সকাল থেকে রাত অব্দি একটানা বৃষ্টি হচ্ছে। সেই সাথে মাঝে মাঝে বজ্রপাত। বিদ্যুৎ নেই তাই মোম জ্বালিয়ে শেলী উপন্যাস লিখছে। খুব শীঘ্রই তার এ উপন্যাসটা প্রকাশিত হবে। ঔপন্যাসিক হিসেবে শেলী রোজালীন বেশ নাম করা। নির্জনতা শেলীর ভাল লাগে। তাই হেনরিভিলে একটা বাড়ি কিনেছে কয়েক মাস আগে। বাড়িটা অর্ধ পুরোনো। বাড়ির মালিক ছিলেন হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক জেন কারমাইকেল। বাড়িটার একটা ভুতুড়ে গুজব রয়েছে বলে কেউ কিনতে চায়নি। এ বাড়িতে রাতের বেলায় নাকি অর্গ্যানের সুর ভেসে আসে মাঝে মাঝে।
অনেকদিন বাড়িটা খালি পড়ে ছিল। পত্রিকায় বাড়ি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে শেলী একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। তখনই হেনরিভিলে এই বাড়িটার খোঁজ পেয়ে অতি অল্প দামে শেলী বাড়িটি কিনে নেয়। তার মনের মত জায়গায় বাড়িটা পেয়ে শেলী এ জন্য আনন্দিত , উৎফুল্ল। এ বাড়িতে বেশ কিছু পুরোনা আসবাবপত্রের সাথে একটা পুরোনো অর্গ্যান ছিল। জিনিসগুলো একটা আলাদা ঘরে রেখে শেলী নিজের জিনিসপত্র দিয়ে ঘর সাজিয়ে নিয়েছে।
অবিবাহিত শেলীর রান্নাবান্নার কাজ করে হাউজকিপার জুন মারিয়া। বেশ হাসি খুশি মহিলা। শেলী তাকে খুব পছন্দ করে। বৃষ্টির কারণে আজ আসতে পারেনি। তাই শেলীকে আজ খাবার কিনে খেতে হয়েছে। তার উপন্যাসটা প্রায় শেষের পথে। কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকাশককে দিয়ে দেবে।
শেলী এক মনে লিখে চলেছে। ওদিকে টেবিলে রাখা মোমটা গলে গলে প্রায় শেষ। কিন্তু সেদিকে শেলীর খেয়াল নেই। বসার ঘরে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে। দপ করে মোমটা নিভে গেলে শেলী চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে আর একটা মোম জ্বালিয়ে আনল। হঠাৎই সে খেয়াল করল তার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে। মোম হাতে নিয়ে রান্না ঘরের ফ্রিজ খুলে স্যান্ডউইচের প্যাকেট আর মিল্কশেক বের করল। টেলিফোনের শব্দ পেয়ে খাবারগুলো রান্না ঘরের টেবিলে রেখে নিজের ঘরে ফিরে এলো। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে জুনের কণ্ঠ ভেসে এলো। জুন বলল, ‘মিস শেলী আপনার কোন অসুবিধা হয়নিতো ? আসলে আমি বৃষ্টির কারণে আসতে পারিনি। লাইন খারাপ থাকায় ফোনও করতে পারিনি।` শেলী হেসে বলল , ‘না না আমার কোন অসুবিধা হয়নি। তুমি কোন চিন্তা কর না। কাল বৃষ্টি কমলে চলে এসো।` ‘আচ্ছা ঠিক আছে রাখি।` শেলী ফোন রেখে রান্না ঘরে এসে দেখল খাবারগুলো নেই। হঠাৎই পাশের ঘর থেকে দুপদাপ শব্দ ভেসে এল শেলীর কানে। শেলী রান্না ঘর থেকে ছুটে বের হল। শব্দ শেষ হতে না হতেই পুরোনো অর্গ্যানটা বেজে উঠল
মৃদুভাবে। ভীষণ ভয় পেল সে। পুরোনো অর্গ্যান কে বাজাতে পারে ভাবতে ভাবতে রুমের দিকে এগিয়ে গেল। আলতো করে দরজাটা খুলে উঁকি দিয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে। পুরোনা অর্গ্যানটা পড়ে রয়েছে অনড় হয়ে। দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ভাবল সবই তার মনের কল্পনা। ফিরে আসার জন্য পা বাড়াতে যাবে অমনি আবার অর্গ্যানটা বাজতে লাগল আগের চেয়ে কিছুটা জোরে। শেলী আবার দরজা খুলে উঁকি দিয়েই স্থির হয়ে গেল। ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তার শরীরে। দেখল বেশ মনোযোগ দিয়ে অর্গ্যান বাজাচ্ছে কালো আলখেল্লা পড়া কেউ একজন। শেলী কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি ? এখানে কেন ?` শেলীর কথায় আগন্তুক অর্গ্যান বাজানো বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে শেলীর দিকে আসতে লাগল। শেলী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আগন্তুকের চেহারা দেখেই তার গলা চিরে বেরোলো চিৎকার। হাত থেকে মোমটা পড়ে গিয়ে নিভে গেল। প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত হল কাছাকাছি কোথাও। সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকলো। সেই আলোয় দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোমশ শরীরের এক ভয়ঙ্কর জীব। মানুষের মত দুটি করে হাত পা থাকলেও মুখটা দেখতে একেবারে নেকড়ের মত। চোখ দুটো টকটকে লাল। দুটি বড় বড় দাঁত বেরিয়ে আছে ঠাঁটের বাইরে।
অজ্ঞান হয়ে গেল শেলী। অনেক পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে শেলী প্রাণপণে দৌড় দিল নিজের ঘরের দিকে। বসার ঘর দিয়ে যাওয়ার সময় সোফার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল সে। কোন রকমে উঠে আবার দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেল শেলী কিন্তু টেলিফোনের রিসিভার তুলতেই তার মুখ শুকিয়ে গেল। টেলিফোন ডেড। কিছুক্ষণ আগেই সে জুনের সাথে কথা বলেছে। বাইরে বৃষ্টির বদলে এখন ঝড় শুরু হয়েছে। ঝড়ের কারণে কোথাও হয়ত তার ছিড়ে গেছে। নেকড়েরূপী জীবটা দরজায় আঘাত করছে। শেলী দৌড়ে গিয়ে ড্রয়ার খুলে তার লাইসেন্স করা রিভলভারটা হাতে তুলে নিল। অদ্ভুত প্রাণীটা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে শেলী গুলি চালাল। প্রাণীটা লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। শেলী প্রাণপণে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের দরজার কাছে চলে গেল। কিন্তু দরজাটা খুলতে পারল না। ওদিকে অদ্ভুত প্রাণী উঠে দাঁড়িয়ে শেলীকে আবার ধরার জন্য ছুটে এলো। শেলী চিৎকার করলেও তার কান্না বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। প্রাণীটি বিকট শব্দ করতে করতে তার দিকে ধেয়ে আসছে দেখে ক্লান্ত বিধ্বস্ত শেলী দৌড়ে জানালা খুলতে চেষ্টা করল। কিন্তু খুলতে পারল না। পাশে রাখা একটা চেয়ার নিয়ে জানালার কাঁচে আঘাত করল। কাঁচ ভাঙার পর কোন রকমে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। জ্ঞানশূণ্য হয়ে এই নির্জন জায়গায় শেলী ছুটতে লাগল প্রাণপণে। কাদায় হোচট খেয়ে পড়ে গেল বার কয়েক। প্রাণীটাও ছুটে চলেছে তার দিকে।
শেলীও প্রচন্ড বেগে দৌড়াতে লাগল। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল রাস্তার পাশের ছোট্ট একটা খাদে। কোন রকমে উঠে দেখল প্রাণীটা নেই। বৃষ্টির মধ্যে যতদূর চোখ যায় তাকিয়ে দেখল প্রাণীর কোন চিহ্নই নেই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধপ করে বসে পড়ল রাস্তার পাশে। শহরটাতে বাড়িঘরের ঘনত্ব কম। দূরে একটা খামার বাড়ি চোখে পড়ল তার। ক্ষণিকের জন্য সে বাড়িটা দেখলো বজ্রপাতের আলোয়। শেলী বাড়িটার দিকে দৌড়াতে লাগল। হঠাৎ রাস্তায় দেখতে পেল হেড লাইট জ্বেলে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে একটা গাড়ি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শেলী বাঁচার আনন্দে গাড়িটা কাছে আসতেই সে চিৎকার করে থামতে বলল। সাহায্য প্রার্থনা শুনে গাড়ির ড্রাইভারের সহানুভুতি হল। তাড়াতাড়ি শেলী বলল, ‘আমাকে বাঁচান একটা ভুত আমাকে তাড়া করেছে। যে কোন সময় সে চলে আসতে পারে।` ড্রাইভার কোন কথা বলল না। শেলী তার চেহারা দেখতে পেল না। কারণ লম্বা একটা হ্যাটের কোণা দিয়ে সে মুখ ঢেকে রেখেছে। তুমুল বৃষ্টি শুরু হতে লাগল।
সেই সাথে ঘন ঘন হতে লাগল বজ্রপাত। শেলী আবার করজোরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, `প্লিজ আমাকে বাঁচান।` লোকটা হ্যাট খুলে ফেলল। শেলী অন্ধকারে লোকটার মুখ দেখতে পেল না। লোকটা বলল, `এত তাড়া কিসের ?` শেলী আবার কেঁদে বলল, `আমাকে একটা ভুত তাড়া করেছে।` লোকটা খনখনে হাসি দিয়ে বলল, `তাই নাকি !’ শেলী চমকে উঠল। লোকটার মুখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল গাড়ির ড্রাইভার আর কেউ নয় স্বয়ং সেই অদ্ভুত প্রাণী। কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে শেলী উল্টো দিকে দৌড়াতে লাগল। ভুতটাও গাড়ি নিয়ে তার পেছনে ধাওয়া করল। এক সময় গাড়ির ধাক্কায় শেলী উল্টে পড়ে গেল রাস্তার উপর। ভুতটা বাইরে বেরিয়ে শেলীর দূরবস্থা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। শেলী ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে বলল, `তুমি কেন আমাকে মারতে এসেছ ?` বিকট কণ্ঠে ভুতটা বলল, `আমি এই বাড়িতে কাউকে থাকতে দেব না।` কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে গাড়িতে উঠে ভুতটা শেলীর গায়ের উপর দিয়ে চালিয়ে দিল। তারপর হাসতে হাসতে অদৃশ্য হয়ে গেল বাতাসের মধ্যে। পড়ে রইল শেলী রোজালীনের রক্তাক্ত বিকৃত লাশ।
"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।