
শরৎ শিশির ভেজা সদ্য জেগে ওঠা একটি গ্রাম নাম রহমতগঞ্জ। কাজলা নদীর স্বচ্ছ কালো জল। কচি তাল শাঁসের ভেতরে রসের মত সঞ্জীবনী সুধা এ গাঁয়ের মানুষের কাছে। ক’দিন হলো বর্ষার পানি নামতে শুরু করেছে আমন ধানের ক্ষেত থেকে। এখনও গোড়ালি পরিমাণ পানি আছে কোথাও কোথাও। কোন কোন ক্ষেতে আবার পানি প্রায় শুকিয়ে এসেছে। কাদা আর এখানে সেখানে অল্প স্বল্প পানিতে, চড়চড় করছে ডিমওয়ালা কই ও বড় বড় পুঁটি মাছ। এ গ্রামেরই ব্যাপারী বাড়ির দুরন্ত ছেলে জাফর। তার বন্ধু হাসান, সবুজ ও আলম। ধান এখনও পাকতে শুরু করেনি। কাঁচাধানে চাপ দিলে গাভীর প্রথম শালদুধের মতো বেরিয়ে আসে অপুষ্ট অর্ধতরল চাল।
জিভ লাগিয়ে স্বাদ নেয় জাফর। হাসান, সবুজ আর আলমকে সাথে নিয়ে নদী সাঁতরে পেরিয়ে কেবল দক্ষিণের দিকে হাঁটছে। আর আনমনে কচি জিহ্বা দিয়ে অবিরাম স্বাদ নিয়ে চলছে সবুজ ধানের মিঠা দুধের। সবার সামনে হাঁটছিল হাসান, সবুজ, জাফর আর শেষে আলম। হাসান এ গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার আব্দুল হালিমের ছেলে। আব্দুল হালিম পেশায় একজন দিনমজুর। নির্দিষ্ট কোন পেশা নেই তার। সে ঋতুভেদে কাজকর্ম করে। বর্ষায় মাছধরা, হেমন্তে ধানকাটা, শীতে ব্যাপারী বাড়ির জমি বর্গা নিয়ে মশুর, মটর ডাল, ধনিয়া, সরিষা চাষ- এই আর কী। হাসানকে স্কুলে দেয়ার চেষ্টা করছিল হালিম। কিন্তু দু’দিন না যেতেই ক্লাসে বসা নিয়ে মারামারি করে বই ফেলে পালিয়ে এসেছিল। তারপর স্কুলে আর যায় না, তাও তিন-চার বছর হলো। সবুজ আর আলমও এ পাড়ারই ছেলে। ধানক্ষেতের আইল ধরেই হাঁটছিল চারজন।
ঠিক যেন তাবলিগের গাস্তের হাঁটার মতো। ইচ্ছা হলেই ইচ্ছোমত হাঁটা যায় না। যেভাবে আইল সেভাবেই চল। কিছুদূর হাঁটার পরই হাসান ঢোকে গেলো আমনধানের ক্ষেতের কাদা পানিতে। দেরি করল না জাফর, সবুজও। আর আলমের হাতে একটা বাঁশের ডুলা (মাছ রাখার পাত্র)। তিনজনে মিলে কাদা পানিতে হাত দিয়ে ধরতে লাগলো আটকে পরা ডিমওয়ালা কৈ, পুঁটি আর শিং মাছ। তা সযতেœ ডুলায় ভরে রাখছে আলম। ধরা মাছ ভাগাভাগি করে নিয়ে একরাশ কাদা মেখে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল জাফর। ছাপা লুঙ্গির কোঁচড়ে তার কৈই, শিং, পাবদা পুঁটি, বাইম মাছ।
উঠোনের মাঝখানে কোঁচড় খোলে মাছ ফেলে দেয়। ছোট বোন সাবিনাকে ডেকে মাছ কুটতে বলে ভোঁ দৌড় দিল পুকুর ঘাটে। পুকুরের পাড় থেকে লাফ দিয়ে পানিতে পড়েই ডুব দিল জাফর। রহমতগঞ্জেরই পাশের গ্রাম বিষ্ণপুর। এ গ্রামেরই বিনোদিনী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়র অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র জাফর। তার ছোট বোন সাবিনা এ স্কুলেই পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। জাফরের মা মারা গেছে আজ প্রায় দু’বছর হলো। সেই থেকে জাফরের বাবা সালাম ব্যাপারীও কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। ক্যান্সার হয়েছিল জাফরের মায়ের। চিকিৎসার ত্রুটি করেনি সালাম ব্যাপারী। জমি জিরাত যা ছিল প্রায় সবই বেচা শেষ। এখন শুধু এক বিঘে ধানিজমি, এই বসতবাড়ি আর পুকুরের জলকোরের অংশ ছাড়া সহায়সম্পদ বলে আর কিছুই নেই। মা-মরা ছেলে জাফরের বাপও তেমন খোঁজখবর রাখেন না তার। অনেকটা নিজের খেয়াল খুশিমত চলে জাফর।
কারও কোন পরোয়া নেই। আজ এর গাছের ডাব তো কাল ওর গাছের জাম্বুরা, পরশু আরেক গাছের পেয়ারা। একদিন ঘুঘুর বাচ্চা ধরা তো আরেকদিন দোয়েলের বাসা থেকে ডিম বের করা। সাথে তো সহযোগীর অভাব নেই। হাসান, সবুজ, আলম তো আছেই আর প্রয়োজন হলে দক্ষিণ পাড়ার সব ছেলে একসাথে করাতো লবণ মরিচ একসাথে করে কাঁচা কূল খাওয়ার মত ব্যাপার। তবে ভাল ছাত্র হিসেবে জাফরের নামডাক গ্রাম জোড়া। দুষ্টুমি করুক আর যাই করুক ক্লাসে রোল তার এক হওয়া চাই-ই-চাই। আর তাই গ্রামের মানুষের যেন তা একটু গা সওয়া হয়ে গেছে। এবার বৃত্তি পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। মনে মনে পণ করেছে জাফর। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তিটা না পাওয়ার বেদনটা দারুণভাবে কাজ করে তার মনে।
তবে কষ্ট পেয়ে বা লাভ কি? তখনও তো বৃত্তির মানেটাই ঠিক মতো বুঝে না সে। পুকুরে বেশ কয়েকটা ডুব দিয়েই জাফর গায়ের কাদা ডলতে থাকল হাত দিয়ে। এবার দুষ্টু বুদ্ধি খেলল জাফরের মাথায়। লুঙ্গির নিচে একটি গিঁট দিয়ে হাত দ্বারা পানির ওপর থেকে লুঙ্গির ভেতর বাতাস ঢোকাতে লাগল। লুঙ্গি ফুলতে ফুলতে একসময় বেলুনের আকার ধারণ করে। দুই হাতকে বৈঠা বানিয়ে এবার নৌকার মত চালাচ্ছে। নাহ আর ভাল লাগছে না। এবার বাড়িতে চলে যাই ভাবল জাফর। যেই ভাবা সেই কাজ। উঠোনে গিয়েই হাঁক ছাড়ল জাফর। সাবিনা, ও সাবিনা আমার লুঙ্গিটা আন। তাড়াতাড়ি কর। পুকুরে ডুবাতে ডুবাতে চোখগুলো লাল হয়ে গেছে জাফরের।
সে দিকেই তাকিয়ে ছিল সাবিনা। মা থাকলে বকাঝকা করত। কথা মনে পড়তেই কষ্টে চেহারাটা মলিন হয়ে গেল সাবিনার। লুঙ্গিটা বদলিয়ে দৌড়ে ঘরে ঢোকল জাফর। চার চালা টিনের ঘর। জাফরের দাদা বানিয়েছিলেন আজ প্রায় তিরিশ বছর হয়ে গেল। জাফরের দাদা মারা গেছেন তাও ১০ বছর হল। সামনের ভাদ্র মাসে তার মৃত্যুবার্ষিকী হবে। গ্রামের মাতবর ছিলেন জাফরের দাদা রুসমত ব্যাপারী। আজও দাদার শখের পাইপওয়ালা হুঁকা রয়ে গেছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে। দাদার চেহারা এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে জাফরের। এলাকার প্রায় সব বড় বড় বিচার-আচার হতো জাফরদের উঠোনে। মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য গুড়, তেজপাতা, আদা দিয়ে চা তৈরি হতো কয়েক পাতিল। আর সাথে তো পান, সুপারি, বিড়ি আছেই। এগুলোর আয়োজন জাফরের দাদা অধিকাংশ সময় করত। তবে মাঝে মাঝে বিচারপ্রার্থীরাও অংশগ্রহণ করতো। গ্রামের প্রায় সব সর্দারই হাজির থাকত মিটিংয়ে। জাফরদের বাড়িটা রাস্তার পাশে হওয়ায়, যাতায়াতেরও সুবিধা। বাজারও বেশি দূরে নয়। বাড়ির সামনেই বিশাল বিল। আর বিলের মাঝ দিয়েই চলছে কাজলা নদী। জাফরের দাদা বেশি শিক্ষিত লোক ছিলেন না। দুই তিন ক্লাস পড়ালেখা করছেন।
তবে বুদ্ধি আর কৌশলে এ অঞ্চলে তার মত দ্বিতীয় লোক খোঁজে বের করা মুশকিল। জমির ম্যাপ দেখেই বলে দিতে পারতেন বৃত্তান্ত। জমির দাগ নম্বর, সিএস, আরএস খতিয়ান সম্পর্কেও জ্ঞান তার ঈর্ষা করার মতো। জেয়াফতে (বেশি লোকের খাওয়ার অনুষ্ঠান) কতজন খাওয়াতে কতটা গরু, কতটা খাসি, কত মণ চাল লাগবে তা ছিল তার নখদর্পণে। গ্রামের সব বড় বড় কাজে ছিল তার সরব এবং নেতৃত্বস্থানীয় উপস্থিত। শরীরে সরিষার তেল মেখে, মাথায় তেল দিয়েছে চুবিয়ে চুবিয়ে। মনে হয় পানকৌড়ির মাথার মত কালো তেলতেলে। সেই সকালে কিছু মুড়ি, কাঁচা মরিচ, আর পেঁয়াজ দিয়ে খেয়ে বিলে গিয়েছিল মাছ ধরতে। এখন বেলা বারোটা বিশ। ঘরে পালায় লাগানো দেয়াল ঘরিটির ওপর নজর বুলাল জাফর। ক্ষিধেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। জোড়ে ডাকতে লাগল সাবিনাকে। সাবিনা, ও সাবিনা জলদি কয়ডা ডিমওয়ালা পুঁটি মাছ ভাইজা দে। প্লেটে পান্তা ভাত, লবণ, পেঁয়াজ আর পোড়া মরিচ সাজিয়ে বসেছে। এর মধ্যে বাটিতে পুঁটি মাছ ভাজা নিয়ে হাজির হয়েছে সাবিনা। তুই খাইছিলি? জিজ্ঞাসা করে জাফর। বোনের চেহারার দিকে চাইতেই কষ্টে ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। এ কষ্ট কাউকে বোঝানো সম্ভব না। এ বয়সে তা প্রকাশ করার ভাষাও জানা নেই তার। সাবিনার চেহারাটা অনেকটা তার মায়ের মত হয়েছে। কি জন্য যে মা এতো তাড়াতাড়ি মরে গেল বুঝে আসে না জাফরের। আল্লাহর প্রতি মনে মনে গোস্বা হয় তার। সবারই তো মা আছে আর আমার মায়েরই তুমি নিয়া গেলা। মা থাকতে কত রকম পিঠা-পায়েস খাইছি। স্কুলে টিফিন খাওয়ার জন্য টাকা দিতো মা। এসব কথা মনে হতেই চোখে জল এসে যায় জাফরের। সাবিনা দেখে ফেলে এ ভয়ে দরজায় পাশে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসে। বারোটা চল্লিশ বাজে। আজ তো শুক্রবার। মসজিদে একটু তাড়াতাড়িই যেতে হবে। পুরনো কাঠের আলমারিটা খোলে পাঞ্জাবিটা পরে নেয় জাফর। কালো সোনালি জরির কাজ করানো টুপিটা মাথায় দিতে ভুলে না সে। মসজিদটা জাফরদের বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমটিার দূরে। যে রাস্তাটা বড় সড়ক থেকে জাফরদের বাড়ির সামনে দিয়ে বাজার পর্যন্ত গিয়েছে। সে রাস্তারই দক্ষিণ পাশে বিলের একটু ভেতরে মসজিদের অবস্থান। মসজিদ থেকে বাজার প্রায় পাঁচ মিনিটের পায়ে হাঁটার পথ। বড়রা হাঁটলে পাঁচ মিনিট। তবে ছোটদের হাঁটলে তো আট দশ মিনিট লাগবেই। পুরনো দিনের মসজিদ। বয়স প্রায় একশ বছর হবে।
কত ঘটনার সাক্ষী এ মসজিদ। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল আর বাংলাদেশের আমল তো চলছেই। মসজিদের ছাদে তিনটি গম্বুজ। একটি বেশ বড়। ছাদের অনেকটা জুড়ে রয়েছে এর অবস্থান। বাকি দুটি অপেক্ষাকৃত ছোট। মসজিদের সাথী হিসেবে সেই শতাব্দী ধরে আছে সুউচ্চ মিনার। এত বড় মিনার এ তল্লাটে আর একটিও নেই। মিনারের চার পাশ দিয়ে প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি। উঠে গিয়েছে একদম উঁচুতে একটি ছোট্ট কক্ষে। সেখানে দাঁড়ালে দেখা যায় গ্রামের পর গ্রাম, খাল-বিল আর জাফরদের স্কুলের দোতলা বিল্ডিংটাও। একদিন চুপি চুপি জাফর আর হাসান উঠেছিল সেখানে। পরে ইমাম সাহেব দেখে ফেলায় আর উঠবে না এমন প্রতিজ্ঞায় ছাড়া পেয়েছে তার হাত থেকে। মসজিদের বাইরের দিকটা চমৎকার সিরামিক প্লেটের ভাঙা অংশ দিয়ে কারুকাজ করা। মসজিদের ভেতরে এবং বারান্দা মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক লোক নামাজ পড়া যায় একসাথে। মসজিদের দক্ষিণ পাশে বিলের মধ্যে পাড় উঁচু করা একটি বিশাল দিঘি। কমছে কম পনের বিশ বিঘা তো হবেই। পাড়ে অসংখ্য নারিকেল গাছ শোভা বর্ধন করেছে দিঘিটির। শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের পাশে পাকা করা বসার জায়গা। হেলান দেয়ার ব্যবস্থা থাকায়, বিকেলের আড্ডাটিও বেশ জমে। দিঘির জল বেশ স্বচ্ছ আর কালো। কাঁচা গাবের রসের মতো। ডাউস সাইজের রুই আর মৃগেল মাছ আছে বেশ কয়েকটা। আর অন্যান্য মাছের তো হিসাবই নেই। নারিকেল গাছ আর পুকুরে মাছ থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে মসজিদের একটা উল্লেখযোগ্য খরচ হয়ে যায়। আর বাকিটা চলে পয়সাওয়ালা মানুষের দান সদকায়। বিশাল মসজিদের মেহরাবের পাশে খুৎবা দেয়ার স্থানে দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছেন খতিব সাহেব। খতিব আব্দুল আজিজ সাহেবের দরাজ সুরেলা খুৎবা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন সকল মুসল্লি। খুৎবা শেষে খতিব সাহেব ঘোষণা করলেন, আগামী পৌষ মাসে করিমগঞ্জের বায়তুল ফালাহ কামিল মাদারাসা মাঠে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাচ্ছিরে কুরআন আল্লামা মনোয়ার হোসাইন ওয়াজ করবেন। তিনি সকলকে ওয়াজ শোনার দাওয়াত দিলেন। আল্লামা মনোয়ার হোসাইনের নাম শুনে উপস্থিত মুসল্লিরা শুকরিয়া আদায় করলেন। মুসল্লিদের মাঝে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ করা গেলো। নামাজের পর হাসান, সবুজ, আমিন, জাহিদের বসে থাকার কথা পশ্চিম পাশের বেঞ্চিতে। নামাজ পড়ার নিয়মকানুন মোটামুটি জেনে নিয়েছে জাফর দাদীর কাছ থেকে। সূরা মুখস্থ আছে ছয়টার মতো। আর অর্ধেক পারে আরও দুটো। তাও কম কিসে। হাসানরাতো তাও পারে না। নামাজের সময় পেছনে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করে। আর ধাক্কা দেয় একজন আরেক জনকে। অবশ্য সালাম ফেরানোর আগে সবাই চুপ। সামনে থেকে মুরুব্বিরা চোখ বড় বড় করে তাকাতেই সবাই তাকিয়ে তাকে অন্য দিকে। জাফরের দাদী ঢাকায় গেছেন তা এক মাস হলো। দাদী মাঝে মাঝে ছোট চাচার ওখানে যান বেড়াতে। ছোট চাচা চাকরি করেন পুলিশে। রাজারবাগ পুলিশ কোয়ার্টারে থাকেন পরিবার নিয়ে। পরিবার বলতে চাচা, চাচী, চাচাতো ভাই মারুফ আর বোন ডালিয়া। দাদী আছেন বলেই অনেকটা কষ্ট ভুলে থাকতে পারে জাফর। দাদীও যেন আগলে রাখেন তাদেরকে বাচ্চা ফোটানো মুরগরি মতো। তবে ঠিক মুরগির বাচ্চার মত নয়। মুরগির তা এর নিচ দিয়ে ফোটানো হাঁসের বাচ্চার মতো। নামাজ শেষে কথামত সবাই চলে এলো পুকুর ঘাটে। আলোচনাটি তুললো জাফরই। আগামী শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রাইমারি স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা। ফুটবলের ব্যবস্থাটা আমিই করমু। মাঝখানে হাসান বললো, তোমার বলটাতো তিন নম্বর। আমরা পাঁচ নম্বর বল ছাড়া খেলমু না। জাফর বললো, আরে হেইডাই ব্যবস্থা কইরা রাখছি। মতি ভাইয়েরে কইছি, হেয় বলডা দিব। আর হেরে রেফারিও থাকতে কইছি। খেলা হচ্ছে রহমতগঞ্জের উত্তর পাড়া আর দক্ষিণ পাড়ার মধ্যে। উত্তর পাড়ার অধিনায়ক আমিন আর দক্ষিণ পাড়ার অধিনায়ক জাফর।
এবার কথা বলল আমিন, মাঠে তো চিক্চিকা পানি আর কাদাও আছে। এর মধ্যে খেললে তো নোখের কোনায় মাটি ডুইকা বিষ করব। আরে আরও তো সাতদিন আছে, ততদিনে মাটি শুকাইয়া যাইব জবাব দিল আমির। সিদ্ধান্ত হল সবাই দশ টাকা করে দেবে। প্রতি দলে আটজন থাকবে। মোট যা হয় তা দিয়ে ষোলটি কলম আর একটি ছোট কাঠের সিল কেনা হবে। বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড়ই একটি করে কলম পাবে। আর বিজয়ী দল নেবে সিল। জাফরের আব্বা মসজিদ থেকে বের হতেই, জাফর বলে উঠল; চল্ আহন যাইগা। পরে আবার কথা কমোনে। পাঠকের অবশ্যই জানা থাকবে যে, রহমতগঞ্জ আবহমান গ্রামবাংলার একটি খন্ডচিত্র। অসংখ্য নদ-নদীর জালের মধ্যে গেঁথে থাকা সবুজ গ্রামের একটি। রহমতগঞ্জের মতো আরও হাজারো গ্রাম আছে আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই আছে জাফর, হাসান, আমির, রোসমত আলী কিংবা সাবিনার মতো চরিত্র। চরিত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্যও খুব বেশি নেই। খুবই সামান্য। কোন কোন চরিত্র এক সময় বড় হয়। কখনও বা ছাপিয়ে যায় রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বকেও আবার কোন কোন চরিত্র মিশে যায় এ শ্যামল বাংলার প্রকৃতিক পরিবেশের মাটি কিংবা পানিতে। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানুষ এক সময় মিশে যায় প্রকৃতিতেই। দুপুরে খাবার পরে, পুকুরের পাকা ঘাটসংলগ্ন দক্ষিণ ঘরে ঘুমিয়ে ছিল জাফর। ঘুম ভাঙল সেই বিকেলে। ঘাটে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে হাঁটতে বেরুল রাস্তার দিকে। মনটা কেমন বিষন্ন লাগছে তার। এটি কাউকে বুঝানো সম্ভব নয়। কেমন যেন খালি খালি লাগে সবকিছু। কথা বলতে ভাল লাগছে না একটুও। মনে হয় নিরিবিলে কোথাও বসে থাকে। কেন এমন লাগে বুঝতে পারে না সে। পুকুরপাড় দিয়ে হাঁটতে থাকে। বড় রাস্তায় উঠার আগে মেটো রাস্তার পাশে একটা ছোট মাঠ। একটু উঁচুতে হওয়ায় বর্ষার জল ওঠেনি। মাটিও বেশ শক্ত এবং ঘাস আচ্ছাদিত। তার পাড়ার বেশ কয়েকজন ছেলে ক্রিকেট খেলছিল। তাকে খেলতে ডাকলে সাড়া দেয়নি জাফর। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদের শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসে সে। আসরের সালাত আদায় হয়নি এখনো। সময়ও বেশি নেই। যদিও মাঝে মাঝে দু-এক রাকাত সালাত ছুটে যায় তার।
তাড়াতাড়ি করে আসরের সালাত আদায় করে আবার ঘাটে এসে বসলো জাফর। মসজিদ ঘাট এবং মসজিদের আশপাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। হয়তো এখনো সবাই বাজারে। মাগরিবের আগে আগেই ফিরবে সবাই। দিঘির মাঝখানে পানির গভীরতা একটু কম। আর সেখানে ফুটে আছে লাল শাপলা ফুল। বর্ষার পানি যখন বেশি ছিলো তখন একদিন জাফর তার বন্ধুদের নিয়ে নৌকায় করে বেরিয়ে পড়েছিল বিলের উদ্দেশে। সকালে বেরিয়ে ফিরেছিল সন্ধ্যার একটু আগে। বর্ষায় বিলের সৌন্দর্য এতো চমৎকার যে, দুপুর গড়িয়ে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এলো টেরই পায়নি তারা। সেদিন অবশ্য বাবার বকুনি খেয়েছিল জাফর। বিলের কালো স্বচ্ছ জল এত সুন্দর আগে কখনও খুব কাছ থেকে দেখেনি সে। বোরো ধানের ক্ষেতের ফাঁকে ফাঁকে নৌকা চলাচলের যে রাস্তা, সে রাস্তাগুলোতে ধান গাছ না থাকায় ৮-১০ ফিট নিচের মাটিও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল জলের ভেতর দিয়ে। আর সেই পানির রাস্তায় হঠাৎ করে চলে আসত রঙিন খলিশা আর লাল পুঁটি মাছ। মাঝে মাঝে শোল মাছও দেখা যেতো। নৌকার ঢেউয়ে সতর্ক হয়ে পালিয়ে যেতো ক্ষেতের মধ্যে। সেদিন লাল শাপলা খেয়েছিল জাফরেরা। শাপলা তোলে তার ডগা থেকে আঁশ পরিষ্কার করে খেয়েছিল তারা। খেতে অবশ্য মন্দ না। হাসান ডুব দিয়ে অনেকক্ষণ পানির নিচে থাকতে পারে। তার যোগ্যতার প্রমাণ অবশ্য সে দিয়েছে বেশ কয়েকটি বড় বড় শালুক তোলার মাধ্যমে। সবাই মিলে শালুক আর শাপলা ফুলের মধ্যে থাকা নরম অংশটা খেয়েছিল প্রচুর। শাপলা ফুলের স্বাদও অবশ্য বেশ মজা। দিগন্তে সূর্য । পশ্চিম আকশ লাল হয়ে উঠেছে বেশ। শান বাঁধানো ঘাটের পাশেই বেশ বড় একটা কদম গাছ। বর্ষার শেষেও অনেক ফুল রয়েছে গাছটিতে। ফুলের ঘ্রাণ যেন হৃদয় হরণকারী সঞ্জীবনী সুধা মনে হলো জাফরের কাছে। আকাশে বালিহাঁস, বকের দল উড়ে চলছে দিগন্ত পানে। আর অল্পসময়ের মধ্যেই পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে তারা। জীবন-মৃত্যুর সংজ্ঞা কিংবা সীমানা বুঝার মতো বয়স হয়নি জাফরের। জীবনের অনেক বাস্তব ঘটনা তার চোখের আড়ালে। এ মসজিদের মিনার থেকে আজান ভেসে আসছে ‘হাইয়া আলাস্ সালাহ্, হাইয়া আলাল ফালাহ্। সন্ধ্যার পর পড়তে বসেছে জাফর। রহমতগঞ্জে এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। তবে এমপি সাহেব বলেছ ২-১ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ আসবে। দুই এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ আসবে তাও চার পাঁচ বছর আগে বলেছেন।
কবে যে দুই এক বছর শেষ হবে তা জানে না জাফর। হারিকেনের আলোয় দক্ষিণ ঘরের এক কোনায় টেবিলে বই রেখে পড়ছিলো সে। মিটমিটে আলোয় বেশ কিছু বড় বড় পোকা এসে জমা হয়েছে হারিকেনের চারপাশে। এর মধ্যে একটা কালো বড় পোকা ধরে উল্টো করে হারিকেনের ওপরে রেখেছে সে। আর পোকাটি সোজা হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হারিকেনের ওপরে থাকা টিনের গরমের মাত্রা তার চেষ্টার গতিকে ছাড়িয়ে তোলছে। গোটা ঘর অন্ধকার থাকলেও তার মধ্যে ছোপ ছোপ আলো। এক কোনায় হারিকেনের আলোয় আলোকিত জাফর। বাবা এখনো হাট থেকে ফেরেনি। আর সাবিনা গিয়েছে তার আরেক চাচার বাড়িতে। তাদের ঘরের অনতিদূরে চাচা আব্দুল করিমের বসতভিটা। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি না পেলেও ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে জাফর। স্কুলের স্যারেরাও বেশ আশাবাদী। তাইতো ১-১০ রোল নাম্বরধারী ১০ জনকে নিয়ে প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম ক্লাসের পরেও অতিরিক্ত ঘণ্টা করান। সে অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীরাও বেশ মনোযোগী। রাতের খাবার খেয়ে শোয়ে পড়ছে জাফর। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আছড়ে পড়ছে বিছানার এক অংশে। ঘরের ভেতর বেশ কয়েকটি জোনাকি পোকা কখন যে ঢোকে গিয়েছে টেরই পায়নি সে। দক্ষিণ ঘরে একা থাকে জাফর। ঘরের পাশেই ঘাটের সাথে লাগোয়া কামিনী ফুলের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। রাত যত বাড়ছে ঘ্রাণও যেন তীব্র হচ্ছে আরও বেশি। ভরা পূর্ণিমার অবাক করা জ্যোৎ¯œা ছড়িয়ে পড়েছে মাঠ, ঘাট, পুকুর তেপান্তরে। জানালা দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাই দেখছিল জাফর। আল্লাহর এ অপার নেয়ামত যদিও তা বুঝার পূর্ণ বয়স এখনো হয়নি তার। তবুও মনের ভেতর কেমন যেন আনচান করে ওঠে। প্রকৃতির রাতের শোভা খেতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ছে জাফর বুঝতেই পারল না। বেশ কয়েক দিন হলো আকাশে বেজায় রোদ। পূর্ণ তেজ নিয়ে নেমে এসেছে মাটিতে। বর্ষা ঋতু তখনো শেষ হয়নি। তারপরও এতো রোদ কেন বুঝে আসে না মানুষের। তীব্র গরম থেকে বাঁচার আকুতি যেন সকলের। স্কুলে যাওয়ার সময় জাফর দেখতে পেল হাসানদের উঠানে উত্তর পাড়ার বেশ কয়েকজন ছেলে-বুড়ো কলস দিয়ে উঠানে পানি ছিটিয়ে বৃষ্টির গান করছে- ‘আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই আল্লাহ মেঘ দে পানি দে ছায়া দে রে তুই’ এভাবে উঠান ভিজিয়ে নেচে নেচে বৃষ্টি কতটুকু আনা যাবে জানে না জাফর। আর আল্লাহকে এভাবে তুই সম্বোধনটা ভালো লাগে না তার কাছে। কিছুক্ষণ নাচ গান দেখে স্কুলের পথে রওনা হয় জাফর।
আজ যথারীতি সব ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও ইংরেজি স্যার আসেননি। কোথায় নাকি বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়েছেন। আর ইংরেজি ঘণ্টাটা সবশেষে হওয়ার কারণে এক ঘণ্টা আগেই অষ্টম শ্রেণির ক্লাস শেষ হচ্ছে। বৃত্তির জন্য আলাদাভাবে কোচিং করা ছাত্ররা প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম সাহেবের কাছে কোচিং থেকে মওকুফের আবেদন করলো। স্যারও রাজি হয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে আকাশের ইশান কোণ কালো গম্ভীর হয়ে উঠেছে। অবশ্য আজকে তো অনেক রোদ ছিল তারপরও হঠাৎ এমন করে আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো কেন ভাবছিল জাফর। তারপরও মনে মনে খুশি হলো। অনেক দিন পর বৃষ্টি হবে এ খুশিতে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই স্কুল থেকে বেরিয়ে ছিলো জাফররা। হঠাৎ জোরে শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির এক একটা ফোঁটা মস্ত বড় বড়। রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছিলো জাফর। রাস্তার পাশের বাড়িগুলি থেকে ডাক আসল- ‘জাফর চলে আসো আমাদের ঘরে। বৃষ্টিতে শরীর খারাপ করবো।’ আজ বৃষ্টিতে ভিজতেই যেন সব আনন্দ জাফরের। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিল পলিথিনটা আছে কিনা? ঠিকই আছে তাহলে। পলিথিন বের করে বই খাতাগুলো তার ভেতরে ঢোকিয়ে নেয়া সে। স্কুলটা তাদের বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে। বৃষ্টির তোর যেন বাড়তে লাগলো আরও। বই খাতা হাতের বগলে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য দিয়ে মেঠো পথের ঘাসের মাঝে হেঁটে চলছে জাফর। বৃষ্টির প্রবলতায় খুব বেশি দূরের দৃশ্য ভালো দেখা যাচ্ছে না। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানি আর মেঘের গর্জন। লোকালয় ছাড়িয়ে চলে এসেছে খানিক দূরে। দুই পাশে বিল মাঝখানে মেঠোপথ। আর কিছুদূর গেলেই কবরস্থান। জাফরদের গ্রাম আর তার স্কুল এর মাঝামাঝিতে অবস্থিত করবস্থানটি। এখানে দু’গাঁয়ের মানুষদেরকেই কবরস্থ করা হয়। আর এখানেই চিরনিন্দ্রায় শায়িত তার মা জননী। প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যেই আজ কেন যেন মাকে বেশি মনে পড়ে। প্রকৃতির এ তুমুল বৃষ্টির মতোই তার হৃদয়ে প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। রাস্তা থেকে কবরস্থানটি একটু উঁচুতে। আনমনে ওপরের দিকে উঠতে থাকে জাফর।
সামনেই তার মায়ের কবর। বৃষ্টির পানিতে ভিজে গিয়েছে। কিছু পানিও জমেছে কবরের ওপরে। নাম না জানা সাদা ফুল ফোটে আছে কবরের পাশে। তবে ফুলের ঘ্রাণটা জাফরের বেশ পরিচিত। কবরের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। একটা লম্বা সময়। বৃষ্টির বাড়তে থাকে আরও। অবিরাম ঝড়তে থাকে বৃষ্টির ধারা। বৃষ্টির মতই হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অবুঝ মনের গহিনে ব্যথা বাড়ায় বহুগুণ। এখনো মায়ের নিষ্পাপ চাহনি আর নানা ঘটনার খন্ড খন্ড চিত্র ভেসে উঠে তার স্মৃতিপটে। দূর থেকে আবছা মায়ের শব্দও যেন শুনতে পায় জাফর। তাও অনেকটা স্মৃতির মতো করেই আসে আবার মিলিয়ে যায়। একটা অদৃশ্য সুতা কবরের সাথে যেন টেনে রাখে তাকে। এভাবে কতো সময় চলে যায় জানে না জাফর। তার পেছন থেকে তার এক সহপাঠী কালাম ডাকে উঠতেই সম্বিৎ ফিরে পায় সে। বাড়িতে এসে কাপড় পাল্টিয়ে গা মোছে শুয়ে পড়ে। আসর গড়িয়ে মাগরিব তা অবশ্য বুঝার উপায় নেই। শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। আজকে আর পড়তে ভালো লাগছেনা তার। সেদিন সারারাত বৃষ্টি হলো। সকালবেলায়ও তুমুল বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণই নেই। খালবিলে পানি বেড়েই চলছে কেবল। একটানা আটদিন যাবৎ বৃষ্টি হলো। প্রথমবারের বর্ষায় যতটুকু পানি হয়েছিল এবার তার থেকে আরও বেশি হলো। সবাই ভেবেছিলো বর্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। তবে অভিজ্ঞ মুরব্বিদের একটা ধারণা ছিলো আবারও হতে পারে বর্ষা। অনেক পুরনো চোখ। অভিজ্ঞতাও অনেক বশি। আবার নৌকা চলল বিলের পানিতে। এভাবেই চলতে থাকে ঋতুর পালাবদল। দেখতে দেখতে ভরা যৌবনের নদী খালগুলোও শুকিয়ে যায়। নদীর প্রমত্তা রূপ নিস্তেজ হয়ে আসে। কোথা থেকে এত জলরাশি আসে আবার হারিয়ে যায় জানে না প্রাণীকুল। খাল বিল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। জলে মগ্ন মেঠো পথগুলো আবার জাগতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও জেগে ওঠা পলির আস্তরণ ভেদ করে বেরিয়ে আসছে সবুজ কচি ঘাসের ডগা। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ শুরু হয়েছে। মাঠের ধানও পাকতে শুরু করেছে। বর্ষার পানিতে লম্বা ধান গাছগুলো পানির উপরে ভেসে থাকতো।
পানি নেমে যাওয়াতে সেগুলো তখন মাটির উপরে নেমে এসেছে। আর দশ পনের দিন বাদেই ধান কাটা শুরু হবে। নতুন ধানে ভরে ওঠবে কৃষকের গোলা। খালের পানি সেচে সেখান থেকে কই, শিং, মাগুরসহ দেশী মাছ ধরার উৎসব যেন শুরু হয়ে গিয়েছে। আর কদিন বাদেই নুতন ধানের সুগন্ধি চালের সাথে শিং, মাগুর মাছের ঝোল খাওয়ার কথা- মনে আসতেই জিভে জল আসে জাফরের। বাড়ির পাশেই একটা খাল আছে। সেখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তাছাড়া কাজলা নদির পানি কমলে আর রোদের তাপ বৃদ্ধি পেলে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় সেখানে। এবারও জাফর মাছ ধরবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তার বাবা বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আগেই নিষেধ করে দিয়েছেন মাছ ধরার ব্যাপারে। বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত পেরিয়ে শীত মায়াবিনীর আগমন এখনো পুরোপুরি ঘটেনি। তবে হেমন্ত ইতোমধ্যেই জানিয়ে গেলো শীত আসছে। কাজলা নদী পেরিয়ে যে মাঠ সে মাঠে এখন নানা জাতের শস্য। আর বাহারি তার ফুলের মেলা। সেদিকে তাকিয়ে নয়ন জুড়িয়ে যায়। হলুদ সরিষার ফুল, মটর-কলাই ফুল, মশুর ডালের ফুল, সূর্যমুখীর হলুদ ফুল। প্রত্যেকটা শস্যই যেন একেক রং আর বাহারি ফুলের পশরা সাজিয়ে বসেছে। বাহারি রং এর সাথে বাহারি ঘ্রাণ। ধীরে ধীরে শীত জেকে বসেছে চারদিকে। এতোদিন কাঁথায় মানলেও দিনে দিনে লেপের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে পড়ছে। ঢাকা থেকে জাফরের দাদীও ইতোমেধ্যে বাড়িতে চলে এসেছেন। আসার খবর পেয়ে দাদীর অপেক্ষায় বড় রাস্তার পাশে স্টেশনে যেয়ে বসেছিল জাফর। দাদি গাড়ি থেকে নামলে তার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়া দেয় সে। দাদীও অনেক দিন পর জাফরকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। তার দাদী অবশ্য মাটির পাত্রে কাঠ কয়লা আর তুষ দিয়ে আগুন পোহাবার আদিম পন্থাটি তখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন। শীতকালে জাফরের সবচেয়ে ভালো লাগে সকালে আগুন পোহাতে। আর কিছুটা আলসেমিও পেয়ে বসে তাকে। তারপরও সামনে বৃত্তি পরিক্ষা। প্রতিদিনই ভোরে দাদী ডাকেন তাকে পড়ার জন্য। বলেন, ভোরের পড়াটাই বেশি মনে থাকে। জাফরের ধারণাও তাই। কষ্ট হলেও তাই পড়তে বসে। একদিন বিকেলে কালাম জিজ্ঞেস করলো- ‘জাফর আগামীকাল বাদ আসর তোমার কি কোনো কাজ আছে?’ জাফর বলল ‘না তেমন কাজ নেই। তাছাড়া কালতো শুক্রবার। ক্লাসও নেই। কেনো বলোতো?’ কালাম বললো কালকে আমাদের মসজিদে শহরের কলেজে পড়–য়া দুইজন বড় ভাই আসবেন। আমাদের এলাকায় তারা আমার এবং তোমার মতো স্কুল কলেজের ছাত্রদের নিয়ে একটু বসবেন। জাফর বলল ‘আচ্ছা আমি থাকার চেষ্টা করবো।’ কালামও ভালো ছাত্র। ক্লাসে ফার্স্ট হতে না পারলেও জাফরের সাথে মার্কসের ব্যবধান খুব বেশি হয় না। পরদিন জাফররা নামাজ শেষে কালামসহ প্রায় ২৫-৩০ জন স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্র মসজিদের বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছে। এতোমধ্যে নামাজ শেষে দুজন সুদর্শন যুবক যাদের প্যান্ট টাখনুর কিছুটা উপরে, তাদের কাছে এসে বসল। সুন্দর পরিচ্ছন্ন পোশাকে, ছোট ছোট দাড়ি আর চমৎকার বাচন ভঙ্গির মানুষ দুজনকে প্রথম দেখায় জাফরের বেশ ভালো লাগে। দেয়ালের দিকে পিঠ রেখে সবাইকে সামনে বসিয়ে কালাম ও মেহমান দু’জন বসে। কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে কালামই বৈঠক শুরু করে। মেহমানদের মধ্য থেকে একজন সকলের পরিচয় গ্রহণ করেন এবং তাদের পরিচয়ও তারা পেশ করেন। একসময় প্রধান মেহমান আলোচনা শুরু করেন। তিনি তাদেরকে বলেন ‘প্রিয় ভাইয়েরা, এ জীবনটাই আমাদের জন্য শেষ নয়। দুনিয়ার এ ক্ষুদ্র জীবন শেষে আমাদেরকে আখেরাতের অনন্ত জীবনে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে সকলকে মহান আল্লাহর সামনে তাদের সব কাজের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। দুনিয়ার জীবন মহান আল্লাহর নির্দেশনমতো পরিচালিত করতে পারলেই কাল কেয়ামতের মাঠে আল্লাহর কাছে থেকে পুরস্কার হিসেবে জান্নাত পাওয়া যাবে। দুনিয়ার এ জীবন খুবই অল্প সময়ের। এ দুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। আর দুনিয়াতে যে তার মনিবের দেয়া বিধানমতো জীবন পরিচালনা করবে, আখেরাতে তার মর্যাদা অনেক বেশি হবে। আর যে শয়তানকে অনুসরণ করবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম। তাই আমাদেরকে নিয়মিত কোরআন, হাদিস, ইসলামি সাহিত্য অধ্যয়ন করতে হবে। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামায়াতের সাথে আদায় করতে হবে। রমজানের সাওম সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তার পাশাপাশি আমাদেরকে ভালো ছাত্রও হতে হবে। হতে হবে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। কেননা আমাদের রাসূলুল্লাহ সা: ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আমাদের তার জীবন অনুসরণ করে চলতে হবে। হতে হবে পরিবারের এবং সমাজের সেরা মানুষ।’ মেহমানের কথাগুলো জাফরের কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। এভাবে কেউ যেন তাকে কখনো বলেনি। না স্কুলের স্যার না তার বাবা, না খতিব সাহেব। ভাবতে থাকে সে। তার মা যেভাবে এ দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছে, একদিন সেও চলে যাবে। চিন্তার এক নতুন দিগন্ত যেন উন্মোচিত হয় তার সামনে। হালকা আপ্যায়ন শেষে বৈঠক সমাপ্ত হয়। একদিন বিকেলে মাইকিং হচ্ছে- ‘ভাইসব, ভাইসব, আগামীকাল বাদ মাগরিব করিমগঞ্জ মাঠে এক বিশাল ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। উক্ত মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিখ্যাত মোফাচ্ছিরে কুরআন আল্লামা মনোয়ার হোসাইন। আপনারা দলে দলে উক্ত মাহফিলে অংশ গ্রহণ করে দুজাহানের অশেষ নেকি হাসিল করুন।’ মাগরিবের সময় মসজিদে কালামের সাথে দেখা হয়। জাফরকে সে জানায়- আগামীকাল রহমতগঞ্জ থেকে একসাথে তারা ১০-১৫ জন মাহফিলে যাবে। কালাম জিজ্ঞাসা করলো সে যাবে কিনা? জাফর বলল- আব্বাকে জিজ্ঞাসা করে যাবো। কালাম বললো যদি যাও, তাহলে মাগরিবের নামাজ এখানে পড়বে। আমরা একসাথে যাবো। জাফর তার বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছে। পরদিন মাগরিবের সালাত আদায় করার পর দেখতো পেলো ১০-১৫ জন তার গ্রামেরই ছেলে আলম, সবুজ, হাসানও আছে। তারা প্রস্তুত মাহফিলে যেতে। করিমগঞ্জ রহমতগঞ্জ থেকে প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার দূরে। পায়ে হেঁটে এবং বাসে করে এক ঘণ্টার মধ্যে কলেজে মাঠের কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছাতেই তারা মাইকের আওয়াজ শোনতে পেলো। মাইকে ইতোমধ্যে ঘোষণা হচ্ছে, এখন আপনাদের মাঝে বক্তব্য নিয়ে আসছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাচ্ছেরে কুরআন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা মনোয়ার হোসাইন। সাথে সাথেই হাজার হাজার লোকের নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার ধ্বনি যেনো আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করছে। এতো মানুষ কখনো একসাথে দেখেনি জাফর। কখনো শোনেনি আল্লাহাকে ভালোবাসে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার এতো তেজোদীপ্ত শ্লোগান। অন্যরকম এক ভালো লাগলো তার। কিছুদিন আগে যে দুইজন ভাই তাদের বড় মসজিদে গিয়েছিলেন মেহমান হিসেবে তাদেরকেও সেখানে দেখলেন দায়িত্ব পালন করতে। বক্তার সুকণ্ঠ আর কোরআন হাদিস থেকে নবী-রাসূলদের ঘটনা, রাষ্ট্রীয় জীবনে নানা অনিয়ম, ইসলাম থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা যেনো মন্ত্রমুগ্ধের মতো নীরব হয়ে শোনছিল হাজার হাজার জনতা। কোনো মানুষ এতো সুরেলাভাবে কথা বলতে পারে, বক্তৃতা করতে পারে জানা ছিলো না তার। বক্তার আবেগপ্রবণ বক্তব্যের মাঝে শ্লোগানমুখর হয়ে ওঠে জনতা। কিন্তু এ রকম শ্লোগান আগে কখনও শোনেনি সে। মাহফিল শেষ হলে বাড়িতে ফিরলো জাফর। ভাবে, এখন থেকে এক ওয়াক্ত নামাজও কাজা করা যাবে না। কুরআন শিখতে হবে। একজন ভালো মানুষ হতে হবে। এভাবেই সময় গড়িয়ে চলে নদীর স্রতের মতো। জাফর ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার বার্ষিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে। বার্ষিক পরীক্ষার পর পরই বৃত্তি পরীক্ষা। এবার বৃত্তিটা তাকে পেতেই হবে। দেখতে দেখতে পরীক্ষাগুলোও শেষ হয়ে যায়। এখন অনেক অবসর।
একদিন জুমার নামাজের খুতবায় খতিব সাহেব বলেন- আমাদের প্রিয় নেতা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাচ্ছিরে কুরআন আল্লামা মনোয়ার হোসাইন সাহেবকে সরকার বেশ কিছুদিন আগে ষড়যন্ত্র¿মূলকভাবে মিথ্যা খুনের মামলায় আটক করেছে। আমরা বাদ জুমা তাঁর মুক্তির দাবিতে বড় রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল করবো। আপনারা শরিক থাকবেন। মিছিলে অনেক লোকের অংশগ্রহণ হয় এবং বড় সড়কে যাওয়ার পর পুলিশি বাধায় সেখানেই শেষ হয়। এক জুমার গভীর রাত। ভরা পূর্ণিমা। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
অনেক দূরের দৃশ্যও দেখা যায় আবছা আবছা। চারদিকে সুনসান নিস্তব্ধতা। দূরে এক বিরহিনী ডাহুকের ডাক ভেসে আসছে ক্ষীণলয়ে। হঠাৎ মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা আসলো আল্লামা মনোয়ার সাহেবের ছবি চাঁদে দেখা যাচ্ছে। আরও দূরের মসজিদের মাইকগুলো থেকেও একই ঘোষণা আসছিল বারবার। যখন এমন ঘোষণা আসছিল তখন গ্রামগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে এসেছে উঠানে, রাস্তায়। নারী, শিশু বৃদ্ধারাও বাদ নেই। সবাই একটা অস্পষ্ট দাড়ি টুপি ওয়ালা মানুষের ছায়া যেন দেখতে পেল চাঁদে। এতদিন যার ওয়াজ শুনে তারা চোখের পানি ঝরিয়েছে নিভৃতে, আজ তার আবছা অবয়ব যেন দেখা যাচ্ছে চাঁদে। আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলো জনতা। কেউ হাত তোলে মুনাজাত করছে আর চোখের পানি ফেলছে। সহসা এক যুবক নারায়ে তাকবির শ্লোগান ধরতেই হাজার হাজার মানুষ আল্লাহু আকবার বলে উঠলো। অজান্তেই অসংখ্য লোকের মিছিল এগিয়ে চললো সম্মুখ পানে।