
বিন্দু চন্দর অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ# ফুলকপি, বাঁধাকপি, রসুন ও পিঁয়াজ নিয়ে গাঁয়ের বিশ্বস্ত এক লোকের সাথে সকালে কোদাইকানালের বাজারে এসেছিল বেনু। বিরাট বাজার। মানুষের প্রচন্ড ভিড়। টাটকা ও ভালো হওয়ার কারণে তাদের জিনিসগুলো তাড়াতাড়িই বিক্রি হয়ে যায়। তারপরও দেখা যায় যে প্রায় বিকাল হয়ে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরে তারা। পথে বেনু তার বাঁশিতে সুর তোলে। বাঁশি বাজাতে খুব ভালো লাগে তার। যেখানেই যায়, তার সাথে বাঁশি থাকে। তার বাঁশির মধুর সুর শুনে সবাই মুগ্ধ হয়।
বেনুদের বাড়ি ভিলপট্টি গ্রামে। ঘরে ঢুকে অসুস্থ বাবাকে শুয়ে থাকতে দেখতে পেল বেনু। একটা টুল টেনে নিয়ে বিছানায় বাবার একেবারে কাছে গিয়ে বসে সে। বলে : বাবা, তুমি ভাত বেশি করে খেও। মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সারা দিন কিছু খাওনি তুমি। ডাক্তার বলেছেন তুমি যেন নিয়মিত ভাবে খাওয়া-দাওয়া কর যাতে শরীরে বল পাও। বাবা স্নেহের চোখে ছেলের দিকে তাকায়। বলে- : বাবারে, ডাক্তার তো কত কিছুই বলে। সত্যি কথা হল, আমার শরীরটা কিছুতেই ভালো হচ্ছে না। আমি বছরের পর বছর যদি ঐ খনিটায় কাজ না করতাম তাহলে আমার শরীর এত খারাপ হতো না। বেচারা সহুল কি কঠোর খাটুনিই না খাটত। কিন্তু সে যখন মারা গেল, তার স্ত্রী কোনো ক্ষতিপূরণই পেল না।
কোম্পানি তার জন্য কিছুই করেনি। আমারও ভারি দুশ্চিন্তা হয় যে কোম্পানি আমাকেও হয়ত কিছুই দেবে না। দুশ্চিন্তা থাকলে শরীর কি করে ভালো হবে, বল্? বাবা তার অসুস্থতা নিয়ে কথা বললে বেনুর খারাপ লাগে। তাই সে বলে- : ওসব কথা থাক বাবা। শুনলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। বাবা বলে- : আমিও তোকে খুব ভালোবাসি বাবা! ভাবি, তোর তো এখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমি চাই তুই অন্য কোথাও চলে যা। এখানে থাকলে খনিতে কাজ করে তোর জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। আমি কখনোই তা চাই না।
বেনু বলে- : কিন্তু আমি এখান থেকে আর কোথাও যেতে চাই না বাবা। এখানে অরণ্য আছে, অনেক বন্ধু আছে আমার। আবেগে কেঁদে ফেলে বেনু। কিন্তু বেনুর বাবার মন নরম হয় না। অসুস্থতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও কঠিন গলায় বলে- : এ নিয়ে আমরা কতবার কথা বলেছি, তোর মনে আছে? খনিতে কাজ করার সময় পারদ দূষণই আমার এ অসুস্থতার কারণ। এ থেকে আমার সহকর্মী শ্রমিকরাও রেহাই পায়নি। কোম্পানির মালিকদের কোনো লজ্জা-শরম নেই। তারা আমাদের দেশে আসে, জমি কেনে ও টাকার জন্য সুন্দর প্রকৃতিকে ধ্বংস করে। অরণ্যের ভেতর যে সুন্দর সুন্দর গাছ ও জীব-জন্তু থাকে সেগুলোর জন্য তাদের বিন্দুমাত্র ভালোবাসা নেই। : কিন্তু আমার আছে- বলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায় বেনু। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে। তার বাবা অবাক হয় না। জানে বেনু কোথায় যেতে পারে। সে এখন যাবে অরণ্যের গভীরে।
২. ছোটবেলা থেকেই অরণ্য বেনুর খুব প্রিয়। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই গাছপালা ভালোবাসে সে। অরণ্যে এলে মন খুশি হয়ে ওঠে তার। কোনো চিন্তাভাবনা থাকে না, নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। তার মনে হয় , অরণ্যের গাছপালাও ভালোবাসে তাকে। এখানে এলে নিজেকে স্বাধীন মনে হয়। আর কোনোখানে গিয়ে এত ভালো লাগে না তার। আরো কথা, অরণ্যে এসে প্রাণ ভরে বাঁশি বাজাতে পারে সে। আদিম অরণ্য আর তার বাঁশির সুর যেন একাকার হয়ে যায়। অরণ্যের গভীরে নীল ও বেগুনি নীল রঙের কুরিঞ্জি ফুল ফুটেছে। কী সুন্দর! বিরাট সাইপ্রেস, ইউক্যালিপটাস ও একাশিয়া গাছের ফাঁকে ফাঁকে এখানে সেখানে ফুলের অপূর্ব বর্ণিল শোভা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় বেনু। অরণ্যের নানা ধরনের ফল বেনুর জন্য যেন প্রকৃতির চমৎকার উপহার। এখানে এলে সে প্রয়োজন মত কোনো ফল গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে খায়। একটি গাছে পিচফল দেখে খেতে ইচ্ছে করায় কিছু ফল পেড়ে আনে। বেশ পাকা, সুপুষ্ট ও রসালো। চমৎকার স্বাদ। একটার পর একটা খেতে থাকে সে। তার গালের দু’পাশ বেয়ে রসের ধারা গড়িয়ে পড়ে।
এ সামান্যতেই যে বেনু কি খুশি! পিচফল খেতে খেতে সে চারদিকে তাকায়। মাথার উপরে তরুণ নীলগিরি বানরগুলো একে অপরকে গাছের এ ডাল থেকে ও ডালে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। এ সময় নীল আকাশ থেকে লাল পালক বুলবুলের একটি ঝাঁক তার কাছাকাছি উড়ে আসে। তখনি লায়লাকে দেখতে পায় বেনু। মেয়ে হাতি শাবকের এ নাম সেই দিয়েছে। লায়লার জন্ম গত বছর। বেনুর বন্ধু হয়ে গেছে সে। বেনু লায়লার কাছে গিয়ে বাকি পিচফলগুলো তার মুখে তুলে দিলে লায়লা সেগুলো একবারেই খেয়ে নেয়। তারপর বেনু তার দিকে চেয়ে দুঃখ ভরা গলায় বলতে থাকে- : জানিস, লায়লা, আমার বাবা চায় যে এই ভিলপট্টি, এই অরণ্য ছেড়ে আমি চলে যাই। কিন্তু আমি এখানেই থাকতে চাই। এটা আমার জন্মভূমি, আমার প্রিয় জায়গা। কথাগুলো বলে বেনু কেঁদে ফেলে। লায়লা বলে- : জানো বেনু, এ অরণ্যের প্রান্তে যে জলাশয় আছে সেখানে কারখানার পারদ ফেলা হয়েছিল। সেই পানি পান করে আমার বাবা-মা মারা যায়। এ জায়গাটি আর বসবাসের জন্য নিরাপদ নয়। তারা আমাদের সুন্দর বনভূমিকে দূষিত ও নষ্ট করে ফেলছে। তাদের এ সর্বনাশা কর্মকান্ড বন্ধ হচ্ছে না। তাই তোমার এখান থেকে অবশ্যই চলে যাওয়া উচিত। আমি চাই না তুমি অসুস্থ হয়ে পড়।
তুমি নতুন জায়গায় গিয়ে সেখানকার লোকদের বলো আমাদের অরণ্যে কি ঘটেছে। তাদের বলো যে অরণ্য তাদের সাহায্য চায়। তাদের বলো যে কারখানা ও খনিগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। লায়লার কথা শুনে চোখের পানি মুছে ফেলে বেনু। বলে- : ঠিক বলেছ লায়লা। আমি ঠিক তাই করব। আমি লোকদের জানাব যে এখানে কি ঘটছে। বেলাশেষে সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছিল। দু’ বন্ধু অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসে রইল নীরবে। তাদের প্রিয় অরণ্যের বিচিত্র শব্দ তারা শুনতে থাকল আর দেখতে থাকল তার অপূর্ব শোভা আর রঙের বৈচিত্র্য। অবশেষে উঠে দাঁড়ায় বেনু। যদিও এখানে থাকতে তার খুবই ভালো লাগছিল কিন্তু এখন বাড়ি যেতে হবে। লায়লাকে বলে- : সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না। মা-বাবা হয়ত আমার জন্য চিন্তা করছে। আমি বাড়ি যাচ্ছি। লায়লা বলে – : ঠিক আছে। তুমি বাড়ি যাও। নিজের দিকে খেয়াল রেখ। আর হ্যাঁ, আমাকে পিচফল খেতে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। : আমার বন্ধু হওয়ার জন্য তোমাকেও ধন্যবাদ। ৩. বাড়ি পৌঁছে যায় বেনু। ততক্ষণে আকাশে সন্ধ্যাতারা উঠে এসেছিল। আর কোনো তারাই তার মত উজ্জ্বল নয়। রুপোলি-সাদা রঙের আলো ছড়িয়ে চলেছে তারাটি। বেনু মুগ্ধ চোখে সন্ধ্যাতারার দিকে চেয়ে থাকে।
হঠাৎ বাবার ডাকে তার ঘোর কেটে যায়- : বেনু, কোথায় রে তুই? আমার কাছে একটু আয়। বাবার কাছে ছুটে যায় বেনু। তাকে জড়িয়ে ধরে। বাবার মন খুশিতে ভরে ওঠে। বেনুর মত একটি ছেলে পাওয়ায় স্রেষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ স্নহ মাখা স্বরে ছেলেকে বলে- : শোন, আমি আর তোর মা অনেক ভেবে দেখলাম। তোর এখান থেকে চলে যাওয়া আমরাও চাই না। আমরা শুধু তোর ভালো চাই। লন্ডনে আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন। এ গাঁয়েরই মানুষ। অত্যন্ত উদার হৃদয়। তিনি তার বাড়িতে তোকে রাখবেন ও সেখানে স্কুলে পড়ার সব খরচ বহন করবেন। আগামী সপ্তাহেই তোকে যেতে হবে। আমি খুবই দুঃখিত যে কাজ করতে পারি না। তাই তোকে আমাদের কাছে রেখে ভালোভাবে মানুষ করে তোলার ক্ষমতা আমার নেই। মন শক্ত করে ফেলেছিল বেনু। তবু তার চোখ পানিতে ভরে ওঠে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে- : ঠিক আছে বাবা! তোমরা আমাকে ভালোবাস। আমার যাতে ভালো হয় সেটাই তো তোমরা চাও। তাই আমি লন্ডনে যাবো। যাবার দিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ বসে রইল বেনু। সে জানে না বাবাকে আবার কবে দেখতে পাবে সে। যেখানে সে যাবে সে লন্ডন বা ব্রিটেন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে মনের মধ্যে একটু আশা জাগে তার।
একদিন সে ফিরে আসবে, এ অরণ্য, উঁচু বৃক্ষরাজি, গাছে গাছে হুটোপুটি করা বানরদের আবার দেখতে পাবে। লায়লার সাথে বসে আবার অরণ্যের অটুট নীরবতা উপভোগ করবে আর কুঞ্জিরি ফুলের শোভা দেখবে। মা-বাবাকে ছেড়ে যেতে বড় কষ্ট হচ্ছিল বেনুর। কিন্তু কারখানা ও খনি বন্ধ করতে হবে, অরণ্যকে ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। তাই মন শক্ত করে ফেলে সে। তারপর আরো অনেকের সাথে চড়ে বসে বিমানে। ৪. লন্ডন বিমানবন্দরে তাকে নিতে এসেছিলেন বাবু চাচা। তাকে দেখে ভালো লেগে গেল বেনুর। বিরাট দেহের মানুষ তিনি। ভীষণ দিলখোলা। তার ঠোঁটে গান লেগেই থাকে। চমৎকার সুরেলা গলা। বাড়িতে গিয়েই খাবার তৈরি করতে লেগে গেলেন তিনি। লন্ডনে বেনুর প্রথম দিন। কয়েক রকম দেশী খাবার করলেন তিনি বেনুর জন্য যাতে সে বাড়ির খাবারের স্বাদ পেতে পারে। সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। রেকর্ড প্লেয়ারে বেজে যাচ্ছিল তামিল গান।
বসার ঘরে তারা দু’জন। বাবু চাচা বেনুর কথা শুনছিলেন। প্রথম সুযোগেই সে বলে চলেছিল তাদের অরণ্যের কথা। কিভাবে খনি ও কারখানার কারণে তা বিনষ্ট হচ্ছে, পারদের দূষণের ফলে মানুষ ও অরণ্যের প্রাণীদের কিভাবে করুণ মৃত্যু ঘটছে, ধীরে ধীরে আদিম অরণ্য তার সম্পদ ও সৌন্দর্য হারাচ্ছে। বাবু চাচা ভিলপট্টি গ্রামেরই মানুষ। ঐ অরণ্য তার খুবই চেনা এবং প্রিয়। তিনি বেনুর কাছে সব কথা শুনে ভীষণ দুঃখিত হলেন। আফসোস করে বললেন, আমাদের এত সুন্দর অরণ্যটি এভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে! এর প্রতিবাদ করার কেউ নেই? বেনু বলে- : আমাদের ওখানে কী ঘটছে তা আমি সবাইকে জানাতে চাই যাতে তারা আমাদের সাহায্য করে। কিন্তু আমার তো কোনো ক্ষমতা নেই। আমি শুধু পারি বাঁশি বাজাতে। এ দিয়ে কিছু করা যাবে কিনা তা জানি না।
ডিনারের পর নীরবে বসে থাকেন দু’জন। তামিল গান বেজেই চলেছিল। বাবু চাচা গভীর চিন্তার মধ্যে ডুবে যান। কিছুক্ষণ পর লাফিয়ে ওঠেন তিনি। চিৎকার বলেন- : পেয়েছি, পেয়েছি। অবাক হয়ে বেনু জিজ্ঞেস করে- : কী পেয়েছেন ? : আমরা অরণ্যে ওপর একটি গান তৈরি করব, তারপর সেটা ইন্টারনেটে ছেড়ে দেব। তারপর কারখানা ও দূষণ বন্ধের একটি আবেদন নিয়ে আমরা সবার কাছে যাবো ও তাতে তাদের স্বাক্ষর নেবো। বেনু বলে- : কিন্তু আপনি ইন্টারনেটে গান ছাড়বেন কিভাবে? আমি তো এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। : এটা খুবই সহজ-বলেন বাবু চাচা-তোমার প্রতিভা আছে। তুমি যে খুব সুন্দর বাঁশি বাজাও তা তোমার বাবা আমাকে বহুবার বলেছে। আর আমি…..হ্যাঁ, আমার জানা আছে প্রযুক্তি। কাজটা করতে আমার ভালোই লাগবে বলে মনে হচ্ছে। আমরা একটা তাংলিশ গান তৈরি করব। বেশ মজার ব্যাপার হবে দেখো। : তাংলিশ? সে আবার কী? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বেনু। : বুঝলেন? এটা হল তামিল আর ইংলিশের আধাআধি নাম। চমৎকার না? যেন গোপন চাবি খুঁজে পাবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন বিরাট দেহের মানুষটি। বেনুর দিকে তাকিয়ে বলেন-চল, কাজটা শুরু করা যাক। ভালো একটা ডিনার হয়েছে আমাদের, আমার মনটাও ভালো আছে। কাজ করার সব জিনিসপত্রই আমার কাছে আছে। আচ্ছা, তুমি কি তোমার বাঁশিটি সাথে এনেছ?
বাবু চাচার কথায় খুব উৎসাহিত হয়ে ওঠে বেনু। আবার কিছুটা নার্ভাস বোধ করে। কারণ রেকর্ড করা সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। বলে- : বাঁশি সব সময় আমার সাথেই থাকে। তবে কিভাবে রেকর্ড করতে হয় তা আমি জানি না। এটা ইন্টারনেটে ছাড়া হলে অসংখ্য মানুষ তা শুনবে। : ঠিক বলেছ, মাই বয়। তবে তুমি শুধু বাঁশিই বাজাতে যাচ্ছ না-এক দুষ্টুমি ভরা হাসি তার মুখে- আমরা দু’জন মিলে গানও গাইব। আমরা গাইব সুন্দর অরণ্য ও কারখানাগুলো কিভাবে আমাদের জমি গ্রাস করছে-সে বিষয়ে। চল, কাজ শুরু করি। গান লেখার কাজ শুরু হয়। বেনু অরণ্য, তার অপরূপ সৌন্দর্য ও সম্পদের কথা যা বলতে চায় গানে তা থাকতে হবে। বেনু মানুষকে আরো বলতে চায় কারখানা তার প্রিয় অরণ্যের কি ক্ষতি করছে এবং কেন তা বন্ধ করতে হবে। কারো চোখে ঘুম ছিল না। সারারাত ধরে কাজ করে তারা। গান লেখা হলো, সুর করা হলো, রেকর্ড করা হলো।
তারপর তার সাথে মিশল বেনুর বাঁশির সুর। বাবু চাচা তার কম্পিউটারের মাধ্যমে নানা রকম শব্দ ও মিউজিকের সংমিশ্রণ ঘটালেন। ভোর হয়ে আসে। তাদের কাজ শেষ হয়। ভীষণ ক্লান্ত বেনু কোনো মতে শরীরটাকে টেনে নিয়ে বিছানায় ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। ৫. পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কিচেনে হাজির হয় বেনু। : শুভ সকাল- আমুদে গলায় বেনুকে শুভেচ্ছা জানান বাবু চাচা-তা ভালো ঘুম হয়েছে তো! বেনু হাত-মুখ ধুয়ে এসে টেবিলে বসে। বাবু চাচা নাশতা হিসেবে পরোটা ও প্রচুর মিষ্টি দিয়ে সেমাই তৈরি করে টেবিলে রাখেন। বেনুর উদ্দেশ্যে বলেন- : তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। বেনুর চোখ থেকে তখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। তবু জিজ্ঞেস করে- : সেটা কি? : রাতে গানের কাজ শেষ হওয়ার পর আমি তা ইন্টারনেটে আপলোড করি। আসলে আমার আর দেরি সইছিল না। এজন্য তুমি রাগ করলে না তো! : না না, রাগ করব কেন?
কাজ শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া গানটাতো দু’জনেরই। : বা বা! খুশি চেপে রাখতে পারলেন না বাবু চাচা- তুমি ভাবতে পার কি ঘটেছে? এ পর্যন্ত তিরিশ লাখ মানুষ গানটি শুনেছে। : বলেন কি! বেনুর মুখভর্তি পরোটা। : হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য ব্যাপারই বটে। আমাদের আবেদনের কথা জানতে চেয়ে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে ইমেইল আসছে। একটি পরিবেশবাদী চ্যারিটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোমার সাথে কথা বলতে চায়। তারা আমাদের অরণ্যের যাতে আর ক্ষতি না হয় সে জন্য পারদ দূষণ বন্ধ করতে চায়। তারা বলছে সে ক্ষমতা তাদের আছে। আশ্চর্য না? নিজের কানে এ সব কথা শোনার পরও বেনুর বিশ্বাস হচ্ছিল না। উত্তেজিত হয়ে সে বলে- : চলুন আমরা এখুনি তাদের সাথে কথা বলি। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। বাবু চাচাকে জড়িয়ে ধরে বলে-এ সবই আপনার জন্য হয়েছে। আপনি না হলে কিছুই হতো না। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তিনি বলেন- : তোমার জন্য এবং তোমার মত আর সব ছেলেমেয়ের কথা মনে করেই আমি এটা করেছি যাতে তারা অরণ্যের দান সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। প্রকৃতির এ আশীর্বাদ ধ্বংস করার অধিকার কোনো কোম্পানির নেই। চল, আমাদের সাহায্য করতে আগ্রহী পরিবেশবাদী চ্যারিটিকে ফোন করি। বাবু চাচা ফোন করতে সে মানুষটিকে পেয়ে যান। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর বেনুর হাতে ফোন ধরিয়ে দেন। বেনু তাদের অরণ্য, খনি, কারখানা, পারদ দূষণ, লায়লার কথা বলে তাকে। লোকটি বলেন যে ইন্টারনেটে তাদের গানটি শুনে তিনি ভীষণ অভিভূত হয়েছেন। তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ করতে, নতুন কারখানা নির্মাণ করতে যাতে না পারে সে জন্য চেষ্টা করতে হবে। কাজটা সহজ নয়। তবে শেষ পর্যন্ত এতে সাফল্য আসবেই-এ কথা জোর দিয়ে বললেন তিনি। তাছাড়া, খনি কোম্পানি ও কারখানার কাছ থেকে শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণও আদায় করা সম্ভব হবে। এখন থেকেই তিনি জোরেশোরে কাজ শুরু করবেন বলে জানান। ফোন ছাড়ার পর খুশিতে ভরে ওঠে বেনুর মন।
এত তাড়াতাড়ি এমন সাফল্যের কথা ভাবতেও পারেনি সে। বাবু চাচা ছাড়া কিছুই হতো না। তাকে সাথে নিয়েই এখন এগোতে হবে। ভিলপট্টির অরণ্যের ছবি বেনুর চোখে ভাসে। বেনু মনে মনে শপথ করে- যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে নিজের গাঁয়ে ফিরে যাবে। * গল্পটি ইংরেজিতে ‘দি গিফট অব দি ফরেস্ট’ নামে প্রকাশিত