ঠিক ঠাহর ক’রে উঠতে পারে না। স্বপ্নে নিজেকে বিচ্চুর সঙ্গে একাকার করে নেয়, বলে ওঠে, “বাবলুদা, কিসের শব্দ বলো তো ?“ ২ গতমাসে দশে পা দিয়েছে তিতলী। অক্ষর পরিচয়ের পর, চার বছর বয়েস থেকে সেই যে বাংলা গল্পের বই পড়তে শুরু করেছে, এখন তো রীতিমতো নেশা। এই ছ’বছরের গল্পপড়ুয়া জীবনে অন্তত দেড়শো গল্প দেড় হাজার বার পড়েছে। গল্পের মধ্যে ওর সবথেকে প্রিয় হ’ল ভুতের গল্প আর পান্ডব গোয়েন্দাদের অভিযান। এক বছরের জন্মদিনে পেয়েছিল “মিত্তির বাড়ীর রহস্য”। সেই থেকে পান্ডব গোয়েন্দাদের ওপর টান।
বাবাকে বলে পান্ডব গোয়েন্দা সমগ্র পেয়েছে, দুই খন্ডে। পেয়েছে যদিও বছর দুয়েক আগে, বই গুলো দেখলে মনে হবে, বয়েস দুইয়ের চেয়ে অনেক বেশী। আর হবে নাই বা কেন, বইগুলো আসার পর থেকেই উঠতে বসতে তারা ওর নিত্যসঙ্গী। এমনকি খেতে বসেও, মা খাইয়ে দেবে আর ও বাবলু ভোম্বলে ডুবে থাকবে। বইএর পাতায় পাতায় তাই আলু পটলের ডালনার আর মাছের ঝোলের দাগ। অতিব্যবহারে পাতাগুলো বই থেকে আলগা হ’য়ে বেড়িয়ে আসছে। মা মাঝে মাঝে রেগে বলে, “কি দশা ক’রেছ মনা বইগুলোর, এক্কেরে লুচিভাজা হয়ে গেছে”, যদিও তিতলী গোল লুচির সঙ্গে চৌকো বইয়ের কোনো মিল খুঁজে পায় না। ইদানীং বিচ্চুর সঙ্গে একাত্ম হ’য়ে উত্তেজনায় টগবগ করে। অথচ ভুতের গল্প প’ড়ে একা একা বাথরুমে যেতে পারে না, বাথরুমে ঢুকলেই কেমন একটা ভয় ভয় ভাব জড়িয়ে ধরে।
শোবার সময় কিন্তু একাই শোয়, তখন ভয় লাগে না। বরং একা শুতে পারে বলে বন্ধুমহলে বেশ খ্যাতি ছড়িয়েছে। যদিও এই একা একা শোয়াটা মাত্র সপ্তাহ খানেক আগেই শুরু হয়েছে, ওরা নতুন ফ্ল্যাটে আসার পর। আগের বাড়ীতে একটাই শোবার ঘর ছিল, তিতলী তাই মা বাবার কাছেই শুতো, নতুন বাড়ীতে এসে ওর আলাদা ঘর হয়েছে। আর চার চারটে নতুন বন্ধু হয়েছে। তারা কেউই একা শুতে পারে না। ওর মতো বাংলা গল্পের বইও পড়তে পারে না। সবাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। তিতলীও ইংলিশ মিডিয়ামেই পড়ে, কিন্তু বাংলা পড়ার নেশাটা সেই যে “রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা” দিয়ে শুরু হয়েছিল এখন একদম রক্তে মিশে গেছে। বই পড়ার নেশাটা তিতলীর বাবার কাছ থেকে পাওয়া। ভদ্রলোক কারো কোনো সাতে পাঁচে থাকেন না, শান্ত ধীর স্থির মানুষ, হাঃ হাঃ করে হাসেন, অফিস করেন আর বাকী সময় বই মুখে বসে থাকেন। তিতলীর জন্যেও প্রচুর বই আনেন।
বাবা বাড়ীতে থাকলে তিতলীর খুব মজা, গল্পের বই বেশী ক’রে পড়লেও মা কিছু বলতে পারে না, কারন বাবা বলেন সাহিত্য পড়লে তবেই না বুদ্ধির ধার বাড়বে, অঙ্কের মাথাটা খুলবে, অথচ মনটাও নরম থাকবে। বাবা এত ধীরে ধীরে অথচ অনমনীয় স্বরে কথা বলেন যে তার ওপরে আর মায়ের কিছু বলার থাকে না, শুধু আলতো ক’রে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়, “মেয়েটাকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলছো কিন্তু”। নইলে মা এমনিতে বেশ কড়া ধাঁচের। গল্পের বই নিয়ে একটু বেশী সময় কাটালেই বা সন্ধ্যেবেলায় খেলে ফিরতে একটু দেরী হলেই, ব্যস, শুরু হয়ে যাবে, “মনা, ইউনিট টেস্টের অঙ্কের নাম্বার টা মনে আছে তো ?” কিংবা “গল্পের বই মুখে বসে থাকলেই চলবে ? পারমিতা ম্যাম গ্রামার কপিতে কি রিমার্ক দিয়েছেন, এর মধ্যেই ভুলে গেছো ?” তিতলী লক্ষ্য ক’রে দেখেছে, মা যখন পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস কথা বলে, তখন সম্বোধনটা তুই থেকে তুমি হয়ে যায়।
৩ টট ট ট ট্ররররররররররররর …… আবার আওয়াজটা ভেসে এল। তিতলীর ঘুমটা ফিকে হয়ে আসছিল, এবার ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখল, চারদিকে জমাট অন্ধকার । একটু ভয় ভয় করছে। বোঝা যাচ্ছে না শব্দটা কিসের। নাইট ল্যাম্পের আলোটা আস্তে আস্তে জোরালো হচ্ছে, ঘরের দেওয়ালগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। টট টট ট্ররররররররররর …… এই নিয়ে তৃতীয় বার, এবার যেন সঙ্গে একটা হালকা হাসির শব্দ ভেসে এল। বাবলুর স্টাইলে তিতলী ভাবার চেষ্টা করছিল, শব্দটা কিসের হতে পারে। হতে পারে কোনো পোকামাকড়ের ডাক অথবা ইভিএস ক্লাশে পড়া সেই সাপটাও হতে পারে, যারা বুকে হাঁটলেও শব্দ হয়। তবে ঠিক কেমন শব্দ হয় সেটা অবশ্য ম্যাম বলেননি। আবার ছুঁচো ইঁদুরও হতে পারে, যদিও শব্দটা ঠিক তাদের ডাকের মতো নয়। সঙ্গে হাসির আওয়াজটা আরও সব হিসেব গন্ডগোল ক’রে দিচ্ছে। তিতলী ভাবছে, সাপখোপ বা পোকামাকড় যদি হয়, খাট থেকে নামাটা উচিৎ হবে কি না ইত্যাদি, এমন সময় আবার আওয়াজটা হ’ল এবং বোঝা গেল শব্দটা এই ঘরের মধ্যে হচ্ছে না, বাইরে থেকে আসছে। “তাহ’লে খাট থেকে নামা যেতেই পারে”, এই ভেবে ও খাট থেকে নেমে এল। আর শব্দটা হচ্ছে না তো, কিন্তু উৎসটা খুঁজতে গেলে শব্দটা আবার পাওয়া দরকার।
পা টিপে টিপে বসার ঘরে আসার ঠিক পরেই, টট টট টট ট্ররররররররররর …… এক্কেবারে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট, শব্দটা মা বাবার ঘর থেকে আসছে। দরজায় আলতো চাপ দিয়ে দেখল, বন্ধ। ইয়েল লকের কীহোল দিয়ে আলো আসছে। তিতলী ভাবছে মাকে ডাকবে কি ডাকবে না, কারন, এই মাঝরাতে ওকে উঠে আসতে দেখে মা হয়ত ভাববে ও ভয় পেয়েছে, যেটা কিনা ওকে এখনও ছোট্ট ভাবারই নামান্তর। ঠিক এমন সময় আবার শব্দটা হল, সঙ্গে মায়ের হাসি আর হাততালি। প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে তিতলী কীহোলে চোখ রেখে, অবাক বিস্ময়ে দেখল, তার আপাত গম্ভীর, রাশভারী বাবা মেঝেতে কয়েকটা মার্বেলগুলি সাজিয়েছেন।
একটা বড় মার্বেল হাতে নিয়ে কিছুটা দূরে বসে আস্তে আস্তে বেশ মজার গলায় বললেন – “বলো, কোনটা ?” আর মা, যার মুখে সব সময় “এটা কোরো না, ওটা কোরো না” লেগেই আছে, সেই মা … নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না তিতলীর, সেই মা … খুব খুশী খুশী গলায় – “নীইইইল” বাবা হিট করতে পারলেও মায়ের বাচ্ছা মেয়ের মতো হাততালি,হাসি, আবার না পারলেও, “ইসসসসস, পারলে না —“ ঝরণার মতো ঝরঝর হাসি গড়িয়ে পড়ছে। ৪ খেলাটা চলছে, আর সেই খেলা দেখতে দেখতে তিতলীর মনটা, ভয়ঙ্কর দোটানার ভার থেকে আস্তে আস্তে ছুটি পেয়ে, পালকের মতো হালকা হয়ে উঠছে। রাতের জমাট অন্ধকার চেরা ঝলমলে রোদ্দুরে হেসে, খেলে, ভেসে বেড়াচ্ছে। ছুট ছুট ছুট … মায়ের সঙ্গে … বাবার সঙ্গে …