খর্গজিৎ

খর্গজিত এর বয়েস হয়েছে। দ্রুতগতি দুরের কথা, চলাফেরা করার সামান্য শক্তিটুকুও তার আজ নেই। দয়া করে তাকে কেউ একটু পাতা-লতা দিলে খাওয়াটা জোটে। নয়তো উপোষ করে থাকতে হয়। কতদিন হয়ে গেল সে একটু গাজরের স্বাদ পায়নি, তা সে নিজেও জানে না। রাস্তার ধারে একটা খালি জায়গায় চারিপাশে জাল দিয়ে ঘিরে পাড়ার ছেলেরা একটা ছোটোখাটো চিড়িয়াখানা বানিয়েছে। একটা এক্যুরিয়ামে কয়েকটা মাছ, ঝুলন্ত হাঁড়িতে কয়েকটা পাখী আর মাটিতে চারটে গিনিপিগের সাথে খর্গজিতেরও সেখানে জায়গা হয়েছে। তার অমন লাল লাল বড় বড় চোখদুটোতে এখন ছানি পড়েছে। একটু দুরের জিনিস আর দেখতে পারে না। অমন লম্বা লম্বা কান, সামান্য একটা পাতা গাছ থেকে পড়লে সে যার আওয়াজ পেত, আজ সেই কানে সে ভালো করে শুনতেও পায় না। পাড়ার ছেলেরা এই মিনি চিড়িয়াখানার সামনে সন্ধ্যেবেলায় অতো যে চেঁচামেচি করে ক্যারম খেলে, খর্গজিত’এর কানে তার বিন্দুমাত্র প্রবেশ করে না।

অমন ধবধবে সাদা লোমগুলো জালের মধ্যের মাটি আর নিজের মলমুত্র লেগে আর সাদা নেই, অদ্ভুত কদাকার রঙে পরিনত হয়েছে। দেখে পাড়ার বাচ্চাগুলো নাক সিঁটকে বলে – ইসসস……খরগোশটা কি নোংরা দ্যাখ! শুনে খর্গজিতের খুব কষ্ট হয়। আজ ওকে এমন অবস্থায় দেখে বাচ্চাগুলো এমন বলছে। অথচ একদিন…………! স্মৃতির ঝাঁপি খুলে খর্গজিত তন্ময় হয়ে যায়…………… খর্গজিত চিরকাল এমন ছিল না। ছোটোবেলায় তার নাম ছিল খর্গদ্যুতি। তার দুরন্তপনায় বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে উঠত। ধবধবে সাদা লোম, লাল টুকটুকে চোখ আর তিড়িংবিড়িং নৃত্য সব্বার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। আর একটু বড়ো হতেই তাকে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে হলো কচ্ছপের সাথে। ততদিনে সেও পড়ে ফেলেছিল তার প্রপিতামহ আর কচ্ছপদের প্রপিতামহের দৌড় প্রতিযোগিতার কাহিনী। শুধু পড়াই নয়, পড়ে পড়ে মুখস্থও হয়ে গিয়েছিল। তাই তার সঙ্গে যখন কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতা হলো তখন সে মাঝপথে একটুও বিশ্রাম নেয়নি। একেবারে দৌড় শেষ করে থেমেছিল। না, কচ্ছপের সাথে দৌড়ে জিতেই তার দৌড় প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যায় নি।

কচ্ছপের পর একে একে ইঁদুর, বেজী, ছাগল, কুকুর, শুয়োর, গরু, গাধা সবার সাথে তার দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছিল। একটা প্রতিযোগিতা শেষ হতে না হতেই আরেকটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে কখনো হারে নি, তাই তার নাম হয়ে গিয়েছিল খর্গজিত। আর তাই সে বিশ্রাম নিতেও পারেনি। একটু জিরোতে গেলেই প্রথমদিকে তার বাবা-মা আর পরে তার শুভানুধ্যায়ীরা বলেছে – না এখন নয়, পরে বিশ্রাম নেবে……তোমাকে আরো আরো আরো দৌড়াতে হবে…আরো…ও…ও…। দৌড়ের নেশায় সেও নতুন উদ্দ্যমে বার বার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বাবা-মা কারো চিরকাল বেঁচে থাকে না। একসময় খর্গজিতের বাবা-মাও দেহ রাখলো। ইতিমধ্যে বিয়ে করে সংসার করে ছেলেমেয়েও হয়েছে খর্গজিতের। একসময় ছেলেমেয়েরাও বিয়ে-থা করে অন্যত্র ঘর বেঁধে সংসার করতে থাকে। তারপর এক বাদলভরা ঝড়ের রাতে আকস্মিক খর্গজিতের বৌ’ও মারা যায়। এই বিশাল দুনিয়ায় একা হয়ে যায় খর্গজিত। জঙ্গলে একা একা ঘোরে বা বাসায় চুপটি করে বসে থাকে। কিছুই ভালো লাগে না তার। একদিন কচ্ছপ, ইঁদুর আর বেজী এলো তার কাছে। তারা প্রথমে খর্গজিতের কুশল জিজ্ঞাসা করলো। তারপর গল্প শুরু করলো। যে বিশাল জঙ্গলে তারা থাকতো, কচ্ছপ কোনদিন সেই জঙ্গল পার হতে পারে নি। গল্পে গল্পে কচ্ছপ খর্গজিতকে জিজ্ঞাসা করলো – আচ্ছা খর্গজিত !

তুমি কতদূর গিয়েছিলে ? এই যে জঙ্গলটা, এই জঙ্গল পার হয়েছিলে তুমি ? খর্গজিত হেসে জবাব দিয়েছিল – হ্যাঁ, তা পার হয়েছিলাম বৈ কী ! শুনে কচ্ছপ বলেছিল – তাহলে তুমি নিশ্চয় সেই ছাতিমগাছটা দেখেছ……যে গাছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী বাস করে ? কত সুন্দর সুন্দর গল্প শোনায় তারা দুজন…শুনলে মন ভরে যায়…তুমি নিশ্চয় তাদের মুখে অনেক অনেক গল্প শুনেছ…। কচ্ছপের প্রশ্নের উত্তরে খর্গজিত আমতা আমতা করে বলে – না তো ! আমার তো দেখা হয় নি তাদের সাথে! ইঁদুর তখন বলল – বাদ দাও ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর কথা……আচ্ছা, তুমি তো ওওওই সরোবর ছাড়িয়ে অনে……ক দুর গিয়েছিলে, তুমি কি দেখেছ ওই সরোবরে শীতকালে নানা রঙের পরিযায়ী পাখীরা দলবেঁধে এসে গানে গানে সরোবরটাকে কেমন মুখরিত করে রাখে ? শুনে খর্গজিত বলে – না তো ! কখনো শুনিনি তো ! তখন বেজী জিজ্ঞাসা করলো – আচ্ছা খর্গজিত ! ওই যে দুরের পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, তুমি ওই পাহাড় ছাড়িয়ে আরোওও দূরে গিয়েছিলে ? খর্গজিত কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলো, তার মানে ও যে গিয়েছিল সেটা জানালো।

তখন বেজী বলল- তাহলে তো তুমি পাহাড়ের ওপর যে মন্দিরটা আছে সেটা নিশ্চয় দেখেছ ? খর্গজিত তখন বেশ লজ্জা পেয়ে বলে – না হে আমি ওটাও দেখিনি……আসলে দৌড়ের সময় আমি এত মন দিয়ে দৌড়েছি যে আমার চারপাশে কি আছে না আছে, কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই খেয়াল করি নি……। সত্যি বলতে কি……খেয়াল করতে ইচ্ছেও করে নি…………… বলতে বলতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল খর্গজিত। হঠাত দেখে ইঁদুর আর বেজী দুজনে মিলে কচ্ছপের দুটো পা কামড়ে ধরে ছুটে পালাচ্ছে। কারণটা বোঝার আগেই এক ব্যাধ জাল ছুঁড়ে দেয় খর্গজিতের দিকে আর খর্গজিত ধরা পড়ে যায়। পরে এ হাত ও হাত হতে হতে এক হাট থেকে এই মিনি চিড়িয়াখানায়। স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে খর্গজিতের চোখের কোনা থেকে জল গড়াতে থাকে। সারাজীবন ধরে জেতার নেশাতে ছুটেই গেল………… দুটো বাচ্চা ছেলে-মেয়ে জালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। খর্গজিতকে দেখিয়ে একজন অপরজনকে বলে – দ্যাখ দ্যাখ…খরগোশটার চোখ থেকে কেমন জল গড়িয়ে পড়ছে………বোধহয় ও আর বেশীদিন বাঁচবে না রে…………… —সমাপ্ত—

খেলান-দোলানের গল্প

গরুর হাট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *