কাতাদা ইবন নু’মান (রা)

নাম কাতাদা। তাঁর ডাকনাম ছিল অনেকগুলো—যেমন: আবু ‘উমার, আবু ‘উসমান, আবু ‘আমর ও আবু ‘আবদিল্লাহ। তিনি মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের বনু জাফার শাখার সন্তান। তাঁর মাতা উনাইসা বিনতু কায়স ছিলেন নাজ্জার গোত্রের কন্যা। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) তাঁর সন্তান। কাতাদা ও আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) বৈপিত্রেয় ভাই ছিলেন।

তিনি সর্বশেষ ‘আকাবার শপথে শরিক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে বাই‘আত গ্রহণ করেন। বদরসহ অন্যান্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি অকল্পনীয় ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। এই যুদ্ধে তিনি মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনীর অন্যতম সদস্য ছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে নিজের ‘আল-কাতূম’ নামক একটি ভাঙা ধনুক দান করেছিলেন।

উহুদ যুদ্ধের এক সঙ্কটজনক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীমকে (সাঃ) মুশরিক তীরন্দাযরা তাদের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নিল। তাঁকেই লক্ষ্য করে তারা তীর ছুড়ছিলো। রাসুলুল্লাহর (সাঃ) আশে পাশে তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুজাহিদ মাত্র। অন্যরা একদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। এ মুষ্টিমেয় মুজাহিদরা একজনের পর একজন নিজের বুক পেতে দিয়ে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তীর থেকে রাসূলকে (সাঃ) আড়াল করে রাখছিলেন। এভাবেদশজন শহীদ হওয়ার পর হযরত কাতাদার পালা আসলো। তিনি ছিলেন একাদশ ব্যক্তি। তিনি রাসূলকে (সাঃ) পিছনে রেখে শত্র“বাহিনীর দিকে বুক পেতে দাঁড়িয়ে গেলেন। হঠাৎ শত্র“পক্ষের নিক্ষিপ্ত একটি তীর ছুটে এসে তাঁর একটি চোখে আঘাত হানে। চোখটি কোটর থেকে ছিটকে গন্ডদেশে গড়িয়ে পড়ে। অন্য একটি বর্ণনা  মতে চোখটি একবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি তা হাতে ধরে রাখেন। লোকেরা ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিল। তিনি রাজী হলেন না। তিনি রাসুলুল্লাহর (সাঃ) নিকট আরজ করলেন: আমার এক স্ত্রী আছে। আমি তার প্রতি আসস্ত। তাকে আমি গভীরভাবে ভালোবাসী। আমার এ অবস্থায় সে আমাকে ঘৃণা করতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে আমি যা করেছি তা শুধু শাহাদাত লাভের জন্যই করেছি। রাসূল (সাঃ) নিজ হাতে চোখটি আবর যথাস্থানে বসিয়ে দিয়ে দু’আ করেন: ‘হে আল্লাহ! কাতাদা তার মুখমন্ডল দ্বারা তোমার নবীকে (সাঃ) রক্ষা করেছে। সুতরাং তুমি এখন তার এ চোখটিকে অন্যটি অপেক্ষা সন্দুর ও তীক্ষ্ম দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন করে দাও।’ রাসূলুল্লাহর (সাঃ)  এ দুয়া কবুল হয়। এ চোখটি অন্যটি অপেক্ষা খবই সুন্দর হয় এবং দৃষ্টি শক্তিও তীক্ষ্ণ হয়।

পরবর্তীকালে তাঁর সন্তানদের মধ্যে একজন উমাইয়া খলিফা হযরত ‘উমার ইবন ‘আবদিল আযীয (রহ)-এর দরবারে উপস্থিত হন। খলিফা তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি একটি কবিতার মাধ্যমে নিজের পরিচয় দেন। এখানে তার কয়েকটি পংক্তির অনুবাদ দেওয়া হলো—

“আমি সেই ব্যক্তির সন্তান,
যার একটি চোখ তার গণ্ডদেশে গড়িয়ে পড়েছিল।
অতঃপর নবী মুস্তফা (সাঃ)-এর হাত
তা যথাস্থানে স্থাপন করে দেন।

তারপর তা পূর্বের মতো হয়ে যায়।
সে চোখটি কতই না সুন্দর হয়ে ওঠে,
আর স্থাপনও হয় কত নিখুঁতভাবে!”

হযরত কাতাদা (রা)-এর চোখটি কোন যুদ্ধে আহত হয়েছিল—এ বিষয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বদর, উহুদ ও খন্দক—এই তিনটি যুদ্ধের কথাই বর্ণিত হয়েছে। তবে ইমাম মালিক, দারুকুতনী, বায়হাকী ও হাফেজ ইবন ‘আবদিল বার (রহ) উহুদ যুদ্ধের বর্ণনাকেই সর্বাধিক সঠিক বলে মনে করেন।

মক্কা বিজয়ের সময় বনু জাফারের পতাকা হযরত কাতাদা (রা)-এর হাতেই ছিল। হুনাইন যুদ্ধের চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে যাঁরা দৃঢ়পদ ছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম।

হিজরী ১১ সনে হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উসামা ইবন যায়িদ (রা)-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিরিয়া সীমান্তের দিকে প্রেরণের নির্দেশ দেন। মুহাজির ও আনসারদের প্রায় সকল উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবী এ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। হযরত কাতাদা (রা)ও ছিলেন এই বাহিনীর একজন সদস্য।

তিনি হিজরী ২৩ সনে (খ্রিষ্টাব্দ ৬৪৪), ৬৫ বছর বয়সে মদীনায় ইন্তেকাল করেন। সে সময় হযরত ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) খিলাফতের মসনদে আসীন ছিলেন। খলিফা ‘উমার (রা) নিজে তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন। ‘উমার, আবু সাঈদ আল-খুদরী ও মুহাম্মদ ইবন মাসলামা (রা)—এই তিনজন কবরে নেমে তাঁকে দাফন করেন। তবে ইমাম নাওয়াবী (রহ) বলেন, মুহাম্মদ ইবন মাসলামা ও আল-হারেস ইবনু খুযাইমা—এই দু’জন কবরে নেমেছিলেন।

‘উমার ও ‘উবাইদ—এই দুই ছেলের নাম তাঁর সম্পর্কে জানা যায়। তাঁর স্ত্রীর নাম জানা যায় না। তবে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর গভীর প্রেম-প্রীতির সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়। তিনি উহুদ যুদ্ধের পূর্বেই বিবাহ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত তাবে‘ঈ মুহাদ্দিস হযরত ‘আসিম ইবন ‘উমার ইবন কাতাদার দাদা। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক তাঁর সূত্রে বহু বর্ণনা সংকলন করেছেন। এই ‘আসিম হিজরী ১২০ অথবা ১২৯ সনে ইন্তেকাল করেন।

তিনি ছিলেন মর্যাদাবান সাহাবীদের অন্যতম। শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সম্পর্কে অনেক বড় বড় সাহাবী তাঁর নিকট জিজ্ঞাসা করতেন। হযরত আবু সাঈদ আল-খুদরী ও আবু কাতাদার মতো বিশিষ্ট সাহাবীরা যে তাঁর নিকট ফতোয়া জিজ্ঞেস করতেন—এ কথা হাদীসের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত কাতাদা ইবন নু‘মান (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা সাত (৭)। এর মধ্যে ইমাম বুখারী এককভাবে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আবু সাঈদ আল-খুদরী, হুযাইফা, মাহমুদ ইবন লাবীদ, ‘উবাইদ ইবন হুনাইন, ‘আয়াদা ইবন ‘আবদিল্লাহ এবং তাঁর ছেলে ‘উমার ইবন কাতাদা—এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তাঁর চরিত্রে যুহ্দ ও তাকওয়ার প্রাধান্য ছিল। একবার তিনি শুধু সূরা ইখলাস পাঠ করতে করতেই পুরো রাত অতিবাহিত করেন।

হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় হযরত কাতাদার বংশের মধ্যে চুরির একটি ঘটনা ঘটে। চোরটি ছিল একজন মুনাফিক। সে চুরির দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টা করে। হযরত কাতাদা (রা) তাকেই সন্দেহ করেছিলেন। তিনি তাঁর সন্দেহের কথা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট প্রকাশ করলে তিনি প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এদিকে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল, সে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট এসে নিজেকে অত্যন্ত সৎ প্রমাণ করার চেষ্টা করে এবং কাতাদার সন্দেহের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে। তখন আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নিসার ১০৫ থেকে ১১৩ নম্বর আয়াতসমূহ নাযিল করে প্রকৃত ঘটনা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে অবহিত করেন। এর মাধ্যমে কাতাদার (রা) সত্যবাদিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হযরত কাতাদা (রা)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর একটি মু‘জিযা প্রকাশের ঘটনা সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। একদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। চারদিকে ঘন অন্ধকার রাত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঈশার নামায আদায়ের জন্য বের হলেন। কাতাদাও (রা) সেখানে উপস্থিত হলেন।

বিদ্যুৎ চমকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাতাদাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,
“কাতাদা?”

তিনি জবাব দিলেন,
“আজ লোকের উপস্থিতি কম হবে—এ কথা ভেবে আমি ইচ্ছা করেই হাজির হয়েছি।”

তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বললেন,
“ঘরে ফেরার সময় আমাদের কাছে এসো।”

নামায শেষে তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে দেখা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি খেজুরের শাখা তাঁর হাতে দিয়ে বললেন,
“ধর। এটি হাতে থাকবে। এটি তোমার সামনে দশজন এবং পিছনে দশজন মানুষের জন্য আলো জ্বালিয়ে রাখবে। আর বাড়ি পৌঁছে ঘরের আশপাশে কোথাও অন্ধকার দেখলে কোনো কথা না বলে এটি দিয়ে সেখানে আঘাত করবে। কারণ, ওটি শয়তান।”

হযরত কাতাদা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী খেজুরের শাখাটি হাতে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলেন। সত্যিই তিনি বাড়ির আঙিনায় শক্ত লোমবিশিষ্ট, গোলাকৃতির একটি ক্ষুদ্র প্রাণী দেখতে পেলেন। তখন তিনি খেজুরের শাখাটি দিয়ে আঘাত করলে সেটি সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে যায়।

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!