কুতুরুন্নেসা বানুর হাঁস মুরগিগুলো বড়ই পরিপুষ্ট, তেল চকচকে । বছরকাবারী ডিম খেয়ে, বেঁচে, হাতে জমা বেশ ভালোই থাকে । এসব তার না করলেও চলে, স্বামী ভাকু সদাগর মস্ত ব্যাবসায়ী, টাকার অভাব নেই । তিনজন কাজের মানুষ, গাছপালা ঘেরা বিশাল বাড়ি, দুই ছেলে, সুখ তার অঙ্গে অঙ্গে ভাবতরঙ্গে ।
সে যখন জন্মেছিলো, তখন ওয়া করে কান্নার পরিবর্তে কোঁ কোঁ শব্দ করে উঠেছিলো, সেই থেকে তার এমন ছন্নছাড়া নাম । তারপর বিয়ের পরে পড়লো আজদাহা পরিবারে, পাঁচ দেবর, চার ননদ! কুতুরুন্নেসার কোঁ কোঁ গেলো হাপানীর মত বেড়ে । দেবরদের কেউ বিয়ে করে আলাদা হলো, ননদদের বিয়ে হলো । সে দুই ছেলের মা হলো এবং ভাকু সদাগর আলাদা বাড়ি কিনে বৌ বাচ্চাদের নিয়ে খুলনা শহরে স্থায়ী হলো ।
যদিও তার সদাগরী ব্যাবসা, বাড়িতে আসে মাসে দুইবার । কুতুরুন্নেসা একাকীত্ব ভুলতে হাঁস-মুরগী, গাছগাছালী নিয়ে ব্যস্ত থাকে, নিয়ম মেনে কাজের মানুষদের সাথে প্রবল চেচামেচি করে, ছেলেদের পিটুনি দেয় এবং সবশেষে কাঠের চেয়ারে বসে কোঁকায় ।
ভাকু সদাগরের সমান অংশীদার লেকু মুন্সি, খুবই ধূর্ত লোক, ভাকু তাকে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে, জানে, লেকু ঠিকই কাজ উঠিয়ে আনবে । দুইজনের বন্ধুত্বও মজবুত । আর সেই সূত্র ধরেই কিনা লেকু সদাগরের কালিগঞ্জের বাড়িতে ভাকুর যাতায়াত ।
লেকুর কালোমতন কুশ্রী চেহারার যে বোনটির বিয়ে হয়নি, সে ভাকু সদাগর কে বড়ই যত্নাদি করে । ভাকুও ভাবে, আহা রে, কেবল কালো কুচ্ছিত বলে মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না! কে বিয়ে করবে? সে নিজেই কখনও এই জিনিস ঘরে তুলতে রাজি হবে না ।
তারপর পরের সপ্তাহ এলো, খুলনায় যাওয়া হলো না ভাকুর । লেকু অনুনয় করে পড়েছে, ‘দোস্ত, আমার সাথে কালিগঞ্জে চল, সাবেরার একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, যত টাকা লাগুক, এবার ওকে পার করবই । মানবিক আবদার, ভাকু গেলো ।
সবাই রাতের খাবার খাচ্ছে, সাবেরা কে দেখা যাচ্ছে না, হয়তো লজ্জা নিয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে সে । খাওয়া শেষে খানিক গল্প সেরে, পান খেয়ে, শুতে গেলো ভাকু, কামরায় ঢুকে দরজার খিল লাগিয়ে দিলো, ডাসা ও ।
কুতুরুন্নেসা কে মনে পড়লো তার, আহা, এখন বৌ কে বুকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার কথা ছিলো!!! খাটের দিকে এগিয়ে যেতেই ভাকুর ওপর ঝাপিয়ে পড়লো সাবেরা… ‘না, না, আপনে আমার এত বড় সর্বনাশ কইরেন না…!! কোনমতে দরজা খুলে বের হয়ে আসতেই চোখ কপালে উঠলো ভাকুর । দরজার সামনে লেকু, তার বাবা-মা, ভাইয়েরা বউসহ, তিন বোন এবং বোনের জামাইয়েরা । এতক্ষণে সবকিছু পরিস্কার হয়ে উঠলো ভাকুর কাছে । কাজিসায়েব এলেন, পাড়াপ্রতিবেশীরা এলো, ভাকু বর সাজলো ।
সন্ধ্যা পার হয়েছে অনেকক্ষণ । ছেলেদের পড়াতে বসে মন দিতে পারছে না কুতুরুন্নেসা । তার বুকের মধ্যে কেবলই কুকপক্ষী ডেকে যাচ্ছে ।
"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।