আফসানা–১ম অংশ

ভালো করে গায়ে চাদর জড়িয়ে রাবুমামা বললেন,সে অনেক বছর আগেকথা বুঝলি। সে সময় আমার একবার সুপারন্যাচারাল এক্সপিরিয়েন্স হয়েছিল। আজ পর্যন্ত আমি যার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারিনি।বলে রাবুমামা চুপ করে রইলেন। মুখ তুলে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশে পরিপূর্ণ একখানি চাঁদ। উথাল-পাথাল জ্যোস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। নভেম্বর মাস; গ্রামাঞ্চচলের দিকে এই সময়ই শীত বেশ জেঁকে বসে। রাত দশটার মতো বাজে।রাবুমামার সামনে রবিন, নীলু আর মুনিয়া চাদরমুড়ি দিয়ে বসে। ওরা আজই ঢাকা থেকে কুসুমপুরে এসেছে শীতের পিঠা, খেজুরের রস,ঝিলাই নদীর চরে পিকনিক আর রাবুমামার গল্পের টানে।কত যে জিন-পরির গল্প জানেন রাবুমামা।তা রাবুমামা আজও বেশ গল্প জমিয়ে তুলেছেন।আজ রাতের খাওয়টা বেশ জম্পেশ হয়েছে।হাঁসের মাংস আর মুগের ডালের খিচুড়ি খেয়ে রাবুমামার গল্প শুনতে ছাদে এসে বসেছে ওরা। রাবুমামা বললেন, তখন আমি সবে ডাক্তারি পাস করে রাজারহাট শহরেপ্র্যাকটিস শুরু করেছি।সেই উনিশ শো পয়ষট্টি সালের কথা বুঝলি।সেসব দিনে তো আর মোবাইল ফোন ছিল না,এমন কী আজকের মতো ঘরে ঘরে ল্যান্ডফোনও ছিল না। সন্ধ্যায় টেলিগ্রাম পেলাম যে মার-মানে তোদের নানী গুরুতর অসুস্থ।আমার বুকটা ধক করে উঠল।কোনওমতে নাকেমুখে কিছু গুঁজে রাজারহাট রেলস্টেশনে ছুটলাম।রেলস্টেশনে পৌছতে-পৌছতে রাত দশটা।রাত দশটা কুড়িতে নবীগঞ্জের ট্রেন আসার কথা।ওদিকে কী কারণে ট্রেন লেইট ছিল।কী আর করা।আমি প্ল্যাটফর্মের ওপর একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে বসলাম।নভেম্বর মাস স্টেশন নির্জন হয়েছিল।লোকজনের ভিড় একেবারেই ছিল না। প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। সামনে দু জোড়া শূন্য রেললাইনের ওপর জ্যোস্না আর কুয়াশার চাদর।মার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন ছিলাম।তোদেরনানী বুঝলি তখন আমার বিয়ের জন্য ভারি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন।কিন্তু আমার মফস্বলের হাতপা ঝাড়া জীবনই ভালো লাগছিল বলে মার অনুরোধ বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম।সেই জন্যই মা অসুখে পড়লেন কিনা এই ভোবে আমার রীতিমতো টেনশন হচ্ছিল।রাত এগারোটা বাজল।আমি বিরক্ত হয়ে একটা সিগারেট ধরালাম।ঠিক তখনই ওদের ওপর আমার চোখ পড়ল বলে রাবুমামা চুপ করে রইলেন।গল্প বলতেবলতে রাবুমামা চুপ করে যান।এটিই ওনার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।ওরা উশখুস করে।নির্জন রাত।দূরে ঝিলাই নদীর ওপর কুয়াশার সামিয়ানা।রবিনের মাথায় একটা নীল রঙের উলের মাঙ্কি টুপি।এখন অবশ্যি চাঁদের আলোয় টুপিটা কালচে দেখাচ্ছে।রবিন শীত একেবারেই সহ্য করতে পারে না।ও জিজ্ঞেস করে,তারপর কি হল মামা?

আরো পড়ুন  এক ঠকের পাল্লায় তিন ঠক —জসিম উদ্দিন– ষষ্ঠ পর্ব

বলছি। আমি যে বেঞ্চিতে বসে সিগারেট টানছিলাম তার একটু দূরে আরেকটি বেঞ্চিতে কয়েকজনকে বসে থাকতে দেখলাম। পায়ের কাছে লাগেজ। আশ্চর্য! ওর কখন এল? বুঝলি, ওদের আমার একই পরিবারের বলে মনে হল। আর পরিবারটি কে কেন যেন আমার পাকিস্তানি মনে হল। কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরা দীর্ঘাঙ্গী এক তরুণির ওপর আমার চোখ আটকে গেল । তরুণির রুপ দেখে আমি থ মেরে গেলাম। গায়ের রং দুধেআলতা গায়ের রং। কিছুটা বাদামী চুল। ঘন জোরা ভুঁরু। মায়াবী চোখ। ধবধবে গলায় মুক্তার মালা। মেয়েটি কামিজের ওপর ঘিয়ে রঙের কার্ডিগেন পরে ছিল। জর্জেটের সাদা ওড়ানাটা মাথার ওপর ঘোমটার মতো করে জড়ানো। মেয়েটির পাশে একটা নীল রঙের বড় ফ্লাক্স।এমন রূপসী মেয়ে আমি এর আগে কখনও দেখিনি। মেয়েটির পাশে বসে ছিলেন মাঝবয়েসি একজন ভদ্রলোক। ভদ্রলোক গায়ে বাদামী রঙের কাশ্মিরী দামিশাল জড়িয়েছেন। মাথায় লাল রঙের ঝুঁটিওয়ালা তুর্কি টুপি। ভদ্রলোকের গায়ের রং ধবধরে ফর্সা, ভরাট মুখে চাপা দাড়ি। দাড়িতে মেহেদি লাগিয়েছেন বলে মনে হল। সব মিলিয়ে বেশ অভিজাত চেহারা।ভদ্রলোকের পাশে ফুলপ্যান্ট আর সাদা রঙের সোয়েটার পরা ফুটফুটে চেহারার একটি দশ-বারো বছরের বালক বসে;মাথায় ক্যাপ। বালকটির পাশে বোরখা পরা একজন মহিলা বসে। মহিলা সম্ভবত বালকটির মা। মহিলার মুখে নেকাব। বাঙালি মেয়েরা সুন্দরী হলেও ওই মেয়েটিরমধ্যে মধ্যপ্রাচীয় একটা ব্যাপার ছিল। যে কারণে পরিবারটিকে আমার পাকিস্তানি বলেই মনে হয়েছিল। তবে আমার মনটা ভীষণ দমে গেল। কেন মামা?তোমার মন দমে গেল কেন? মুনিয়া জানতে চাইল।

বুঝলি না? সময়টা নাইনটিন সিক্সটি ফাইভ । পাকিস্তান আমল। পশ্চিম-পাকিস্তানিদের শাসন-শোষনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অসন্তোষ দিনদিন বাড়ছিল। তাই তোমার মনটা দমে গেল?

হুমম।আসল কথা হল মেয়েটি কে আমারভারি পছন্দ হয়েছিল।আর তোর নানীও চাইছিল আমি বিয়ে করি।কিন্তু মেয়েটি পাকিস্তানি হলে তো আর বিয়ে সম্ভব না।তাই আমার মনটা দমে গিয়েছিল।

আরো পড়ুন  তিন বোকার গল্প

ওহ্

ঘড়িতে দেখি রাত বারোটার মতো বাজে। তখনও ট্রেনের টিকিটির দেখা নেই। একটু পর হল কী জানিস। সেই ভদ্রলোক উঠে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। ভদ্রলোক বেশ লম্বা। আমি আতরের কড়া গন্ধ পেলাম। তবে পরিচিত গন্ধ না।ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, দেখুন তো, কী মুশকিল। ট্রেন লেইট। এদিকে শীতটা কী রকম বাড়ছে দেখুন। ওদিকে আমাদের আবার যত শিগগির সম্ভব রায়নগর পৌছতে হবে। মানে আমার শাশুড়ি হঠাৎ স্ট্রোক করেছেন কিনা। এই ঘন্টাখানেক আগে দুঃসংবাদটা পেলাম। ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণ শুনে আমি নিশ্চিন্ত হলাম। ভদ্রলোকের কথায় বিন্দুমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানি টান নেই। আমি বললাম,সরকারি ট্রান্সপোর্টের কথা আর বলবেন না। গত সপ্তাহে পীরের হাটে রোগী দেখতে গিয়েছি।কী বলব-রোকনপুর স্টেশনে ট্রেন সাড়ে তিন ঘন্টা লেইট।শেষ পর্যন্ত বেচারা মরেই গেল।

বাবা। তুমি ডাক্তার? ভদ্রলোকের কন্ঠস্বর বেশ আন্তরিক শোনালো।

জ্বী। আমি রাজারহাটে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করছি।

ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে বললেন, আমার নাম উবাইদ মালিক।আমি হাত মেলালাম। নরম তুলতুলে শীতল হাত।অতিরিক্ত কোমল। আমি অবাক হলাম।

ভদ্রলোক আমার পাশে বসলেন। ভদ্রলোকের নামটা শুনেও আমার কেমন খটকা লাগল।আরবি নাম। নাম কেবল উবাইদ কিংবা মালিক হলে খটকা লাগত না। তাছাড়া ভদ্রলোক উবাইদ উচ্চারণ করলেন। উচ্চারণ কি ওবায়েদ হবে?তবে উবাইদ মালিক-এর কথাবার্তায় ওনাকে বাঙালিই মনে হল।শিয়া মুসলিম নয় তো? অথবা বিহারী? মনটা আবার দমে গেল। এরা শিয়া বা বিহারী হলে তো মা কিছুতেই বিয়েতে রাজি হবেন না। বিয়ে মানে?নীলু জিজ্ঞেস করে।

ততক্ষণে আমি মনে মনে উবাইদ মালিক-এর মেয়েকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দেব বলে ঠিক করে ফেলেছি।

গল্পের ২য় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

"আলোর পথ"-এ প্রকাশিত গল্পসমূহ ও লেখনী মূলত পাঠক, শুভাকাংখী এবং সম্মানিত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কনটেন্টগুলোর উপর আমরা কোনো মেধাসত্ত্ব (copyright) দাবি করি না। যদি কোনো গল্প, ছবি বা তথ্যের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়ে আপনার প্রশ্ন, সংশয় বা আপত্তি থাকে, তাহলে অনুগ্রহ করে আমাদের যোগাযোগ পৃষ্ঠায় যোগাযোগ করুন। আমরা যথাযথ আইনানুগ পদ্ধতিতে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

সম্পর্কিত পোস্ট

দুঃখিত!