গম্ভীর রানীর গল্প

অনেক দিন আগের কথা, চীন দেশে ছিল এক রাজা। রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, রাজ্যজুড়ে সুখ আর শান্তি। রাজার প্রজা, প্রতিপত্তি—সবই ছিল। ছিল না শুধু মনে সুখ। রাজার খালি-খালি একা লাগত। আসলে সেই দেশের রাজার সব ছিল, ছিল না শুধু এক রানী। তাই এই মনের অসুখ।

একদিন রাজা ঠিক করলেন যে, তিনি সৈন্য-সামন্তদের নিয়ে বের হবেন রানীর সন্ধানে। যেমন ভাবলেন, তেমন কাজ। রাজা তাঁর সবথেকে তেজী ঘোড়াটা আর সাতজন সবচেয়ে বিশ্বাসী ও বলিষ্ঠ সৈন্যকে নিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে রওনা হলেন রানীর খোঁজে।

নানা দেশে গেলেন। কত দেশের কত সুন্দরী রাজকন্যে, তাদের নানান গুণ—কিন্তু রাজার মন ভরল না। কোথায় সেই মেয়ে, যে রাজার মনে এনে দেবে দু-দণ্ডের শান্তি, সেই সুখ?

একদিন রাজা তাঁর সৈন্যদের নিয়ে এসে পৌঁছলেন এক হ্রদের ধারে। সন্ধ্যা নেমে আসছিল, তাই তিনি সৈন্যদের তাঁবু খাটাতে বললেন। রাত্রে খাবারের আয়োজন চলছে, এমন সময় রাজার কানে এলো এক অদ্ভুত মধুর সুর।

রাজা সুরের খোঁজে হ্রদের কাছে গিয়ে দেখলেন—একটি মেয়ে চাঁদের আলোয় ছোটো নৌকায় হ্রদে ভাসছে। চাঁদের আলোয় সেই মেয়ের মায়াবী মুখ দেখে রাজার বুকের ভেতর অচেনা ঢেউ উঠল। মনে হলো, এ-ই সেই মেয়ে, যাকে তিনি এতদিন খুঁজছিলেন। মেয়েটিই গাইছিল সেই মিষ্টি গান।

রাজা সৈন্যদের বললেন মেয়েটিকে তীরে আনতে। নৌকাটি ভেসে এসে তীরে লাগল। রাজা মেয়েটির হাত ধরে তাঁকে নিমন্ত্রণ জানালেন নৈশভোজে। মেয়েটি রাজির হলো এবং রাজার তাঁবুতে এসে বসল। নানা কথার মাঝেই রাজা তাঁকে জানালেন, তিনি তাঁকে রানী করে দেশে নিয়ে যেতে চান।

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “আজই প্রথম দেখলেন, চেনেনও না, তবে কেন আমাকে রানী করতে চান?”
রাজা সব খুলে বললেন। জানালেন, বহু দিন ধরে তাঁর মতো কাউকে খুঁজছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন—তিনি তাঁকে সর্বস্ব ভালোবাসা দেবেন, তাঁর সব সুখের খেয়াল রাখবেন।

এ কথা শুনে মেয়েটি সম্মতি জানাল এবং বিয়েতে রাজি হলো।

রাজার আনন্দ আর ধরে না। পরদিন ভোরে তিনি সৈন্যদের নিয়ে রাজধানীর পথে রওনা হলেন। কিন্তু তখনই মনে পড়ল—তিনি তো মেয়েটির নামই জিজ্ঞেস করেননি। জিজ্ঞেস করলে মেয়েটি জানাল, তার নাম জীনা। সে নানান দেশ ঘুরে এখানে এসেছে, তবে আর কিছু বলল না। রাজা লক্ষ্য করলেন, জীনা খুব চুপচাপ, প্রায় কথা বলে না। জিজ্ঞেস করলে শুধু বলল, “চিন্তার কিছু নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

রাজা দেশে ফিরে এলেন। ধুমধাম করে বিয়ে হলো। তিনদিন ধরে চলল উৎসব। রাজ্যজুড়ে খুশির জোয়ার। কিন্তু রানীর মুখে কোথাও হাসি নেই।

রানী দায়িত্ব পালন করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে, প্রজারা খুশি ছিলেন তাঁকে পেয়ে। তবু রানীর চোখেমুখে যেন অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা। রাজা বারবার জানতে চাইলেন, তাঁর কোনো কষ্ট আছে কি না, কিন্তু রানী চুপ থাকলেন।

রানীর মুখে হাসি আনার জন্য রাজা কত কসরত করলেন—ভেলকি, মশকরা—কিছুতেই হাসি আসেনি। অবশেষে তিনি এক কৌশল করলেন। উপদেষ্টাকে বললেন, রাতে তাঁর কক্ষে এসে যেন বলে বিদেশী সৈন্য প্রাসাদ দখল করতে এসেছে।

সেই রাতে রানীর সঙ্গে রাজা কক্ষে বসে ছিলেন। তিনি পালঙ্কে হস্তাক্ষর চর্চা করছিলেন, রানী চুল আঁচড়াচ্ছিলেন। ঠিক তখনই উপদেষ্টা দৌড়ে এসে বলল—
“মহারাজ! বিদেশী সৈন্য এসে পড়েছে, প্রাসাদ দখল হতে চলেছে!”

রাজা তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে দোয়াত উল্টে মুখে-চোখে কালি মেখে ফেললেন। আর সেটা দেখে রানী হো হো করে হেসে উঠলেন। এতদিন পরে রাজা রানীর হাসি দেখে খুশিতে নেচে উঠলেন। সব খুলে বললেন রানীকে। আর শুনে রানী আরও জোরে হেসে ফেললেন।

কিন্তু হায়! পরদিন আবার রানীর মুখে সেই পুরনো বিষণ্ণতা ফিরে এলো।

ঠিক তখনই এক দূত এসে চিৎকার করে বলল—
“মহারাজ! বিদেশী সৈন্য সত্যিই সিংহদুয়ার দখল করেছে, প্রাসাদ আক্রমণ শুরু হয়েছে।”

রাজা ভেবেছিলেন এটা আবার হয়তো রানীর মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা। তিনি বললেন—
“এভাবে আর হাসবে না রানী, অন্য উপায় খুঁজো।”

কিন্তু দূত জানাল, এবার সত্যি। কামানের গোলা এসে পড়ছে প্রাসাদের গায়ে।

রাজা সৈন্যদের ডাকলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিদেশী রাজা রাজার সৈন্যদের মেরে ফেলল। রাজাকেও হত্যা করা হলো।

অবশেষে বিদেশী রাজা রাজার রাজ্য, প্রাসাদ, এমনকি রানী জীনাকেও দখল করল।

রাজা জীনার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টার মাসুল দিলেন তাঁর প্রাণ দিয়ে।

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!