গল্পের ১১ম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আমি নিশ্বাস ফেলে বললুম, বোধ হয় আজকের দিনে কারও হাতেই নেই। আমিও শিশু ছিলুম, তার একমাত্র সাক্ষী আছে ঐ আকাশের তারা। আমার কথা ছেড়ে দাও, আমি তোমার একদিনকার ছেলেমানুষির কথা বলব। তোমার ভালো লাগবে কি না জানি নে, আমার মিষ্টি লাগবে।
আচ্ছা, বলে যাও।
বোধ হচ্ছে, ফাল্গুন মাস পড়েছে। তার আগেই ক’দিন ধরে রামায়ণের গল্প শুনেছিলে সেই চিক্চিকে – টাক – ওয়ালা কিশোরী চট্টোর কাছে। আমি সকাল বেলায় চা খেতে খবরের কাগজ পড়ছি, তুমি এতখানি চোখ করে এসে উপস্থিত। আমি বললেম, হয়েছে কী।
হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, আমাকে হরণ করে নিয়েছে।
কী সর্বনাশ। কে এমন কাজ করলে।
এ প্রশ্নের উত্তরটা তখনো, তোমার মাথায় তৈরি হয় নি। বলতে পারতে রাবণ, কিন্তু কথাটা সত্য হত না বলে তোমার সংকোচ ছিল। কেননা, আগের সন্ধেবেলাতেই রাবণ যুদ্ধে মারা গিয়েছে, তার একটা মুণ্ডুও বাকি ছিল না। উপায় না দেখে একটু থম্কে গিয়ে তুমি বললে, সে আমাকে বলতে বারণ করেছে।
তবেই তো বিপদ বাধালে। তোমাকে এখন উদ্ধার করা যায় কী করে। কোন্ দিক দিয়ে নিয়ে গেল।
সে একটা নতুন দেশ।
খান্দেশ নয় তো?
না।
বুন্দেলখণ্ড নয়?
না।
কী রকমের দেশ।
নদী আছে, পাহাড় আছে, বড়ো বড়ো গাছ আছে। খানিকটা আলো, খানিকটা অন্ধকার।
সে তো অনেক দেশেই আছে। রাক্ষস গোছের কিছু দেখতে পেয়েছিলে? জিব – বের – করা কাঁটাওয়ালা?
হাঁ হাঁ, সে একবার জিব মেলেই কোথায় মিলিয়ে গেল।
বড়ো তো ফাঁকি দিলে, নইলে ধরতুম তার ঝুঁটি। যাই হোক, একটা কিছুতে করে তো তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল। রথে?
না।
ঘোড়ায়?
না।
হাতিতে?
ফস করে বলে ফেললে, খরগোশে। ঐ জন্তুটার কথা খুব মনে জাগছে ; জন্মদিনে পেয়েছিলে একজোড়া বাবার কাছ থেকে।
আমি বললেম, তবেই তো চোর কে তা জানা গেল।
টিপিটিপি হেসে তুমি বললে, কে বলো তো।
এ নিঃসন্দেহে চাঁদামামার কাজ।
কী করে জানলে।
তারও যে অনেক কালের বাতিক খরগোশ পোষা।
কোথায় পেয়েছিল খরগোশ।
তোমার বাবা দেয় নি।
তবে কে দিয়েছিল।
ও চুরি করেছিল ব্রহ্মার চিড়িয়াখানায় ঢুকে।
ছিঃ।
ছিঃই তো। তাই ওর গায়ে কলঙ্ক লেগেছে, দাগা দিয়েছেন ব্রহ্মা।
বেশ হয়েছে।
কিন্তু শিক্ষা হল কই। আবার তো তোমাকে চুরি করলে। বোধ হয় তোমার হাত দিয়ে ওর খরগোশকে ফুলকপির পাতা খাওয়াবে।
খুশি হলে শুনে। আমার বুদ্ধির পরখ করবার জন্যে বললে, আচ্ছা, বলো দেখি, খরগোশ কী করে আমাকে পিঠে করে নিলে।
নিশ্চয় তুমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলে।
ঘুমলে কি মানুষ হাল্কা হয়ে যায়।
হয় বৈকি। তুমি ঘুমিয়ে কখনো ওড় নি?
হাঁ, উড়েছি তো।
তবে আর শক্তটা কী। খরগোশ তো সহজ, ইচ্ছে করলে কোলা ব্যাঙের পিঠে চড়িয়ে তোমাকে মাঠময় ব্যাঙ – দৌড় করিয়ে বেড়াতে পারত।
ব্যাঙ। ছি ছি ছি ! শুনলেও গা কেমন করে।
না, ভয় নেই — ব্যাঙের উৎপাত নেই চাঁদের দেশে। একটা কথা জিগেস করি, পথের ব্যাঙ্গমাদাদার সঙ্গে তোমার দেখা হয় নি কি।
হাঁ, হয়েছিল বই কি।
কিরকম।
ঝাউগাছের উপর থেকে নীচে এসে খাড়া হয়ে দাঁড়ালো। বললে, পুপেদিদিকে কে চুরি করে নিয়ে যায়। শুনে খরগোশ এমন দৌড় দৌড়ল যে ব্যাঙ্গমাদাদা পারল না তাকে ধরতে। — আচ্ছা, তার পরে?
কার পরে।
খরগোশ তো নিয়ে গেল, তার পরে কী হল বলো – না।
আমি কী বলব। তোমাকেই তো বলতে হবে।
বাঃ, আমি তো ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, কেমন করে জানব।
সেই তো মুশকিল হয়েছে। ঠিকানাই পাচ্ছি নে কোথায় তোমাকে নিয়ে গেল। উদ্ধার করতে যাই কোন্ রাস্তায়। একটা কথা জিগেস করি, যখন রাস্তা দিয়ে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছিলে কি।
হাঁ হাঁ, পাচ্ছিলুম ঢঙ ঢঙ ঢঙ।
তা হলে রাস্তাটা সোজা গেছে ঘণ্টাকর্ণদের পাড়া দিয়ে।
ঘণ্টাকর্ণ ! তারা কিরকম।
তাদের দুটো কান দুটো ঘণ্টা। আর, দুটো লেজে দুটো হাতুড়ি। লেজের ঝাপটা দিয়ে একবার এ কানে বাজায় ঢঙ, একবার ও কানে বাজায় ঢঙ। দু জাতের ঘণ্টাকর্ণ আছে, একটা আছে হিংস্র, কাঁসরের মতো খন্খন্ আওয়াজ দেয় ; আর একটার গম্গম্ গম্ভীর শব্দ।
তুমি কখনো তার শব্দ শুনতে পাও, দাদামশায়?
পাই বৈকি। এই কাল রাত্তিরেই বই পড়তে পড়তে হঠাৎ শুনলেম ঘণ্টাকর্ণ চলেছেন ঘোর অন্ধকারের ভিতর দিয়ে। বারোটা বাজালেন যখন তখন আর থাকতে পারলুম না। তাড়াতাড়ি বই ফেলে দিয়ে চমকে উঠে দৌড় দিলুম বিছানায়, বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে চোখ বুজে রইলুম পড়ে।
খরগোশের সঙ্গে ঘণ্টাকর্ণের ভাব আছে?
খুব ভাব। খরগোশটা তারই আওয়াজের দিকে কান পেতে চলতে থাকে সপ্তর্ষিপাড়ার ছায়াপথ দিয়ে।
তার পরে?
তার পরে যখন একটা বাজে, দুটো বাজে, তিনটে বাজে, চারটে বাজে, পাঁচটা বাজে, তখন রাস্তা শেষ হয়ে যায়।
তার পরে?
তার পরে পৌঁছয় তন্দ্রা – তেপান্তরের ও পারে আলোর দেশে। আর দেখা যায় না।
আমি কি পৌঁচেছি সেই দেশে।
নিশ্চয় পৌঁচেছ।
এখন তা হলে আমি খরগোশের পিঠে নেই?
থাকলে যে তার পিঠ ভেঙে যেত।
ওঃ, ভুলে গেছি, এখন যে আমি ভারী হয়েছি। তার পরে?
তার পরে তোমাকে উদ্ধার করা চাই তো।
নিশ্চয় চাই। কেমন করে করবে।
সেই কথাটাই তো ভাবছি। রাজপুত্তুরের শরণ নিতে হল দেখছি।
কোথায় পাবে।
ঐ – যে তোমাদের সুকুমার।
শুনে এক মুহূর্তে তোমার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। একটু কঠিন সুরেই বললে, তুমি তাকে খুব ভালোবাস। তোমার কাছে সে পড়া বলে নিতে আসে। তাই তো সে আমাকে অঙ্কে এগিয়ে যায়।
এগিয়ে যাবার অন্য স্বাভাবিক কারণও আছে। সে কথাটার আলোচনা করলুম না। বললুম, তা, তাকে ভালোবাসি আর না বাসি, সেই আছে এক রাজপুত্তুর।
কেমন করে জানলে।
আমার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তবে সে ঐ পদটা পাকা করে নিয়েছে।
তুমি বেশ একটু ভুরু কুঁচকে বললে, তোমারই সঙ্গে ওর যত বোঝাপড়া !
কী করি বলো, কোনোমতে ও মানতে চায় না — ওর চেয়ে আমি বয়সে খুব বেশি বড়ো।
ওকে তুমি বল রাজপুত্তুর ! ওকে আমি জটায়ুপাখি বলেও মনে করি নে। ভারি তো !
একটু শান্ত হও, এখন ঘোর বিপদে পড়া গেছে ! তুমি কোথায় তার তো ঠিকানাই নেই। তা এবারকার মতো কাজ উদ্ধার করে দিক, আমরা নিশ্বেস ফেলে বাঁচি। এর পরে ওকে সেতুবন্ধনের কাঠবিড়ালি বানিয়ে দেব।
উদ্ধার করতে ও রাজি হবে কেন। ওর একজামিনের পড়া আছে।
রাজি হবার বারো – আনা আশা আছে। এই পরশু শনিবারে ওদের ওখানে গিয়েছিলুম। বেলা তিনটে। সেই রোদ্দুরে মাকে ফাঁকি দিয়ে ও দেখি ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির ছাদে। আমি বললুম, ব্যাপার কী।
ঝাঁকানি দিয়ে মাথাটা উপরে তুলে বললে, আমি রাজপুত্তুর।
তলোয়ার কোথায়।
দেয়ালির রাত্রে ওদের ছাদে আধপোড়া তুবড়িবাজির একটা কাঠি পড়েছিল, কোমরে সেইটেকে ফিতে দিয়ে বেঁধেছে ! আমাকে দেখিয়ে দিলে।
আমি বললুম, তলোয়ার বটে। কিন্তু, ঘোড়া চাই তো?
বললে, আস্তাবলে আছে।
বলে ছাদের কোণ থেকে ওর জ্যাঠামশায়ের বহুকেলে বেহায়া একটা ছেঁড়া ছাতা টেনে নিয়ে এল। দুই পায়ের মধ্যে তাকে চেপে ধরে হ্যাট্হ্যাট্ আওয়াজ করতে করতে ছাদময় একবার দৌড় করিয়ে আনলে। আমি বললুম, ঘোড়া বটে !
এর পক্ষীরাজের চেহারা দেখতে চাও?
চাই বৈকি।
ছাতাটা ফস্ করে খুলে দিলে। ছাতার পেটের মধ্যে ঘোড়ার খাবার দানা ছিল, সেগুলো ছড়িয়ে পড়ল ছাদে।
আমি বললুম, আশ্চর্য ! কী আশ্চর্য ! এ জন্মে পক্ষীরাজ দেখব, কোনোদিন এমন আশাই করি নি।
এইবার আমি উড়ছি, দাদা। চোখ বুজে থাকো, তা হলে বুঝতে পারবে, আমি ঐ মেঘের কাছে গিয়ে ঠেকেছি। একেবারে অন্ধকার !
"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।