আম্মুর কাছে যাব

চর্যার পুষি বিড়াল ইন্দিরা। ইন্দিরার বয়স এক বছর। চর্যার বয়স আট বছর। চর্যা সকাল সাড়ে ছয়টায় ভ্যানে চড়ে স্কুলে যায়। ফিরতে ফিরতে সাড়ে ১১টা। চর্যার বাবা চর্যাকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে অফিসে রওনা হয় ১২টার দিকে। চর্যা ঘুমায় খাটের ওপর, নিচে লম্বা হয়ে শুয়ে লেজ নাড়ে পুষি ইন্দিরা। দুপুর থেকে ইন্দিরা আর চর্যা সারা ঘরে একা।
চর্যারা একটা হাউজিংয়ে থাকে। চর্যাদের বিল্ডিংয়ের আশপাশে ঝোপ-জঙ্গল। মাটির গর্তে বেজি থাকে। সারা দিনই বেজিগুলো হেঁটে বেড়ায় হাউজিংয়ে। মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখে। ইন্দিরা দোতলার জানালায় বসে বেজির চলাফেরা দেখে। এ সময় অস্থির আচরণ করে একবার ওঠে, একবার বসে। মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে। এই করতে গিয়ে দুবার সানসেট থেকে ইন্দিরা নিচে পড়ে গেছে। খঁুড়িয়ে খঁুড়িয়ে হেঁটেছে অনেক দিন।
চর্যা ইন্দিরাকে স্কুলে যাওয়ার সময় ছেড়ে দিয়ে যায়। আর ইন্দিরা বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বেজির গর্তে মুখ দিয়ে বসে থাকে। বেজিগুলো গর্ত থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখে। তারপরই ইন্দিরার মুখে কষিয়ে থাপড় দিয়ে নির্বিকারে খাবার খঁুজতে বেরিয়ে যায়। ইন্দিরা থাপড় খেয়ে বেজির পিছু পিছু দৌড়ায়। একবার বেজি কামড়ে ওর পা আর লেজ ছিঁড়ে ফেলে। রক্তাক্ত অবস্থায় বাসায় ফেরে ইন্দিরা, ওর চলাফেরা খাওয়াদাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পায়ে মুখ গুঁজে বসে থাকে। ইন্দিরার জ্বর আসে। কাঁপতে থাকে। চর্যা ইন্দিরাকে কাঁথা পেঁচিয়ে বাবুকাকার সঙ্গে মিরপুর চিড়িয়াখানার পশু ডাক্তারের কাছে যায়। সে যাত্রায় ইন্দিরা বেঁচে ওঠে।
চর্যা এ জন্য ইন্দিরাকে বকে, ‘ইন্দু, তুই না একটা বোকা। তুই বেজির গর্তে মুখ দিয়ে বসে থাকিস কেন রে গাধা? তোর আক্কেল হয় না।’ ইন্দিরা লেজ নাড়ে আর চোখ পিট পিট করে মিউ মিউ ডাকে।
চর্যাদের ঘরের দেয়ালে চর্যার আম্মুর ছবি ঝুলানো। দিনের বেলায় চর্যার বাবুকাকা বাসায় থাকে। বাবুকাকা যখন কলেজ যায়, চর্যা তখন একা। চর্যা যখন গোসল করতে বাথরুমে ঢোকে, সামনে ইন্দিরা একটু দূরে মুখ গুঁজে বসে থাকে। সকালে বুয়া রান্না করে যায়। চর্যা নিজে ভাত নিয়ে টিভি দেখতে দেখতে খায়। ইন্দিরার সামনে কাগজের ওপর খাবার দেয় চর্যা। তখন অনেক কথা বলে ইন্দিরার সঙ্গে, ‘আচ্ছা রে ইন্দু, আমার মা নেই। তোর মা কই রে? তোর মা কি মরে গেছে। তোর মতো দেখতে হুবহু একটা বিল্লি যে হাউজিংয়ে ঘুড়ে বেড়ায়, সে তোর মা না বোন? মা বা বোন হলে তোকে দেখলে তাড়া করে কেন রে? কথা বল ইন্দু। তুই কথা বলতে পারলে, তোর সঙ্গে কত কথা বলতে পারতাম। তুই বোবা কেন রে?’
ইন্দু মিউ মিউ করে জিব চাটছে। আর লেজ নেড়ে যাচ্ছে।
‘তুই আমার সব কথা বুঝিস ইন্দু? বলতে পারিস না কেন?’
চর্যাদের স্কুলের সামনে বাচ্চাদের মায়েরা দাঁড়িয়ে থাকেন। স্কুল ছুটি হলে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের জড়িয়ে ধরেন। মুখে তুলে খাইয়ে দেন। চর্যা একা একা স্কুল থেকে বের হয়ে ভ্যানে উঠে বসে থাকে চুপচাপ। তারপর ভ্যানওয়ালা অনেক জায়গা ঘুরে, কয়জনকে নামিয়ে দিয়ে চর্যাদের হাউজিংয়ে আসে।
চর্যার মা নেই, এই কথাটা চর্যা কাউকে বলে না। কিন্তু চর্যার কাকলি মিস ক্লাসে বলে বসে, ‘চর্যা এতিম, চর্যার মা নেই। তোমরা চর্যার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না।’
চর্যা কাঁদতে কাঁদতে বাসায় আসে।
রাতে চর্যা ফুঁপিয়ে কাঁদে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আব্বু, আমি আম্মুর কাছে যাব।’ ভোর হয়। চর্যা স্কুলে যায়। ইন্দিরা জানালায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় থাকে চর্যার জন্য।

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

দুঃখিত!