
মজার কথা হল ইউরোপে ১৭০০ সালের আগে পর্যন্ত লোকে কারও বাড়ি গেলে টাকা পয়সার ব্যাগের মতন সঙ্গে করে নিজের চামচটাও নিয়ে যেত! ১৭০০ খৃষ্টাব্দের পর টেবিল সাজানোর প্রথা চালু হয়। বড়লোকেদের চামচ সোনা বা রূপোর হত। ১৭২১ সালে ডন কিয়টের উপন্যাস থেকে ‘বর্ন উইথ আ সিলভার স্পুন’ কথাটা প্রচলিত হয়। অর্থাৎ বড়লোকের সন্তান। রূপর চামচ নিয়ে আরেকটা অভিনব তথ্য হল সেগুলো দিয়ে অনেক সময় খাবারে বিষ আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা হত! আগেকার দিনের বিষ আর্সেনিক বেশির ভাগ সময় আর্সেনিক সালফাইড হত। এদিকে রূপোর সঙ্গে সালফার বা গন্ধকের প্রতিক্রিয়া রূপোকে কালো করে দেয় তাই আর্সেনিক সালফাইড সহজেই ধরা পড়ে যেত। আমরা এখন যে ধরনের চামচ দেখতে অভ্যস্ত সেই চামচ ১৮০০ শতাব্দী থেকে চলছে। মানে সামনের দিকটা ঈষৎ ছুঁচোল আর হাতল দেওয়া। আগে সামনের অংশটা গোলই হত। কাঁটাচামচও অনেক দিন পৃথিবীতে রয়েছে। আগেকার কাঁটাচামচের অবশ্য দুটো করে কাঁটা থাকত আর সেগুলো ব্যবহার হত রান্না করা বা পরিবেশনে। খাওয়াটা লোকে হাত, চামচ বা ছুরি দিয়েই করত। চামচের মতন মিশরের কাঁটাচামচও পাওয়া গেছে। চিন দেশে ২৪০০-১৯০০ খৃষ্টপূর্বাব্দেও চামচ ব্যবহার হত। এদিকে মিশর থেকেই নাকি কাঁটাচামচ ভেনিসে যায়। ১১০০ শতাব্দীতে নাকি এক রাজকন্যা তার বিয়ের যৌতুক হিসেবে কাঁটাচামচ এনেছিলেন এবং তাতে তাঁর হবু শ্বশুর বাড়িতে বেশ কলরবের সৃষ্টি হয়! ধর্মভীরু ভেনিসের লোকজন মনে করত কাঁটাচামচ দিয়ে খাওয়া মানে ভগবানকে অসম্মান করা কারণ তিনি তো আমাদের খাবার জন্যে আঙ্গুল দিয়েছেন! সেই রাজকন্যা যখন দু বছর বাদে কোন এক অজানা অসুখে মারা যায় তখন লোকে ভগবানের অভিশাপ বলেই ধরে নিয়েছিল। এই ভাবেই কাঁটাচামচের প্রতি লোকেদের ভীতি বেশ কিছুদিন চলেছিল। শেষে ১৬০০ শতাব্দীতে ক্যাথারিন ডি মেডিসি দ্বিতীয় হেনরির সঙ্গে বিয়ের পর খাওয়ার জন্যে কাঁটা ব্যবহার করা শুরু করেন। ১৮০০ শতাব্দীতে ইউরোপের বড়লোকরা কাঁটাচামচ ব্যবহার করতেন এবং নিজের কাঁটা চামচ নিজের সঙ্গে করে নিয়ে ঘুরতেন! সাধারণ মানুষ কাঁটা চামচ ব্যবহার করতে পেরেছিল আরো ১০০ বছর পরে এবং তখন দাম এতটাই কমে যায় যে সবাই নিজেদের বাড়িতে বেশি বেশি করে কিনে অতিথিদের থালার সঙ্গে ব্যবহারের জন্যে দিতে সক্ষম হয়। এর পর থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবারের জন্যে অনেক রকমের কাঁটাচামচ তৈরি হতে থাকে। যেমন মাংস খাওয়ার জন্যে এক রকম, চিজ খাওয়ার জন্যে এক রকম, স্যালাড খাওয়ার জন্যে এক রকম ইত্যাদি। পাশ্চাত্যে এখনও কাঁটা চামচের কদর বেশ বেশি। আর ছুরি? ছুরি জিনিসটা আদিম যুগের মানুষও ব্যবহার করেছে – অস্ত্র হিসেবেও আর খাবার কাটার জন্যেও! তবে আগেকার দিনে খাওয়ার টেবিলে রাখা ছুরিগুলোও ধারলো হত আর তাই খেতে খেতে কথা কাটাকাটি লেগে গেলে হুলুস্থুল অবস্থা! তাছাড়া খেতে গিয়ে গাল মুখ কেটে রক্তারক্তি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে তাই খাবার টেবিলের ছুরিকে ক্রমে ভোঁতা করে দেওয়া হয়! তবে স্টেনলেস স্টিলের ছুরি তৈরি হয়েছে মাত্র বিংশ শতাব্দীতে!